সুদেব মিস্ত্রী এর  লেখা ছোটো গল্প “কুয়াশার ভাঁজে লুকানো চিঠি “

সুদেব মিস্ত্রী এর লেখা ছোটো গল্প “কুয়াশার ভাঁজে লুকানো চিঠি “

 

কুয়াশার ভাঁজে লুকানো চিঠি

 

শীতের সকাল। রিনরিনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়ে আছে শহরের পথঘাট। আজ অদিতির মনটা ভীষণ অস্থির, কারণ আজই সেই দিন— যেদিন অরুণ প্রথম তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল। সেই দিনটি ছিল ঠিক এরকমই এক কুয়াশা ঢাকা সকাল।

অদিতি তার জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। কাঁচের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুছতেই তার চোখ গেল সামনে পার্কের বেঞ্চটার দিকে। পুরোনো, কাঠের বেঞ্চ, যেখানে পাঁচ বছর আগে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। কুয়াশার আবছা আলোয় বেঞ্চটিকে আজ আরও মায়াবী দেখাচ্ছে।

হঠাৎ অদিতির মনে পড়ল, অরুণ তাকে বলেছিল, “এই কুয়াশারা যেন আমাদের সম্পর্কের মতো। প্রথমটায় সব অস্পষ্ট থাকে, ভয় হয়, কিন্তু যখন ধীরে ধীরে কুয়াশা কাটে, তখন সবকিছু আরও সুন্দর, আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।”

সেদিনের সেই কথা মনে করে অদিতি আলতো হাসল। অরুণ এখন আর এই শহরে থাকে না, কর্মসূত্রে সে বহুদূরে। কিন্তু তার অনুপস্থিতি তাদের ভালোবাসাকে এক মুহূর্তের জন্যও দুর্বল করেনি। প্রতি বছর এই দিনে অরুণ তাকে কিছু একটা পাঠায়, যা তাদের প্রথম স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।

অদিতি দ্রুত হাতে তার পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির ভাঁজে ছিল অরুণের হাতে লেখা একটা ছোট্ট চিরকুট— সেই প্রথম দিনের।

‘জানিনা এটা কতটা রোমান্টিক, কিন্তু তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সকাল। কুয়াশা কেটে গেলে তুমি দেখবে, আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। – অরুণ’

চিরকুটটা পড়তে পড়তে অদিতির চোখে জল এল। এমন সময়, দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।

“কে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।

“আমি, ডেলিভারি বয়।”

অদিতি দরজা খুলে দেখল, হাতে একটা ছোট পার্সেল। ভেতরে একটা গরম কফির মগ আর ভাঁজ করা একটি চিঠি। কফির মগে লেখা: ‘হ্যাপি ফাইভ ইয়ার্স, মাই সানশাইন!’

আর চিঠিতে লেখা:

অদিতি, কুয়াশা আজও কাটেনি, কিন্তু আমার ভালোবাসার রং আগের চেয়েও উজ্জ্বল। আমি এই মুহূর্তে তোমার পাশে নেই, কিন্তু আমার মন বলছে, তুমি এখন আমাদের সেই প্রথম স্মৃতিটার কথা ভাবছো। আমি আগামী সপ্তাহেই ফিরছি। আর কোনো কুয়াশা নয়, এবার আমাদের ভালোবাসার গল্পটা পুরো শহরের সামনে পরিষ্কার হবে। শুধু তোমার, অরুণ।

চিঠিটা বুকে চেপে ধরল অদিতি। কুয়াশা আজও আছে, কিন্তু ভালোবাসার উষ্ণতায় তার মনের সব অস্থিরতা দূর হয়ে গেল। সে বুঝল, দূরত্বের বাঁধন তাদের হৃদয়ের বন্ধনকে আরও মজবুত করেছে। বাইরের ঠান্ডা আবহাওয়া যেন তাদের ভেতরের ভালোবাসার উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, কারণ তার জীবনের কুয়াশা কেটে গিয়ে এখন শুধু অরুণের ভালোবাসার আলো।

চিঠিটা বুকে চেপে ধরল অদিতি। কুয়াশা আজও আছে, কিন্তু ভালোবাসার উষ্ণতায় তার মনের সব অস্থিরতা দূর হয়ে গেল। সে বুঝল, দূরত্বের বাঁধন তাদের হৃদয়ের বন্ধনকে আরও মজবুত করেছে। বাইরের ঠান্ডা আবহাওয়া যেন তাদের ভেতরের ভালোবাসার উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, কারণ তার জীবনের কুয়াশা কেটে গিয়ে এখন শুধু অরুণের ভালোবাসার আলো।

পরের সাতটি দিন অদিতির কাছে সাতটি বছরের মতো দীর্ঘ মনে হলো। সে প্রতিদিন কাজের ফাঁকে অপেক্ষা করত, কখন সন্ধ্যা হবে, কখন অরুণ ভিডিও কলে আসবে। প্রতিবারই অরুণের চোখ টিপে হাসি দিয়ে বলত, “আর মাত্র কিছু দিন, তারপরই সারপ্রাইজ!”

নির্দিষ্ট দিনে, বিকেল চারটের সময় অরুণের ফেরার কথা। সেই দিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল ঝলমলে রোদ ঝলমলে। কুয়াশার কোনো চিহ্ন নেই। অদিতি আজ আর অস্থির নয়, বরং তার হৃদয়ে শান্ত আনন্দের ঢেউ। সে জানত, আজ তাদের পাঁচ বছরের অপেক্ষার একটা সুন্দর পরিণতি হবে।

অদিতি সুন্দর করে সেজে তৈরি হলো। ঠিক তিনটে পঁয়তাল্লিশে তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে অরুণের নাম দেখে তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

“হ্যালো, অরুণ!”

ওপাশ থেকে অরুণের গলা ভেসে এল, “হাই, আমার সানশাইন! আমি এয়ারপোর্ট থেকে এখন একটা ট্যাক্সিতে। আমি কিন্তু সরাসরি তোমার বাসায় আসছি না। তোমাকে আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার সেই জায়গায় আসতে হবে।”

অদিতি হাসল, “প্রথম দেখা হওয়ার জায়গা? মানে সেই পার্কে, কাঠের বেঞ্চটায়?”

“ঠিক তাই। আমি তো চাই, কুয়াশা কেটে যাওয়ার পরে আমাদের গল্পটা ঠিক সেইখান থেকেই শুরু হোক। পাঁচটা মিনিট সময় দিলাম, তৈরি হয়ে চলে এসো।” অরুণ হাসি চাপতে পারল না।

অদিতি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তার ভেতরে একটা অজানা উত্তেজনা কাজ করছিল। সে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।

পার্কে পৌঁছে অদিতি দেখল, বেঞ্চটা ফাঁকা। তার বুকটা একটু কেঁপে উঠল। অরুণ কি মজা করল? এমন সময়, পেছন থেকে কেউ এসে আলতো করে তার চোখে হাত রাখল।

“কে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।

“যে তোমার জীবনের কুয়াশা কাটিয়ে দিয়েছে,” ফিসফিস করে বলল অরুণ। তার পরিচিত গন্ধ, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস অদিতিকে শান্ত করে দিল।

অদিতি হাসতে হাসতে হাতটা সরিয়ে দিল। সামনে দাঁড়ানো অরুণকে দেখে তার মনে হলো, যেন প্রথম দিনের মতোই তারা দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ আর কুয়াশা নেই, আছে স্নিগ্ধ বিকেল বেলার মিষ্টি রোদ।

অরুণ হাঁটু গেড়ে বসল। পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল।

“অদিতি,” অরুণ আবেগভরা কণ্ঠে বলল, “পাঁচ বছর আগে এই কুয়াশার আড়ালে আমি তোমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলাম। আজ কোনো কুয়াশা নেই, তাই আমি স্পষ্ট করে, এই ঝলমলে রোদের নিচে, পুরো শহরের সামনে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি— তুমি কি আমার জীবনের শেষ কুয়াশাটা পর্যন্ত আমার হাত ধরে থাকবে? তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”

অদিতির চোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল। তার মুখে কেবল একটিই শব্দ ছিল: “হ্যাঁ!”

অরুণ রিং পরিয়ে দিতেই অদিতি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারা দু’জন সেই কাঠের বেঞ্চটায় বসল। বেঞ্চটার ওপরেই একটা লাল গোলাপ পড়েছিল।

অরুণ বলল, “দেখলে তো? কুয়াশা কেটে গেলে সবকিছু আরও পরিষ্কার আর সুন্দর দেখায়। আমাদের অপেক্ষাও আজ সার্থক হলো।”

অদিতি হেসে বলল, “আজ আমাদের গল্পটা কুয়াশার ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসল, অরুণ। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”

অরুণ আলতো করে অদিতির হাতটা ধরল। সূর্যের শেষ আলো এসে পড়ল তাদের ভালোবাসার ওপর। সেই মুহূর্তটা ছিল শুধু তাদের— এক সুন্দর পরিণতির গল্প।

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *