লেখক নাসরাত আহমেদ এর লেখা কলাম–সত্যিকার অর্থে আত্মজ্ঞান অন্যদের জ্ঞানের বিশাল বিশাল বই থেকে অর্জিত বিপুল জ্ঞানের কোনো বড় বিষয় নয়।

লেখক নাসরাত আহমেদ এর লেখা কলাম–সত্যিকার অর্থে আত্মজ্ঞান অন্যদের জ্ঞানের বিশাল বিশাল বই থেকে অর্জিত বিপুল জ্ঞানের কোনো বড় বিষয় নয়।

সত্যিকার অর্থে আত্মজ্ঞান অন্যদের জ্ঞানের বিশাল বিশাল বই থেকে অর্জিত বিপুল জ্ঞানের কোনো বড় বিষয় নয়। এটি মানুষের এমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিকতা নয়, যা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা থেকে প্রতিদিন জ্ঞানের বিভিন্ন বই পড়ে চলে। বরং এটি আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে অর্জিত এক বিশেষ ধরনের উপলব্ধি—যা মনের আয়না পেরিয়ে হৃদয়ের আয়নার দিকে নিয়ে যায়।

আত্মজ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ যেভাবে জীবনের বিষয়গুলোকে দেখে, অন্য কোনো জ্ঞানী মানুষ সেই চিন্তার ধরনটিতে প্রবেশাধিকার পায় না। একজন আত্মজ্ঞানী মানুষ যেভাবে বিনয়ের সঙ্গে বিষয়গুলোর স্বচ্ছতার কাছে পৌঁছায়, অন্যরা সেভাবে পারে না। বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা যখন এক ধরনের একগুঁয়েমি ও অনমনীয়তায় ভোগে, তখন আত্মজ্ঞান সরলতাকে উপভোগ করে।

আত্ম-উপলব্ধির আত্মজ্ঞান পারস্পরিকভাবে সম্পর্ক, বোঝাপড়া, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সত্যের আয়নার কাছে পৌঁছায়। এটি মনের বুদ্ধিবৃত্তিক, দার্শনিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে না। কারণ এটি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক মনের বিষয়বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করে এবং সেই কারণে হৃদয়ের কার্যপ্রণালীর কাছে পৌঁছাতে পারে।

বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা থেকে জ্ঞানের যে বুদ্ধিবৃত্তিক সঞ্চয়, তা মনের বুদ্ধির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি মানুষকে তার পছন্দমতো মানুষের তৈরি নিয়ম, ধারণা, চিত্র, ব্যবস্থা, বিশ্বাস ইত্যাদির দিকে নিয়ে যায়, যাতে এসবের কার্যপ্রণালীর মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই সমস্ত কার্যপ্রণালী মানুষের পর্যবেক্ষণ, চিন্তা, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর কেবল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

এই বোঝা মানুষকে প্রভাবিত, শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত করে; ফলে মানুষ তুলনা, প্রতিযোগিতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি চক্রের মধ্যে চলতে থাকে। জীবনের এই চক্রাকার ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই মনের অশান্তি ও আক্রমণাত্মকতার জন্ম দেয়। জীবন, জীবযাপন ও চিন্তার এই চক্রাকার ব্যবস্থাই এমন সমস্যার কারণ, যা মানুষকে মানুষ থেকে এবং নিয়ম ও ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে।

বুদ্ধিবৃত্তিক সঞ্চয় ঐতিহ্য ও পরিবেশ থেকে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির কার্যপ্রণালীর মাধ্যমে মানুষকে শ্রেণিগত পার্থক্যের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি নিজের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধারণাকে ধরে রাখে ও লালন করে, যার ফলে মানুষ জীবনের একটি পরিচিত দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। জীবনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মনে এমনভাবে সঞ্চারিত ও আবদ্ধ হয়ে থাকে এবং আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত থাকে যে, তারা তার বাইরে যেতে পারে না।

প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই তার স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে এক ধরনের অনন্যতা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, যা নিজে নিজেই দেখতে, চিন্তা করতে এবং শিখতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাদের ব্যক্তিসত্তার মূল্য দিয়ে এই অনন্যতাকে ব্যয় করে ফেলে। কারণ সমাজের এই বুদ্ধিবৃত্তিকতা মানুষকে বিভিন্ন নামে যে ব্যক্তিসত্তা দেয়, তা প্রকৃত ব্যক্তিসত্তার অনন্যতা নয়; বরং সেটি এক কারাগারের মধ্যে বন্দী।

ব্যক্তিসত্তার অনন্যতা আত্মজ্ঞান ও আত্ম-উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত এক অসাধারণ বিষয়, যা উপরিতলে নয়, বরং বিষয়ের গভীরে অবস্থান করে। যখন এটি উচ্চতর ও সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে শেখে, তখন সংস্কৃতি, ধারণা ও জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্ত সামাজিক বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে। অনন্য ব্যক্তিসত্তার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অপরিহার্য।

যখন বিষয়টি এই ব্যক্তিসত্তাকে কেন্দ্র করে, তখন স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ব্যক্তিসত্তার এই স্বাধীনতা অনন্য; এর মধ্যে সাহস, প্রেরণা ও সৃজনশীলতা থাকে। ব্যক্তিসত্তার স্বাধীনতার সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে স্বাধীনতাকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগায়। এটি সেই স্বাধীনতা নয়, যা মানুষ কেবল প্রতিক্রিয়া জানানো বা নিজের ইচ্ছামতো পছন্দ করার জন্য চায়।

যখন একজন মানুষ আত্মজ্ঞান ও আত্ম-উপলব্ধি থেকে ব্যক্তিসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সে এমন স্বাধীনতা চায়, যা তাকে সমাজের সমস্ত আরোপিত বিষয়বস্তু, ধারণা, সংস্কৃতি ও জীবনের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করে। ব্যক্তিসত্তা এই স্বাধীনতাকে অর্জন ও উপভোগ করার জন্য ভেতরে ও বাইরে সংগ্রাম করে এবং তাকে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগায়। কিন্তু ব্যক্তিসত্তা যেভাবে স্বাধীনতা চায় এবং গড়পড়তা মানসিকতা যেভাবে স্বাধীনতা চায়, তা এক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ব্যক্তিসত্তার স্বাধীনতা কোনো প্রতিক্রিয়া বা পছন্দ নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি এক অপরিহার্য সাড়া ও দায়িত্ব। স্বাধীনতা ব্যক্তিসত্তার মধ্যে এক অনন্য সৌন্দর্য ও বিস্ময়, যা বাইরের জগতে প্রকাশের পথ খুঁজে পায়। এটি মানুষের, জনগণের, সমাজের, জাতির এবং বিশ্বের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কারণ এর মধ্যে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা, ভালোবাসা, মূল্য দেওয়া এবং সকলের প্রতি সমর্থন রয়েছে।

আত্মজ্ঞানের ব্যক্তিসত্তা যখন এক বিশেষ ধরনের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তা কোনো ভান ছাড়াই নিজেকে এবং অন্যদেরও সমাজের বন্ধন থেকে মুক্ত করে। কিন্তু মানুষ যখন মনে করে যে তার নিজের ইচ্ছামতো কাজ ও প্রতিক্রিয়া জানানোর স্বাধীন পছন্দ রয়েছে, তখন নিজেকে স্বাধীন মনে করাটাই এক ধরনের ভান। কিন্তু স্বাধীনতায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিসত্তা কোনো ভয় ছাড়াই বিষয়গুলোকে পর্যবেক্ষণ করে।

অতএব, আত্মজ্ঞান ও আত্ম-উপলব্ধি এমন এক ব্যক্তিসত্তার জন্ম দেয়, যে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত, কিন্তু অন্যদের অনুকরণ করতে চায় না। সে যখন নিজে চিন্তা করতে শেখার পথে এগিয়ে চলে, তখন তার অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতা নিজেই পর্যবেক্ষণ করে, অভিজ্ঞতা লাভ করে, চিন্তা করে এবং লেখে। সে নিজস্ব সৃজনশীলতায় অংশগ্রহণ করে; কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে বসে থাকে না।

মূল বিষয় হলো, একজন মানুষকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্ত ধারণার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে, যাতে সে তার ব্যক্তিসত্তা থেকে চিন্তা করতে শেখে এবং সেই ব্যক্তিসত্তাকে সৃজনশীলতার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। অন্যথায়, নিজের সত্তা নিয়ে জীবনে নিষ্ক্রিয় দর্শকের মতো বসে থাকা মানুষের জন্য এক গভীর দুর্দশা। কেবল ধর্মগ্রন্থ পড়া এবং প্রার্থনার স্থানে যাওয়া, কিন্তু নিজের ব্যক্তিসত্তা না থাকা—এটি দর্শকের মতো থাকা; এটি সৃজনশীল ধর্ম নয়।

যে মুহূর্তে একজন মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামাজিক ধারণা ও মানসিক কাঠামোর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়, সে ব্যক্তিসত্তার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে এবং নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকা বন্ধ করে। সে নিজের মনোযোগ ও শক্তিকে নিজের মতো করে সৃজনশীল হওয়ার দিকে পরিচালিত করে—সৃষ্টি ছোট হোক বা বড়। এখানে মূল্যবান বিষয়টি সে কী সৃষ্টি করছে তা নয়; বরং সে নিজের মতো করে কিছু সৃষ্টি করছে। আর সেই সৃষ্টির মধ্য থেকেই প্রকৃত আনন্দের জন্ম হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *