একটি বড়ই গাছ ও ছোট্ট মেয়েটি
সেদিন বেলা তখন প্রায় এগারোটা।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ততা।
নাহিদ নিজের দাপ্তরিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ খবর এলো—ডিসি স্যার তাকে ডেকেছেন।
নাহিদ দ্রুত স্যারের কক্ষে গেলেন।
—“নাহিদ, নিচে ফোর্স প্রস্তুত আছে। একটা বিশেষ অভিযানে যেতে হবে।”
নাহিদ একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, —“স্যার, কিসের ওপর অভিযান?”
ডিসি স্যার সংক্ষেপে বললেন, —“গোয়েন্দা তথ্য আছে। মাদক উদ্ধারে যেতে হবে।”
আর কোনো প্রশ্ন না করে নাহিদ প্রস্তুত হলেন। সঙ্গে নিলেন পেশকার কালাম সাহেবকে। নিচে নেমে দেখলেন, র্যাবের একটি চৌকস দল অপেক্ষা করছে।
নাহিদের সম্মতি পাওয়ার পর গাড়ি ছুটল মাদারীপুর শহরের চরমুগুরিয়া বন্দরের দিকে।
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে গাড়ি যখন একটু ভেতরের দিকে ঢুকল, তখন চারপাশটা ক্রমেই নির্জন হয়ে এলো। কিছুদূর গিয়ে একটি বাউন্ডারি ঘেরা কাঠের বাড়ির সামনে গাড়ি থামল।
র্যাবের সদস্যরা দ্রুত নেমে বাড়িটিকে ঘিরে ফেলল।
একজন জোরে ডাকলেন—
—“ফরিদ! বাড়ি আছ?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার ডাক—
—“ফরিদ বাড়ি আছ?”
নীরবতা।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর কাঠের দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে একজন মাঝবয়সী মহিলা।
মলিন মুখ। চোখেমুখে আতঙ্ক। যেন আচমকা আসা কয়েকজন মানুষের উপস্থিতিতে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছে।
র্যাবের একজন সদস্য জিজ্ঞেস করলেন,
—“ফরিদ কোথায়?”
মহিলা নিচু স্বরে বললেন,
—“বাজারে গেছে।”
—“তাকে ফোন দিয়ে আসতে বলেন।”
মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“আমার ফোন নেই।”
কথোপকথন চলতে লাগল। মিনিট পাঁচ, দশ…
নাহিদ তখন বাড়ির চারপাশটা দেখছিলেন।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল বাউন্ডারির দক্ষিণ কোণে।
একটি বড়ই গাছ।
গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে আছে আট-নয় বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে।
মেয়েটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে।
তার চোখে ভয়।
কৌতূহল।
আর এমন এক অসহায়ত্ব, যার ভাষা কোনো শিশুর জানা থাকার কথা নয়।
মেয়েটির পরনে ছিল সাদামাটা, পুরোনো একটি পোশাক। চুল এলোমেলো। মুখে শিশুসুলভ চঞ্চলতার কোনো ছাপ নেই।
নাহিদের মনে হলো—এই বয়সে তো তার মাঠে থাকার কথা।
বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়ানোর কথা।
বড়ই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকার কথা নয়।
কিন্তু মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।
চুপচাপ।
যেন পৃথিবীর সব শব্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
এরই মধ্যে র্যাবের দল ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।
মুহূর্তেই মেয়েটির চোখ বড় হয়ে গেল।
সে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
মা মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
কিন্তু নিজের চোখের জলটুকু লুকাতে পারছিলেন না।
ঘরের ভেতর তল্লাশি চলল।
দশ মিনিট…
বিশ মিনিট…
তারপর প্রায় আধাঘণ্টা।
আলমারি খোলা হলো। বিছানার নিচে দেখা হলো। ঘরের এদিক-ওদিক খোঁজা হলো।
কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না।
শেষ পর্যন্ত র্যাবের দল বাইরে বেরিয়ে এলো।
ফিরে যাওয়ার আগে একজন সদস্য হঠাৎ মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“আপনি না পুরান বাজার পল্লীতে ছিলেন?”
মহিলা এবারও অস্বীকার করলেন না।
সরল স্বীকারোক্তি—
—“জি, ছিলাম।”
কণ্ঠে কোনো প্রতিবাদ নেই।
কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু এক ধরনের ক্লান্তি।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“ফরিদকে বিয়ে করেছি। ভালো হওয়ার চেষ্টা করছি।”
এই কথাটি শুনে নাহিদ চুপ করে গেলেন।
তার চোখ আবার চলে গেল বড়ই গাছটির নিচে।
মেয়েটি তখনও মায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে।
কিছুদূরে একটি মাঠ।
সেখানে আশেপাশের বাড়ির কয়েকজন শিশু খেলছে।
কেউ দৌড়াচ্ছে।
কেউ হাসছে।
কেউ ফুটবল নিয়ে ছুটছে।
শিশুদের সেই হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে।
কিন্তু বড়ই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তাদের কাছে যাচ্ছে না।
একবারও না।
নাহিদের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
কেন মেয়েটি ওদের সঙ্গে খেলতে যায় না?
কেন সে একা থাকে?
কেন তার চোখে এই বয়সেই এত ভয়?
হয়তো আশেপাশের শিশুরা তার মায়ের অতীত জানে।
হয়তো বড়রা তাদের কিছু কথা শিখিয়েছে।
হয়তো কেউ তাকে বলেছে—
“ওদের সঙ্গে মিশবে না।”
হয়তো শিশুরাও না বুঝেই সেই কথাগুলো অনুসরণ করছে।
আর সেই অপরাধের বোঝা এসে পড়েছে একটি শিশুর কাঁধে।
যে শিশুর কোনো অপরাধ নেই।
সে তো তার মায়ের অতীত বেছে নেয়নি।
সে তো কোনো ভুল করেনি।
সে তো শুধু জন্মেছে।
আমাদের সবার মতোই স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে এসেছে।
তারপরও কেন তার শৈশবটা অন্যদের মতো হলো না?
কেন তার খেলাধুলার মাঠটি এত ছোট?
কেন তার পৃথিবীটা মায়ের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে গেল?
নাহিদের মনে হলো, সমাজ কখনো কখনো মানুষের ভুলের শাস্তি সেই মানুষকে না দিয়ে তার সন্তানকে দেয়।
যে শিশু কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না—তবু তাকে সারাজীবন একটা পরিচয়ের বোঝা বহন করতে হয়।
গাড়িতে ওঠার আগে নাহিদ শেষবারের মতো পেছনে তাকালেন।
বড়ই গাছের নিচে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।
দুটি চোখ স্থির।
অপলক।
করুণ।
সেই চোখে যেন একটি প্রশ্ন—
“আমি কী অপরাধ করেছি?”
নাহিদ কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়িটিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
মাঠের শিশুরা তখনও খেলছে।
হাসছে।
দৌড়াচ্ছে।
আর বড়ই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু নাহিদের চোখে সে দূরে গেল না।
সেদিনের পর বহুদিন কেটে গেছে।
অনেক অভিযান হয়েছে।
অনেক মানুষকে দেখেছেন নাহিদ।
অনেক অপরাধী ধরা পড়েছে।
অনেক ঘটনা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু সেই মেয়েটির চোখ—
সেই দুটি নিষ্পাপ অথচ ভীত চোখ—
নাহিদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি।
আজও কোনো শিশুকে মাঠে খেলতে দেখলে তার মনে পড়ে যায় সেই বড়ই গাছটির কথা।
মনে পড়ে যায়, পৃথিবীতে কত শিশু আছে যারা অপরাধ করেনি, অথচ অপরাধের ছায়া তাদের শৈশবকে গ্রাস করে রেখেছে।
মনে হয়—
একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে তার মায়ের অতীতের কোনো চুক্তি থাকে না।
একটি শিশুর কাঁধে তার বাবা-মায়ের ভুলের দায় চাপানো যায় না।
শিশুটিরও অধিকার আছে মাঠে ছুটে বেড়ানোর।
বন্ধুদের সঙ্গে হাসার।
বড়ই গাছ থেকে কাঁচা বড়ই পেড়ে খাওয়ার।
স্কুলে যাওয়ার।
স্বপ্ন দেখার।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
নিজের পরিচয়ে বেঁচে থাকার।
নাহিদ জানেন না সেই মেয়েটি আজ কোথায়।
জানেন না সে এখনো সেই বাড়িতে আছে কি না।
জানেন না কোনোদিন সে সেই মাঠে গিয়ে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলেছিল কি না।
শুধু জানেন—
সেদিন বড়ই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির করুণ চাহনি তার হৃদয়ের কোথাও একটা ক্ষত তৈরি করে গেছে।
সেই ক্ষত চোখে দেখা যায় না।
কোনো ওষুধে সারে না।
শুধু মাঝে মাঝে নীরবে রক্ত ঝরে।
আর নাহিদ তখন মনে মনে বলেন—
“মা, তোমার কোনো দোষ ছিল না।
তুমি শুধু ভুল সময়ে, ভুল মানুষের সমাজে জন্মেছিলে।
কিন্তু তোমার শৈশবের কোনো অপরাধ ছিল না।
তোমার চোখের সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজকেই একদিন দিতে হবে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামে।
কোনো এক মাঠে শিশুরা খেলছে।
হয়তো তাদের হাসির শব্দে আকাশও ভরে উঠছে।
আর নাহিদের মনে বারবার ফিরে আসে—
একটি বড়ই গাছ…
একটি ছোট্ট মেয়ে…
আর একজোড়া নিষ্পাপ চোখ—
যে চোখ আজও নীরবে জিজ্ঞেস করে,
“আমার কী দোষ ছিল?”

