কুমিল্লা প্রতিনিধি
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত একটি দেশীয় গাছ এখন নতুন করে নজরে আসছে। স্থানীয়ভাবে ‘জীবনগাছ’ নামে পরিচিত Trema orientalis সাধারণত পতিত জমি, ঝোপঝাড় ও বনভূমির প্রান্তবর্তী এলাকায় স্বাভাবিকভাবে জন্মে। এতদিন এর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ব্যবহার গড়ে ওঠেনি। তবে দেশের কয়েকটি এলাকায় ক্রিকেট ব্যাট তৈরিতে এর কাঠ ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ গাছটিকে নতুন আলোচনায় এনেছে। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুক স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষক, কারিগর ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। ২০২২ সালে উত্তরাঞ্চলের কয়েকজন ক্রিকেট ব্যাট নির্মাতার কাছ থেকে জীবনগাছের কাঠ ব্যবহারের বিষয়ে জানতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় কারখানায় এই কাঠ দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির বিষয়টি পরে জীবনগাছকে ঘিরে ডাহুকের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ক্রিকেট ব্যাটের কাঁচামালে বাস্তব ব্যবহার উত্তরাঞ্চলের একটি ক্রিকেট ব্যাট কারখানার মালিক গোপাল দাস জানান, তাঁদের কারখানায় নিয়মিত জীবনগাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় কাঠের মিল থেকে সাধারণত প্রায় দুই ফুট দৈর্ঘ্যের গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরা সংগ্রহ করা হয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, বর্তমানে কাঠটি তুলনামূলক সহজলভ্য এবং দামও কম। এই ব্যবহার অবশ্যই জীবনগাছকে ক্রিকেট ব্যাটের জন্য আদর্শ কাঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। তবে স্থানীয় পর্যায়ে এর ব্যবহার যে ইতোমধ্যে হচ্ছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের তথ্য। কাঠের মান, স্থায়িত্ব ও সরবরাহব্যবস্থা আরও উন্নত করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর চাপ কমানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুকের পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক মনে করেন, জীবনগাছের তুলনামূলক স্বল্প উৎপাদনচক্র স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কৃষক গাছ উৎপাদন করবেন, স্থানীয় কাঠের মিল তা প্রক্রিয়াজাত করবে এবং ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা সেই কাঠ ব্যবহার করে ক্রীড়াসামগ্রী তৈরি করবে—এরপর উদ্যোক্তারা বাজারজাতকরণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন। এভাবে কৃষি, বনায়ন, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনের মধ্যে একটি স্থানীয় মূল্যশৃঙ্খলা গড়ে উঠতে পারে। উত্তরাঞ্চলের বাইরে সম্ভাবনা জীবনগাছের ব্যবহার শুধু উত্তরাঞ্চলের ক্রিকেট ব্যাট কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ক্রিকেট ব্যাট ও বিভিন্ন ক্রীড়াসামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগর রয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের উৎপাদন কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়। উপযুক্ত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জীবনগাছের চাষ বা সামাজিক বনায়ন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে কাঁচামালের একটি উৎস তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন গাছটির কাঠের গুণমান, উৎপাদন ব্যয়, বাজারচাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য। গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুকের অনুসন্ধানে জীবনগাছকে তাই কেবল একটি কাঠের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কৃষি, বনায়ন, স্থানীয় কাঠশিল্প, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সংযোগ তৈরির উপাদান হিসেবেও প্রজাতিটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কাঠের বাইরেও সম্ভাব্য ব্যবহার জীবনগাছের সম্ভাব্য ব্যবহার কাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না, সেটিও ডাহুকের অনুসন্ধানের একটি অংশ। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরবর্তীতে স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে অবহিত করা হয়। জয়পুরহাট এলাকার প্রান্তিক কৃষক, ছাগল পালনকারী ও ছাগলের খামারের মালিক মোজাম্মেল মিয়ার অভিজ্ঞতায়, স্থানীয়ভাবে জীবনগাছের পাতা ছাগল পালনে ব্যবহার করা হয়। জীবনগাছের পাতায় সম্ভাব্য অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এমন স্থানীয় ধারণার কথাও তিনি জানান। তবে এসব তথ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পাতার পুষ্টিমান, নিরাপত্তা, প্রাণিখাদ্য হিসেবে উপযোগিতা এবং সম্ভাব্য অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা যাচাই করতে নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার আওতায় আনা গেলে এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে। সামাজিক বনায়নে দেশীয় প্রজাতির সম্ভাবনা জীবনগাছ দ্রুত বর্ধনশীল দেশীয় প্রজাতি হওয়ায় সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা যাচাই করতে আগ্রহী গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুক। তবে একটি প্রজাতি দেশীয় হলেই তা সব ধরনের সামাজিক বনায়নের জন্য উপযোগী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মাটির ধরন, পানির প্রাপ্যতা, বৃদ্ধির হার, কাঠের গুণমান, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব, চাষের ব্যয় এবং বাজারচাহিদা—সবকিছু বিবেচনা করে এর উপযোগিতা নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন পরীক্ষামূলক চাষ এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশে দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতি সামাজিক বনায়নে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভবিষ্যতে কোথাও দেশীয় প্রজাতিকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হলে সেটিও একইভাবে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। জীবনগাছের ক্ষেত্রেও সেই পরীক্ষাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাচলে সম্ভাব্যতা যাচাই জীবনগাছভিত্তিক সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা নিরূপণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকার সামাজিক বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্বাচলের একটি সম্ভাব্য সাইট পরিদর্শন করেছে গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুক। সেখানে পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক বনায়নের সম্ভাবনা এবং স্থানীয় জীবিকা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়। পূর্বাচলের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল এলাকায় শুধু নগরায়ণের প্রয়োজন বিবেচনা করলেই হবে না; জলাভূমি, সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ এবং বিদ্যমান বৃক্ষসম্পদের বিষয়ও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতির পরীক্ষামূলক ব্যবহার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ—দুই ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখতে পারে কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার। এখনো গবেষণার পর্যায়ে জীবনগাছকে ঘিরে গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুকের কাজ এখনো গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বড় পরিসরে চাষ বা বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের আগে গাছটির বৃদ্ধি, কাঠের মান, উৎপাদন ব্যয়, বাজারচাহিদা এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও পরীক্ষা করতে হবে। বর্তমানে অনুসন্ধানের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র হলো—ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে কাঠের ব্যবহার, পাতা ও অন্যান্য অংশের সম্ভাব্য ব্যবহার এবং সামাজিক বনায়নে প্রজাতিটির উপযোগিতা। একটি দীর্ঘদিন অবহেলিত দেশীয় প্রজাতি কৃষক, বনায়ন, স্থানীয় কাঠশিল্প, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে পারে কি না—জীবনগাছ নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুকের অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন সেটিই। এর উত্তর নির্ভর করবে আরও গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের প্রমাণের ওপর।

