নতুন এবং অভিনব
পুরাকালে এক পূর্নিমা রাতে কৈলাশ শিখরে শিব আর পার্বতী বসেছিলেন।যুগলে বসে আলাপ করছেন। আলাপের মাস তো বসন্ত,তাই বসন্ত সমীরণে পার্বতী আস্তে আস্তে শিবের কোলে মাথা রাখলেন। এতোক্ষণে হয়তো পার্বতীর চোখে ষোলকলার চাঁদ দৃষ্ট হয়নি। চারিদিকের গিরিশৃঙ্গগুলো চাঁদের আলোয় মোহময় হয়ে উঠেছিল।পার্বতী মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গগুলো চন্দ্রমায় ভাসছে। যেন একে অপরকে ধাক্কা মারছে, সদ্য যুবতীদের মতো খিল খিল করে হাসছে। চারিদিকের হাসির আওয়াজে চন্দ্র নিজেও লজ্জা পাচ্ছেন। তাই বুঝি মাঝে মাঝে মেঘের আড়ালে চলে যাওয়া ! পার্বতীর তো বেশ মজা লাগছিল।
মাঝে মাঝেই বলছিলেন, ‘চাঁদের লজ্জাটা দেখো।’ শিব পার্বতীর কাথায় মৃদুমন্দ হাসছিলেন।
প্রতি বসন্তের পূর্নিমায় একই দৃশ্য, চন্দ্রমার সেই মায়াবী খেলা পার্বতীর কাছে আর নতুন থাকে না। কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে যায়। একঘেয়ে বলতেও আপত্তি নেই পার্বতীর। সন্ধ্যা নামতেই বুঝতে পারেন পার্বতী, চন্দ্রের যাত্রাপথ এবং গিরিশৃঙ্গের লুকোচুরি খেলা। ভালো লাগছিল না তাই তিনি শিবকে বললেন, ‘ একটা গল্প বলো ‘।
শিব ভাবলেন, পার্বতী হয়তো চন্দ্রের জীবনকাহিনী শুনতে চায়। তাই তিনি বলতে শুরু করলেন ‘ চাঁদের বাবার নাম ছিল… ‘
পার্বতী শিবের মুখটা চেপে ধরে বলেন, ‘ না না চন্দ্রের গল্প নয়, অন্য গল্প। ‘
শিব অবাক হন, ‘ অন্য গল্প মানে ? ‘
পার্বতী সময় নষ্ট না করে উত্তর দিলেন, ‘ নতুন এবং অভিনব।’
(২)
আগামী পৃথিবীর গল্প যদি বাঙলা ভাষায় ভাবতে হয়, তাহলে হয়তো এরকম হবে, গল্পের নাম, ‘ আমি আর সীমা। ‘ তার নীচে লেখকের নাম। তারপর পুরো পাতাটাই সাদা থাকবে। কোন কোন লেখক দু’এক লাইন ক্লু দেবেন। পাঠক নিজের মতো করে গল্প লিখে নিতে পারবেন। পাঠক নিজের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গল্প বানাবেন। কেউ নায়ক হিসেবে শ্রীকান্তকে নিতে পারেন,কেউ গ্রগর সামসাকে নিতে পারেন, কেউবা হিজিবিজি বিজকেও চাইতে পারেন। যে যে-রকম চাইবেন,তিনি সেই রকম গল্প তৈরি করে নিতে পারতেন। এতে দুটো কাজ হবে। লেখক বা গল্পকার ক্লু দিয়ে দেওয়ায় তার গল্প যে-রকম হতে পারতো সে-রকম না হয়ে পাঠকের হাতে অন্যরকম হবে।একই চিন্তা থেকে দুটো চিন্তা প্রবাহ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। অর্থাৎ পাঠক গল্পকারের সৃজন শক্তির সাহায্য নিয়ে কথাকার হয়ে উঠছেন।
এর প্রথম এবং প্রধান কারণ আমাদের ছেলেমেয়েদেরা মাতৃভাষা বাংলা শিখছে না। তাদের বর্তমান পরিস্থিতি মাতৃভাষা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। মাতৃভাষায় চিন্তা করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা তাদের থাকবে না। তা-ই গল্পের বদলে সুত্র নয়, ক্লু দিতে হবে। তারা নিজের মতো করে গল্প নির্মাণ করে পাঠ করবে।
প্রাসঙ্গিক ভাবে সাম্প্রতিক ঘটনা বলি, না বললে যে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ! জন্মদিনের অনুষ্ঠান, নাচ গান খাওয়াদাওয়া প্রচুর প্রাচুর্যের প্রেক্ষাপটে উপহার স্বরূপ বাচ্চাদের বিভিন্ন গল্পের বই, ছড়ার বই, ভৌতিক গল্পের প্লট নিয়ে মজাদার বই, সাথে খ্যাতিমান লেখকদের বই তো আছেই… দেওয়া হলে… বাচ্চারা সমবেত ভাবে বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে বলল, বেঙ্গলি দিলে ? ইংলিশ নেই ?
এর কোনো উত্তর ছিলো না !
( ৩ )
ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন জানিয়েছেন, ‘ পুস্তক প্রকাশের প্রথম দিকে বটতলার খুব নামডাক ছিল।সেইসময় বিক্রেতারা বৈশাখ মাসে বড় বড় বোঁচকা বেঁধে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তেন। এঁরা গ্রামে গল্প বা কারও বাড়িতে পুস্তক পড়ে শোনাতেন। নিরক্ষর, অল্প শিক্ষিত লোকেরা পুস্তক পাঠ করতে না পারলেও পুস্তকের বিষয় বা কাহিনী জানতে পারতেন। তাতে তাদের কোনো অসুবিধা হতো না। ‘ পুস্তক পাঠের জন্য পাঠকরা কোনো পারিশ্রমিক পেতেন কিনা অবশ্য জানা যায় না। তবে হ্যাঁ, পুস্তক বিক্রেতারা গল্প, উপন্যাস, রামায়ণ, মহাভারত, পাঁচালি সব কিছু পড়ে শোনাতেন। তাতে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ হতো নিশ্চিত। না হলে এ পেশায় থাকবে কেন !
আধুনিক সময়ে লেখকরা তাঁর লেখা বিক্রি হবে অথবা নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হবে এই চিন্তায় বিভিন্ন শহরে যান। সেই শহরে বিশেষ বিশেষ জায়গায় নিজের প্রকাশিতব্য বা সদ্য প্রকাশিত বই পড়ে শোনান। কোথাও কোথাও বিশিষ্ট বাচিক শিল্পীরা পাঠে অংশগ্রহণ করেন।পাঠ আরও আকর্ষণীয় হয়। যারা এইসব অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হন, তাঁরা মন দিয়ে শোনেন, প্রশ্ন করেন, লেখক উত্তর দেন।
আগামী দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গল্প পড়ে শোনাতে হবে। পাঠকেরা গল্প এবং লেখক দু’জনের সঙ্গেই পরিচিত হবেন। ঘরোয়া আসরে আয়েস করে গল্প শুনবেন। তারপর গল্প বিষয়ক প্রশ্ন করতে চাইবেন।
( ৪ )
ইদানিং অণু গল্পের চল বেড়েছে। গল্পের আঙ্গিকে অণুগল্প নয়। গল্পের আকৃতি অণু পরিমাণ হচ্ছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ গল্প লিখতে হবে। লেখকেরা তো পিছিয়ে নেই। তিনি যতটুকু জায়গা পাবেন তার মধ্যেই গল্প লিখবেন। লেখক প্রতিনিয়ত তাঁর কথা বলার জন্য প্রস্তুত। স্থান টা তার কাছে বড় কথা নয়। পরমাণু গল্প লিখতে হয় আরও ছোট, সেখানেও লেখকরা সফল !
তিনশো শব্দের বদলে তিন লাইন বরাদ্দ হবে। লেখক লিখবেন ——-
‘ আমি আর বিতান বসে আছি।
অপেক্ষায়।
সুখ এখনও আসেনি।
( ৫ )
আগামী পৃথিবীর গল্প হবে নতুন এবং অভিনব।
লোকে নাকি ‘বই’ পড়ে না ! আর্থসামাজিক বিস্ফোরণের ফলে আমাদের সময় কমে গ্যাছে। সম্পর্ক পাল্টাচ্ছে, জীবন পাল্টাচ্ছে সাথে সাথে সমাজ পালটে যাচ্ছে। প্রচলিত একটা কথা আছে ‘এক নদীতে দু’বার স্নান করা যায় না ‘। কারণ কেউ তো নদীতে স্নান করে না, করে জল প্রবাহে। জল স্থির থাকে না, প্রবাহিত হয় অবিরাম। তাই প্রতি মুহূর্তে নতুন জলে স্নান করতে হয়। এমনকি যে জলে পায়ের পাতা ভেজে, সেই জলে হাঁটু ভেজে না। যে জলে হাঁটু ভেজে সেই জলে বুক ভেজে না। যে জলে বুক ভেজে সে জলে মাথা ভেজে না। সেই জন্যই এক জলে দু’বার স্নান করা যায় না। নদী এক জল আলাদা। অর্থাৎ নদী এক জল নতুন। সময়ও নতুন। নতুন সময়ে নতুন গল্প লেখক লিখতে চাইবেন,পাঠক নতুন গল্প পড়তে চাইবেন। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।বরং দাবিটা খুবই স্বাভাবিক। না চাইলেই অস্বাভাবিক হতো।
মনন এবং চিন্তনের পরিসীমা বহুমাত্রিক হচ্ছে। পাঠক আর শুধু মাতৃভাষার সাহিত্য পাঠ করছে না। পৃথিবীর যেকোনো ভাষার সাহিত্য তাঁর হাতের কাছে এসে যাচ্ছে। পাঠক আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। পড়ুয়ার আন্তর্জাতিকতা সাহিত্য নির্মাণে অন্য কিছু দাবি করছে। বিভিন্ন মানুষ ভৌগোলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জীবন যাপন করেন। জীবনের সত্যকে নিজের মতো করে গড়ে তোলেন। পাঠকের অভিযানের নেশা তীব্র হয়। পাঠক নিত্যনতুন অভিযান করতে চান। অভিনব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন তীব্রতর হয়। গল্প অভিনব হয়। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু সাহিত্য সে কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিমুহূর্তে গল্পের অভিনবত্বের বিস্তার দাবি করছি এবং সেটা প্রাপ্তিও হচ্ছে। তবেই তো সাহিত্য জগতের বটবৃক্ষ উচ্চশিখরে অবস্থান করবে নিজ মহিমায়।
