দ্যা লাস্ট ট্রেন
সমিরের জীবনে একসময় অভাব বলতে কিছু ছিল না। শহরের ব্যস্ত এলাকায় কাপড়ের ব্যবসা করতেন তিনি। নিজের পরিশ্রমে সংসারটা বেশ ভালোই চলছিল। এক ছেলে, এক মেয়ে—দুজনকেই শহরের নামি-দামি স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। সন্তানদের নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু মানুষের জীবন যে কখন কোন মোড়ে এসে থেমে যায়, তা কেউ জানে না।
একদিন সামান্য জ্বর হয়েছিল সমিরের। প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সাধারণ জ্বর ভেবেই ওষুধ খেয়েছিলেন। কিন্তু জ্বর কমল না। একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল—সমির ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত।
সেদিন যেন তাঁর পৃথিবীটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল।
চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, ভারত—কত জায়গায় যে ছুটেছেন! জীবনের শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে তিনি চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু চিকিৎসার খরচে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল তাঁর ব্যবসা। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব—যার কাছে পেরেছেন, ধার করেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাবার শেষ সম্পত্তিটুকুও একসময় বিক্রি করে দিতে হয়েছে।
তবুও রোগটা যেন কিছুতেই তাঁকে ছাড়ল না।
একসময় ছেলেমেয়েদের নামি স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। পাঁচ মাসের বাড়িভাড়া বাকি। বাড়িওয়ালা অবশ্য কিছু বলতেন না। হয়তো অসুস্থ মানুষটির দিকে তাকিয়ে তাঁরও মায়া হতো।
সমিরের কাছে তখন আর কারও কাছে হাত পাতার মতো জায়গা বাকি ছিল না।
এক বিকেলে বিছানায় শুয়ে দুর্বল কণ্ঠে স্ত্রীকে বললেন,
—তুফানকে একবার সফিকের কাছে পাঠাও।
তুফান তাঁর ছেলে। সফিক সমিরের ছোট বোন জামাই।
মিরপুরে সরকারি আবাসনে থাকেন।
স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আর কত চাইবে? সবাই তো দিয়েছে।
সমির চোখ বন্ধ করলেন।
—জানি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে আবার কিছু ওষুধ আনতে বলেছে। হাতে একদম টাকা নেই।
কথাগুলো বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।
তুফান কিছু না বলে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ল।
যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে এলো। ফুফুর বাসায় পৌঁছানোর পর জানতে পারল, ফুফা সফিক জরুরি অফিসের কাজে বাইরে আছেন।
অপেক্ষা করতে লাগল তুফান।
রাত বাড়তে লাগল।
অবশেষে রাত প্রায় দশটার দিকে সফিক বাসায় ফিরলেন। তুফান কিছু বলার আগেই তাঁর চোখে সব কথা লেখা ছিল।
সফিক ভেতরে গিয়ে কিছু টাকা এনে তুফানের হাতে দিলেন।
—বাবার জন্য নিয়ে যাও। আর প্রয়োজন হলে আমাকে জানিও।
তুফান মাথা নিচু করে টাকা নিল।
—ফুফা, অনেক কৃতজ্ঞতা।
—কৃতজ্ঞতা কিসের? বাবা অসুস্থ, তুমি টাকা চাইতে এসেছ—এটা তো স্বাভাবিক।
তুফান আর কিছু বলতে পারল না।
টাকাটা বুকের কাছে চেপে ধরে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।
মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত অনেক হয়ে গেছে কিন্তু ততক্ষনে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
তুফান কিছুক্ষণ স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার শুকনো মুখটা।
আজ টাকা নিয়ে ফিরতে একটু দেরি হলো—বাবা কি অপেক্ষা করছেন?
কোনো উপায় না দেখে চোখ মুছতে মুছতে আবার ফুফুর বাসায় ফিরে গেল সে।
সারারাত তার ঘুম হলো না।
পরদিন খুব ভোরে বাসে উঠে যাত্রাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হলো তুফান। হাতে শক্ত করে ধরা সেই টাকা। মনে একটাই চিন্তা—বাবার ওষুধ কিনতে হবে, বাবাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
বাস এগিয়ে চলল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
মা।
তুফান ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কাঁপা কণ্ঠ—
—বাবার অবস্থা খুব খারাপ। তাড়াতাড়ি আয় বাবা।
তুফানের বুকটা ধক করে উঠল।
—মা, আর একটু সময় লাগবে। আমি ফার্মগেটের কাছে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার ফোন বেজে উঠল।
একই নম্বর।
তুফান কাঁপা হাতে ফোন ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই।
তারপর মায়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠ ভেসে এলো—
—তুফান… আব্বুর আর টাকা লাগবে না।
তুফান স্তব্ধ হয়ে গেল।
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—আর হাসপাতালে নিতে হবে না… তোমার আব্বু আর নেই বাবা।
কথাটা যেন বাসের ভেতরের সব শব্দকে এক মুহূর্তে থামিয়ে দিল।
তুফানের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল।
হাতে তখনও বাবার চিকিৎসার জন্য আনা টাকা।
যে টাকার জন্য গতরাতে সে এতটা পথ ছুটেছিল—
সেই টাকা আজ আর প্রয়োজন নেই।
বাস ছুটে চলেছে।
ফার্মগেট পেরিয়ে শহর তার নিজস্ব ব্যস্ততায় এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ স্কুলে, কেউ জীবিকার সন্ধানে।
শুধু তুফানের পৃথিবীটা থেমে গেছে।
সে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল অপলক।
চোখের সামনে ভাসতে লাগল বাবার মুখ।
মনে হলো, বাবা যেন বলছেন—
“বাবা, আর টাকা লাগবে না। এবার শুধু তুই একবার আমার কাছে আয়…”
তুফান চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু এবার আর বাবার কাছে পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই।
কারণ জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষটিই তার জন্য অপেক্ষা না করে চলে গেছেন—
চিরদিনের জন্য।

