লেখক হারুন অর রশিদ মজুমদার এর লেখা হালহকিকত

লেখক হারুন অর রশিদ মজুমদার এর লেখা হালহকিকত

১.

বিএনপি হলো একটি উদারনৈতিক আমেরিকান ধাঁচের রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক দল না বলে বিএনপি-কে, রাজনৈতিক দল-মত-পন্হা গুচ্ছের সমাহার বলাটা অধিক যৌক্তিক। কেন? বিএনপি-তে কোন ধর্মের সভ্য নেই? সব ধর্মের আছে। বিএনপি-তে কোন দলের সভ্য নেই? সব দলের আছে। বাম, ডান, মধ্য, নাস্তিক, আস্তিক কোন মত ও পথের সভ্য নেই বিএনপি-তে? সব মত, পথ, দল, ধর্ম, পন্হার মিলন মেলা বা সন্নিবেশ হলো বিএনপি। সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার আদর্শ আঁকড়ে ধরে, বিএনপি সাচ্চা দেশপ্রেমিক সংগঠন। নিঃসন্দেহে। তবুও কোন নিদিষ্ট আদর্শের কারণে না, বিএনপিকে পছন্দ করি ওই সর্বভুক বা নির্বিবাদে সযত্নে দ্রবীভূত করার ওই এক অলীক অসীম সক্ষমতার কারণে।

সাবেক আওয়ামী লীগ অফিসে, কেউ ব্যাক্তিগত ভাবে নামাজ পড়লে পড়তে পারতো তবে, জামায়াতে নামাজ পড়ার কথা চিন্তার বাইরে ছিল। আবার জামায়াতের অফিসে, নামাজের ওয়াক্তে নামাজ না পড়ে ফাঁকি দিবার চিন্তা করাটাও গর্হিত অপরাধ। কেবলমাত্র বিএনপি অফিসে দেখবেন নামাজের আজান হলে জামায়াত হচ্ছে, কেউ জামায়াতে নামাজ পড়ছে। কেউ নামাজ পড়ছে না। এতে কারও কোনপ্রকার ভ্রুক্ষেপ নেই। যার যা অভিরুচি সেটাই সই। বিএনপি-তে মদ্যপান করে, এমন নেতা-কর্মী যেমন আছে। আবার গোঁড়া ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণকারী নেতা-কর্মীর সংখ্যা অসংখ্য। কওমী পন্হি, পীর পন্হি, জামায়াত পন্হি, ন্যাপ পন্হি, কমিউনিস্ট পন্হি, সর্বহারা পন্হি, আওয়ামী পন্হি, পাহাড়ি পন্হি সর্বপন্হা এসে মিলেছে এক মোহনায়। বিএনপি-তে। আদতেই বিএনপি যেন এক মহাসমুদ্র।

বিএনপির জনসভায় যান, দেখবেন একটি পরিপূর্ণ জনসভা বলতে যা বোঝায় ঠিক তা। বিএনপির জনসভায় শিশু আছে, তরুণ আছে, যুবক আছে, প্রৌঢ় আছে, বৃদ্ধ আছে। কেউ সিগারেট টানতে টানতে বক্তৃতা শুনছে। কেউ গল্প গুজব করছে। আখের রস বিক্রি হচ্ছে। তাল গাছের রসের তাঁড়ি বিক্রি হচ্ছে। এমনকি গাঁজার ধোঁয়া উড়াটাও অস্বাভাবিক না বিএনপির জনসভায়। রঙ বেরঙের বেলুন বিক্রেতা, ঝালমুড়ি, চানাচুর, মুড়িমুড়কি মেলে যত্রতত্র। যেন এক বারোয়ারী মেলা আর লোকে লোকারণ্য বিএনপি-র জনসভাস্হল। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত একটি জনসভায় গেলে বুঝতে পারবেন, শৃঙ্খলা কাকে বলে? জনসভায় আগত সবার মাথায় শাদা দবদবে টুপি জনসভার শোভাবর্ধন করছে। কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা কোথাও নজরে পড়বে না। কোথাও সিগারেটের ধোঁয়া উড়বে এটা অচিন্তনীয়। স্টেজে কোনো ভীড়, ঠেলা, ধাক্কাধাক্কী নেই। নামাজের আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কাতারে দাঁড়িয়ে যাবে নামাজে শরীক হতে। পুরো সভাস্থলে উচ্চস্বরে কোন হইচই নেই। কেবলমাত্র ফিসফিস আওয়াজ শোনা যাবে। যেন ঠিক জনসভা না, একটি সুনসান ছিমছাম কর্মী সভা।

২.
জনাব তারেক রহমান বদলে গেছেন। এই কথাটা বারবার বলে আমাদের সুশীল সমাজ কি বোঝাতে চান? আমার বোধগম্য না। আমি অতি সাম্প্রতিক কালের তারেক রহমানের বক্তব্য যেমন শুনছি গণমাধ্যমের কল্যাণে। আবার ওনার ১ লা জানুয়ারি ২০০৪ সনের সাক্ষাৎকার মতিউর রহমান চৌধুরী যেটা নিয়েছিলেন চেনেল আই-তে। সেটা অতি সাম্প্রতিক কালে মনোযোগ দিয়ে শুনেছি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজও মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আমি আজকের প্রৌঢ় তারেক রহমানের মুখের ভাষায়, চিন্তা-ধারায় এবং অতীতের তরুণ তারেক রহমানের ভাব-ভাষা চিন্তা-ধারার মধ্যে কোনো তফাত পাইনি। উনি ওনার আগের স্ট্যান্ডে বহাল আছেন। তবে হ্যাঁ, যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে ওটুকু হলো প্রাকৃতিগত অতি স্বাভাবিক পরিবর্তন। মানুষের যতোই বয়স বাড়ে ততোই মানুষ হৃদ্ধ হয়, ততোই সিদ্ধ হয়। ক্রমাগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে, ওই অর্জনটুকু হয়ে যায়। তারেক রহমান তো আর অতি মানব না। কাজেই বয়সের হেরে ও হোক ডিজিটাল মাধ্যমে তবু প্রত্যক্ষ ভাবে দীর্ঘ সময় সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে, মানবিক গুণাবলির যথেষ্ট তারতম্য ঘটাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেটা শুধুমাত্র যে, তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও হয়েছে, তা-না সবার ক্ষেত্রেই হয়। এটা ন্যাচারাল। এটা না হওটাই হতো বরঞ্চ হতো প্রকৃতি বিরুদ্ধ।

এইবারের ২০২৪ সালের জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে, ১৯৩৭ সনের বাংলা প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনের হুবহু মিল। ১৯৩৭ সালে নেতৃত্বে জমিদার প্রধান হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয় সংগঠন কংগ্রেসকে উহ্য রেখে, প্রজা কেন্দ্রিক মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শের-ই-বাংলা’র নেতৃত্বে “কৃষক প্রজা পার্টি” ও খাঁজা নাজিম উদ্দীন ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর যৌথ নেতৃত্বাধীন “মুসলিম লীগ” প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই সংগঠনই বাংলার মুসলিম জনহোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয় ছিল সেসময়। শের-ই-বাংলা’র নেতৃত্বে “কৃষক প্রজা পার্টি” জমিদারদের নানান কর নিপীড়নের বিষয়টি সামনে এনে যেমন জনগণের জাগতিক আশা আকাঙ্খাকে ধারণ ও মূল্যায়ন করে। তাই প্রজা প্রধান মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিজেদের সংগঠন হয়ে উঠেছিল কৃষক প্রজা পার্টি। তদ্রূপ মুসলিম লীগও স্বতন্ত্র মুসলিম দেশ প্রতিষ্ঠা করার দাবির আওয়াজ তুলে, জনগণের বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রিয় সংগঠন হয়ে উঠেছিল কাল পরিক্রমায়। মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মিক শান্তি ইসলামকে গুরুত্ব দিয়ে, আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন করতে প্রত্যয় নিয়েছে বলে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর আশা আকাঙ্খার মূর্তমান প্রতীক হয়ে উঠেছিল তৎকালীণ মুসলিম লীগ।

কৃষক প্রজা পার্টির প্রতীক ছিল বৃহত্তর কৃষক সমাজের দৈনন্দিন জীবন যাপনের অংশ “লাঙ্গল”। মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল মুসলমানদের আলোকবর্তিকার নিদর্শন স্বরূপ “হারিকেন”। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে জনপ্রিয় সংগঠন কংগ্রেসের প্রতীক ছিল “গরু ও বাছুর”। সেই নির্বাচনে শের-ই-বাংলা”র নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি আসন পায় ৩৬টি, খাঁজা নাজিম উদ্দীন এর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পায় ৪৩টি ও শরৎ বসুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পায় ৫৪টি আসন। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের দোটানা মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমি এটা বলছি না যে, এবারের ‘২৬-র নির্বাচনের ফলাফল অনুরূপ হবে। আমি বরং বোঝাতে চাই যে, ভোটার যে পক্ষেই ভোট দিক না কেন, যে দলই জিতুক না কেন, দিনশেষে সম্মানিত ভোটারবৃন্দকে অন্তত আগামী জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী কালে আর আফসোস করতে হবে না। যেমন ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগক

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *