আঁচল
নীলা ও ইলা দুই বোন। তাদের বড় ভাই সফিক। ছোট্ট এক সুখী পরিবার ছিল তাদের। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। খুব অল্প বয়সেই তারা হারায় তাদের মা, আকলিমা খাতুনকে। মায়ের মৃত্যুর পর সন্তানদের মাতৃস্নেহের অভাব যেন না হয়, সেই চিন্তায় তাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ঘরে আসেন তাদের ছোট খালা, জামিলা খাতুন।
কিন্তু যে মানুষটিকে তারা মায়ের মতো করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তিনি কখনোই তাদের আপন করে নিতে পারেননি। বরং দিন দিন তার আচরণ হয়ে ওঠে কঠোর ও নির্মম। নীলা আর ইলা বুঝে যায়, সৎমা আর মা এক নয়।
সময়ের স্রোতে নীলা বড় হতে থাকে। রূপে-গুণে সে ছিল সবার প্রিয়। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুদর্শন যুবকের প্রেমে পড়ে সে। একদিন সব বাধা উপেক্ষা করে তারা পালিয়ে বিয়ে করে।
কিন্তু ভাগ্য যেন নীলার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
ছেলেটির পরিবার এই বিয়ে মেনে নেয়নি। তারা ছেলেকে ব্যবসার কাজে বিদেশে পাঠিয়ে দেয় এবং নীলার ভাই, ডাক্তার সফিককে খবর দিয়ে নীলাকে তার কাছে ফিরিয়ে দেয়।
ভেঙে পড়ে নীলা। দিনের পর দিন সে নির্বাক হয়ে থাকত। চোখের জলই যেন ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। ভাই সফিক তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসে। অনেক কষ্টে, অনেক স্নেহে তিনি বোনকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেন।
ধীরে ধীরে নীলা নিজেকে গুছিয়ে নেয়। বি এ পাস করে। এরপর ভাই তার বিয়ে দেন এক ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সঙ্গে। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন—মনে হয়েছিল এবার বুঝি জীবনের সব দুঃখ শেষ হবে।
কিন্তু নিয়তি আবারও তার সঙ্গে নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে।
বিয়ের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও নীলার কোলজুড়ে কোনো সন্তান এলো না। একসময় তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে বসেন। সংসারে থেকেও নীলা হয়ে পড়ে একা। অপমান, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতা তার নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।
একদিন নিজের শূন্য বুকের হাহাকার মেটাতে নীলা একটি এতিমখানা থেকে ছোট্ট এক মেয়েশিশুকে দত্তক নেয়। শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে সে যেন আবার বাঁচার কারণ খুঁজে পায়। সে মেয়েটির নাম রাখে “আঁচল”।
আঁচলই হয়ে ওঠে নীলার পৃথিবী।
কিন্তু কিছুদিন পর জানা যায়, মেয়েটি অটিজমে আক্রান্ত। তার জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্ন, বিশেষ চিকিৎসা। নীলার সামান্য আয়ে সবকিছু সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্বামীর অবহেলা, অর্থকষ্ট আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়।
অবশেষে একদিন বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে সে সিদ্ধান্ত নেয়—আঁচলকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রেখে আসবে, যেখানে তার যত্ন নেওয়া সম্ভব হবে।
সব কাগজপত্রের কাজ শেষ হয়।
বিদায়ের মুহূর্ত এসে দাঁড়ায়।
নীলা মুখ ঢেকে কাঁদছিল। চোখের জল থামছিল না। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই অনুভব করল, কেউ তার আঁচল ধরে টানছে।
পেছনে ফিরে দেখে, ছোট্ট আঁচল তার শাড়ির একপ্রান্ত শক্ত করে ধরে আছে।
নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে শিশুটি কাঁপা কণ্ঠে বলল—
— “আমাকে রেখে কোথায় যাও মা?”
শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল নীলার বুকে।
যে নারী ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিল, যে নারী ভালোবাসার জন্য বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, যে নারী জীবনের প্রতিটি মোড়ে হারানোর বেদনা পেয়েছিল—সেই নারী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
দৌড়ে গিয়ে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরল সে।
তার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল আঁচলের কপালে।
আর সে শুধু বলতে লাগল—
— “না মা, আমি কোথাও যাচ্ছি না। পৃথিবীর সবাই যদি তোমাকে ছেড়ে যায়, তবুও আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
আকাশের এক কোণে একটি তারা জ্বলছিল।
হয়তো দূর আকাশ থেকে আকলিমা খাতুন দেখছিলেন—মাতৃত্ব কখনো রক্তের সম্পর্কে নয়, ভালোবাসার সম্পর্কেই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
আরো খবর দেখুন...
Leave a Reply