লেখক কাজী রাফির এর গল্পের নাম : নির্বাচিত গল্প

লেখক কাজী রাফির এর গল্পের নাম : নির্বাচিত গল্প

১ম-পর্ব…..

পৃথিবীর বিখ্যাত ছোট গল্পকার কে ? প্রশ্ন আসলেই যার নাম সবার আগে আসে তিনি হলেন আর্নেস্টহামিংওয়ে। তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন মাত্র ছয় শব্দের একটি গল্প লিখে। গল্পটি ছিল “ফর সেল, বেবিজ সুজ নেভার ওর্ন”। এই গল্পটাই সারা বিশ্বে আলোড়িত হয়েছিল। আর বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পের জনক নিঃসন্দেহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্য ভালোবাসেন অথচ রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প পড়েননি এমন মানুষ বিরল। ছোটগল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন; “ছোট প্রাণ ছোট কথা, ছোট ছোটদুঃখ ব্যথা, নিতান্তই সহজ সরল”।

শিল্পী সত্তা না থাকলে লিখলেই তো আর গল্প হয়না। এই যে আমাদের চারপাশের দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যখন কথাসাহিত্যিক নিজের মননে অনুধাবণ করেন তার শৈল্পিক মগ্নতায়, অনুভব করেন তাঁর কল্পনার সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা দিয়ে, জীবনকে দেখার অতিন্দ্রীয় এবং জন্মগতভাবে নিরপেক্ষ চোখ দিয়ে, মানুষ এবং প্রকৃতিকে হৃদয়াঙ্গম করেন তার সহজাত স্নায়বিক দ্রোহ দিয়ে তখনই এটা হয়ে যায় গল্পে গাঁথা কাহিনি। যে গল্প মানুষের মনোভূমিতে এক টুকরা স্মৃতি রেখে যায়, অনুভব রেখে যায়, যে গল্প পড়তে পড়তে একজন পাঠক যেন তার নিজেকেই উন্মোচন করে চলেন অনবরত – আমি তেমন গল্প-উপন্যাসই খুঁজে বেড়াই।

আমি এমন একজন গল্পকারকে দীর্ঘদিন ধরে পাঠ করে আজ দ্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই বাংলাসাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের আবির্ভাব হয়েছে। বেশকিছু উপন্যাসের পর এবার তাঁর ‘নির্বাচিত গল্প’ পড়ে বলা যায় সেই গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা, তার ভাষা এবং বিন্যাসরীতি; সর্বোপরি গল্পের সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আমার মুগ্ধতাই আমাকে এই লেখা লিখতে প্ররোচিত করেছে। ভিতর থেকে কিছু লেখার তাগাদা করছে।

এদেশের এমন একজন গল্পকার এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছেন – এই বেদনাবোধও এই লেখা লেখার বড় কারণ। তবে, আমি নিশ্চিত সাহিত্য সাধনায় তিনি নিরলস সময় অতিক্রম করছেন এবং করবেন। তবে বেদনার বিষয় হলো-এখনও পাঠক তাকে ঠিক যেন চিনে নিতে পারছেনা। তবে বোদ্ধা পাঠক একদিন ঠিক ঠিক তাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবেনই। তাঁকে খুঁজে নিবেন।

হ্যাঁ তিনি কথাসাহিত্যিক কাজী রাফি ,যার প্রথম কালজয়ী উপন্যাস ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ লিখে পেয়েছেন কালি ও কলম পুরস্কার সহ আরও কতগুলো সম্মানজনক পুরস্কার। তাঁর গল্প অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি এবং স্পানিশ ভাষায়। পাতাভর্তি প্রতিবেদন ধরণের গল্প উপন্যাসের ভীড়ে সত্যিকারের সাহিত্য কালে কালে বিলম্বিত হয়েই পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। আর যা কিছু মহৎ, যার আবেদন সুদূরপ্রসারি তেমন সৃষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে সমাজ সবসময় দেরিই করে।

আমি আজ তাঁর ‘নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ’ থেকে পঠিত গল্পগুলো নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা পোষণ করছি ।যতটুকু ব্যক্ত করব তা আমার ক্ষুদ্র ভাষাজ্ঞানে একেবারেই কম হবে। সীমাবদ্ধতা যে আমাকে থমকে দিয়েছে!

কাজী রাফি সাবলীল শব্দ, বাক্য প্রয়োগ করে গল্প বলেন। রাফির গল্প যত সহজে পাঠ করা যায়,তার ভেতরগত তাৎপর্য এতটা সহজবোধ্য নয়। তিনি যেন অনুক্ত কথাটা পাঠককে ঘোরের মধ্যে ফেলে ভাবাতে বাধ্য করেন। একটা গল্প যতবার পড়া যায় ততবার গল্পটা যেন ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক, ভিন্ন ভিন্ন অর্থ এবং দ্যোতনায়, অনন্য জীবনবোধ নিয়ে উপস্থিত হয়। গল্প শেষ করার পর পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে, গল্পে কী বার্তা রয়েছে? আসলে কোনো বার্তা কি আছে? নাকি বড়, বিস্তৃত একটা জীবনকে এক লহমায় দেখে নেওয়ার স্বাদটুকু পাওয়াই এই গল্পের উদ্দেশ্য? পাঠক প্রশ্নের অনেক উত্তর পেয়েও আবার যেন সব হারিয়ে ফেলেন। এক টুকরা অনুভব, নিজের ভিতর যুগ যুগ ধরে লুকিয়ে থাকা এক চিলতে স্মৃতিঘোরে তিনি নিজেকে খুঁজে পান। একটা গল্প এভাবে যখন পাঠকের কল্পনার সাথে, সত্তার সাথে গল্পকার জুড়ে দেন –তার বিন্যাসের বুননটুকু কত গভীর হতে হয়?

নেই ঘটনার ঘনঘটা আছে প্রবাহমানতা। চরিত্ররা এখানে জীবন্ত। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে । রাফির সাদামাটা বাক্য বিন্যাসেও একজন জাত গল্পকারের অন্তর্চক্ষুর উপস্থিতি স্পষ্ট। মাঝে মাঝেই তিনি বাস্তবতা পেরিয়ে পৌঁছে যান পরাবাস্তবতায়। ঠিক এই জায়গাটাকে সব পাঠক তাঁর সব গল্পকে ধরতে পারবেন বলে আমার সন্দেহ হয়। বাংলাদেশের পাঠকের যে পাঠাভ্যাস তা দিয়ে সবাই রাফির গল্পকে গভীরভাবে হৃদয়াঙ্গম করতে পারবেন কিনা –সেই প্রশ্ন থেকেই যায়! মনে হয়, তৈরি পাঠক না হলে, গভীর জীবনবোধ না থাকলে কাজী রাফির গল্প অনেক পাঠকের কাছে অধরাই থেকে যাবে। আবার যিনি একবার তাঁর গল্পের স্বাদ পাবেন হয়তো এমন মানের গল্প ছাড়া তার আর সহজপাচ্য গল্প ভালো নাও লাগতে পারে। এই লেখকের একনিষ্ঠ পাঠক এবং রাফির গল্প নিয়ে গবেষণা করা প্রয়াত আশরাফ উল আলম শিকদার কাজী রাফির লেখার মধ্যে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেতেন। বারংবার রাফিকে লেখার তাড়া দিতেন – যেন তাঁর সব লেখা পড়া শেষ না হয়!

রাফির গল্প আমারও ঘোর লাগায়। স্মৃতিঘোর, ভালোলাগার ঘোর, হতাশা-আনন্দের মিশেল ঘোরে আমি অন্য এক জীবনের স্বাদ পাই। নির্বাচিত গল্পের গল্পগুলো আমাকে জীবনকে, জীবনের সকল তলকে উলটে পালটে দেখতে সাহায্য করে।

হ্যাঁ লেখকরা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বলেই বহুযুগ এগিয়ে নিয়ে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন কোন এক জাদুবাস্তবতার মোহজালে। যদি বলি, ‘নির্বাচিত গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘রূপডাঙার সন্ধানে’ অতি সাদামাটা কাহিনিকে দিয়েছেন তিনি শিল্পের অনন্যমাত্রা। সদ্য ডাক্তারি পাস করা মৌটুসী আসে নানার অজপাড়া গাঁ রূপডাঙ্গায়। যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি।

‘ঢাকার বাস থেকে নেমে রূপডাঙ্গার দিকে চলমান বাসে ওঠে মৌটুসী। সুন্দরী তরুণী গাড়িতে উঠতেই ঘটর ঘটর করা বাসের ড্রাইভারের শীর্ণ শরীরে আলাদা শক্তি দেয়।’

তিনি একটি সুন্দরী তরুণীর একা চলার পথের কণ্টকাকীর্ণতাকে শিল্পীর চোখে দেখেছেন।

“বাস কন্ডাক্টর, হেলপারের মুখে পানের লহমা দুইপাটিদাঁতের খপ্পড়ে পড়ে শিল্পীত ভঙ্গিতে চর্বিত হয়।”

এই যে সামান্য ইঙ্গিত, সূক্ষ্ম, শিল্পীত বর্ণনাভঙ্গী তাই-ই রাফির লেখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তার গল্পের পরিমিতিবোধ লক্ষ্য করার বিষয়। বাস থেকে নেমে টমটমে ওঠার সময় মৌটুসীর মামা সুদর্শন এক তরুণের সাথে মৌটুসীর পরিচয় করিয়ে দেয়।

‘‘মৌটুসী তাকে এক ঝলক একটু দেখলো। চোখে মুখে তার কৌতূহলী গাম্ভীর্যের সরলতা। বয়সে মৌটুসীর সাত আট বছরের বড় হবে হয়তো। তার ঘন রেশম চুল, সেভ করা ত্বক সূর্যের অস্তমিত রশ্মির অদ্ভুত বিভায় সমুজ্জ্বল।

‘মামা ড্রাইভার কোথায়?’ মৌটুসী প্রশ্নে প্রথম মুখ খুলল সে,
‘আমি। আমার নাম মুনতাসির।’
‘আমি মৌটুসী। আপনাকে বলছি না, টমটমের চালক কোথায় জানতে চাইছি।’ ওবায়েদ হা হা করে উঠল,
‘ওটা ওরই টমটম। অ্যাম্বুলেন্স। ওটাতে করে মনের আনন্দে সে এ পাড়া সে পাড়া ডাক্তারি করে বেড়ায়।’
কথাটা বলেই জিহবা কামড়াল ওবায়েদ। মুন্তাসির তাকে এসব তথ্য না জানানোর অনুরোধ করেছিল। মৌটুসী বিস্মিত,
আপনি ডাক্তার? ডাক্তার কেন টমটম চালায়?’’

মুন্তাসিরের জীবনাচরণে রহস্যময় মনে হয় মৌটুসীর। মুন্তাসিরের ডাক নাম মন। মন নিজেকে লন্ডনের কলেজের পাঠ না চুকিয়েই ফিরে আসা এক বাউন্ডুলে যুবক বলে পরিচয় দেয়। এই বাউন্ডুলে ছেলেটার আছে নেপোলিয়ন নামের এক ঘোড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে হর্সরাইডে বের হয়ে পড়ে। মৌটুসী অজপাড়া গাঁকে যে রকম কল্পনা করেছিল,তাতে অনেকটা তাচ্ছিল্যতা তো ছিলই। তাহলে কোন্ মোহগ্রস্ততা তাকে এখানে চুম্বকের মতো দিনকে দিন আকর্ষণ করেছে। কাজী রাফি মেদহীন গল্পের একটি দৈহিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে তার রস আস্বাদনের যে রসায়ন,তার ভার দিয়েছেন পাঠকের কাছে। তিনি পারিপার্শ্বিক বর্ণনা দিতে গিয়েই ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজের, প্রকৃতির এবং এসবের মাঝে দুই তরুণ-তরুণীর প্রেম রসায়নের পাশে জীবনের বাস্তব চিত্র।

এই মুন্তাসিরকে ঘিরে মৌটুসীর কাছে যখন রহস্য ঘনীভূত হয়, ঠিক তখনই রূপডাঙ্গায় আসমা নামের এক মেয়ের প্রসবকালীন জটিলতা তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। তখনই মুন্তাসিরের সত্যিকারের পরিচয় পেয়ে মৌটুসী যেন তার আলোয় ঝলসে যায়। মৌটুসী বুঝতে পারে, কলেজ পালানো একজন ছাত্র শুধু নয় মন। সে ঠিক মহাবীর নেপোলিয়নের মতো আসমার মৃত্যুদূতের সাথে প্রাণপণ লড়াই করে –আট ঘণ্টার দীর্ঘ এক অপারেশন শেষ করে বাঁচিয়ে দেয় আসমাকে। ‘রূপডাঙ্গার সন্ধানে’ মাটির গন্ধমাখা এক গল্প হয়েও মুন্তাসিরের জীবন রহস্যের মতো ধীরে ধীরে তার ডানাটুকু খুলতে থাকে। খুলতে থাকে গল্পের আড়ালের পর আড়াল। মৌটুসী জেনে যায় –মুন্তাসিরের আয়ু আছে আর অল্প কিছুদিন!

আমরা বুঁদ হয়ে গল্পকে আবিস্কারের চেয়ে নিজের ভিতর যুগ যুগ ধরে লালন করা প্রেমকে আবিস্কার করি, নিজেকে খুঁজে পেয়ে চোখ ভিজাই।

কয়েকদিন রূপডাঙ্গায় থেকে মৌটুসীর আর ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেও যেন জন্মেছিল এইসব মুহূর্তের জন্য যা জীবনকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে। পাঠক হয় তো ভাবছেন, এটা আবার ব্যতিক্রম কী? না এমনটা এত সহজে ভেবে নেয়া যাবে না, কারণ,সাদামাটা গল্পের ভেতরে আছে দুই তরুণ তরুণীর মনের অতলান্তে বাস করা প্রেমের রহস্য, যা পাঠে মননে এক ধরণের ঘোর তৈরি করবে।

ভাবতে বসবেন তারপর কী হলো? ঢাকায় আসার আগে মৌটুসীর বাগদান হয়েছিল মাহমুদ নামের এক যুবকের সাথে। সব ভুলে মৌটুসী কখন মুন্তাসির বা মন নামের প্রজ্ঞাবান অথচ উচ্ছল তরুণের জীবনের সাথে, সময়ের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। তাকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু মৌটুসীর ঘোর কেটে যায় –যখন তার মা তার হবু স্বামীসহ রূপডাঙ্গায় এসে হাজির হয়।

মৌটুসীকে ঢাকায় ফিরে যেতে হয়। তার ফিরে যাওয়ার আগে একদিন দুপুরে গোপনে মৌটুসী মন –এর ঘরে ঢোকে। এরপরের যে সব দৃশ্যকল্প আর কথোপকথন তা পাঠে পাঠকের যে অনুভব হবে –তার অজান্তেই হৃদয় হাহাকার করে উঠবে। দুচোখ বেয়ে কখন কয়েক ফোটা অশ্রু বিসর্জিত হবে! সত্যিই রূপডাঙ্গার গল্পের পরিণতির দৃশ্যায়ন ভোলার মতো নয়। মুন্তাসিরের টমটম টানা নেপোলিয়নের সাথে পাঠকও থমকে যাবেন। তার মনে, মননে, হৃদয়ে গেঁথে থাকবে কাজী রাফির রূপডাঙ্গার সন্ধানের শেষ দৃশ্যকল্প।

চলবে……..

(লিখেছেন Sharmeen Sultana)

9 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *