তারা কখন আসবে
রাস্তাটা এখন গর্তের ভাষা শিখে গেছে,
আর প্রতিটি পাথর মনে রেখেছে এক বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি-
কেউ একজন দেয়ালে লিখেছিল ‘উন্নয়ন’,
অথচ বৃষ্টিতে সেই দেয়াল আজও ফাটল ধরে-
কেউ একজন ঘোষণা করেছিল ‘আগামীকাল’-এর কথা,
আর সেই আগামীকাল এল গতকালের পোশাক পরেই-
মানুষেরা অপেক্ষা করে ভাঙা রাস্তার বাতির নিচে,
তারা আকাশের তারার বদলে কেবল ভাষণ গুনতে থাকে।
তারা কখন আসবে?
হয়তো তারা ইতিমধ্যেই আসছে,
ধীরে, নিঃশব্দে,
শিশুদের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নের ভেতর দিয়ে-
হয়তো তারা হেঁটে চলেছে
শ্রমিকদের ক্লান্ত পায়ের ছন্দে,
উদ্বিগ্ন চোখে মেঘ মাপতে থাকা কৃষকের মাঝে,
ওষুধের দামের হিসাব কষতে থাকা মায়ের চিন্তায়,
বই আর অনিশ্চয়তা বয়ে বেড়ানো শিক্ষার্থীদের পদক্ষেপে।
রাস্তা মানেই কেবল পিচ-ঢালা পথ নয়-
রাস্তা গড়ে ওঠে ন্যায্য মজুরি,
স্কুল, হাসপাতাল,
বিচার,
বিশুদ্ধ পানি,
নিরাপদ পথঘাট,
সততাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান,
আর ‘মর্যাদা’ নামের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন দিয়ে-
গাড়ির জন্য কোনো রাস্তা হয়তো মসৃণ হতে পারে,
অথচ মানুষের জন্য তা-ই হতে পারে ভাঙাচোরা।
কোপেনহেগেনে সাইকেলগুলো নিজের জায়গা দাবি করে,
সিঙ্গাপুরে ব্যবস্থা বা সিস্টেমগুলো ফিসফিস করে নির্দেশ দেয়,
রুয়ান্ডায় সমাজ গড়ে তোলে ইতিহাস-বিধ্বস্ত সবকিছু,
জাপানে সময়ানুবর্তিতা হয়ে ওঠে এক সামাজিক অঙ্গীকার,
ফিনল্যান্ডে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে সাম্যের প্রবেশদ্বার,
আর বাংলাদেশে গ্রামের কোনো শিশু আজও তাকিয়ে থাকে দিগন্তের পানে-
পৃথিবীটা যেন অসম্পূর্ণ সব রাস্তার সমষ্টি,
প্রতিটি দেশ বয়ে বেড়াচ্ছে নিজেদের আশার মানচিত্র।
কিন্তু এই মানচিত্রের মালিক কে?
মন্ত্রী?
মেয়র?
আমলা?
কোটিপতি?
ভোটার?
শিক্ষক?
কৃষক?
নাকি উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই তরুণ?
প্রশ্নটা কোনো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে চায় না।
তারা সেতুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
কিন্তু অনেক সময় কেবল তোরণই তৈরি করেছে-
তারা স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
কিন্তু অনেক সময় কণ্ঠস্বর মেপে দেখেছে-
তারা সাম্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
কিন্তু অনেক সময় সুযোগ-সুবিধা বিলিয়েছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো-
তারা উন্নত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
তারপর গরিব মানুষকে বলেছে আরও এক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে।
তারা কখন আসবে
স্লোগানের বদলে কাজের হাত নিয়ে?
কোনো নীতি কখন কাগজ থেকে বেরিয়ে
সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করবে?
কখন বাজেটটি সেই শিশুর জন্য ওষুধ হয়ে উঠবে যার তা প্রয়োজন?
কখন ন্যায়বিচার আর বিলম্বিত হবে না?
কখন সরকারি পদ কেবল পদ না থেকে প্রকৃত জনসেবায় পরিণত হবে?
কখন নেতৃত্ব ‘জনগণ’ শব্দটিকে মনে রাখবে?
হয়তো আমরা এমন সব নায়কের অপেক্ষায় আছি
যারা মূলত নির্বাচনী পোস্টারেই সীমাবদ্ধ-
হয়তো সেই মসৃণ পথটি
কখনোই আকাশ থেকে নেমে আসবে না-
হয়তো তা গড়ে তুলতে হবে
হাজারো সাধারণ মানুষের হাতে—
একটির পর একটি সৎ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে,
একটির পর একটি স্কুল মেরামতের মাধ্যমে,
একটির পর একটি স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে।
সেই পথ-নির্মাতা হতে পারেন—
সেই শিক্ষক যিনি কোনো ছাত্রের হাল ছাড়েন না,
সেই নার্স যিনি প্রতিটি রোগীর সাথে শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেন,
সেই কৃষক যিনি শহরকে অন্ন জোগাচ্ছেন,
সেই প্রকৌশলী যিনি দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন,
সেই সাংবাদিক যিনি ঝুঁকিপূর্ণ প্রশ্নটি করেন,
সেই নাগরিক যিনি অন্য নাগরিকের অধিকার রক্ষা করেন।
তবুও মানুষ প্রশ্ন করে—
তারা কখন আসবে?
উত্তরটি প্রতিধ্বনিত হয়
একটি অসমাপ্ত সেতুর কাছ থেকে:
পদধ্বনির জন্য অপেক্ষা কোরো না
যখন তোমার নিজের পা-ই এগিয়ে চলেছে-
ইতিহাসের জন্য অপেক্ষা কোরো না
যখন ইতিহাস তোমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
নিখুঁত নেতার জন্য অপেক্ষা কোরো না
যখন দায়িত্ব পালনের কোনো নির্দিষ্ট ‘নিখুঁত’ রূপ হয় না-
তবুও মানুষ কেবল অনুপ্রেরণামূলক কথার চেয়েও বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্য-
তারা যোগ্য এমন সব প্রতিষ্ঠানের যা কার্যকর,
এমন আইনের যা সুরক্ষা দেয়,
এমন নেতার যারা কথা শোনেন,
এমন স্কুলের যা মনকে মুক্ত করে,
এমন অর্থনীতির যা সুযোগ সৃষ্টি করে,
এবং এমন পথের যা কোনো বৈষম্য করে না-
তারা এমন এক ভবিষ্যতের যোগ্য
যার অস্তিত্বের জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
তাই তাদের আসতে দাও—
ত্রাতা হিসেবে নয়,
রাজা হিসেবে নয়,
আগামীকালের মালিক হিসেবে নয়,
বরং সাধারণ কল্যাণের সেবক হিসেবে-
তারা আসুক জবাবদিহিতা নিয়ে,
সাহস নিয়ে,
সহমর্মিতা নিয়ে,
প্রমাণ নিয়ে,
ধৈর্য নিয়ে,
এবং সেই বিনয় নিয়ে যা দিয়ে তারা মেরামত করতে পারবে
যা তারা নিজেরা তৈরি করেনি।
আর যদি তারা না-ই আসে,
তবে মানুষ আবারও প্রশ্ন তুলুক-
প্রশ্নটি হয়ে উঠুক এক সতর্কবার্তা—এক ঘণ্টার ধ্বনি-
তা বেজে উঠুক সংসদে,
শ্রেণিকক্ষে,
বাজারে,
গ্রামে,
শহরে,
এবং প্রতিটি সেই আরামদায়ক কক্ষের ভেতরে—
যেখানে মানুষের দুর্ভোগ কেবল এক অস্পষ্ট পটভূমির শব্দে পরিণত হয়েছে।
তারা কখন আসবে
আর মানুষের জন্য পথ সুগম করবে?
হয়তো এর উত্তর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নয়-
হয়তো এটি একটি সিদ্ধান্ত-
হয়তো পথটি আরও মসৃণ হয়ে ওঠে—
যখনই ক্ষমতা বিশেষ সুবিধার বদলে সেবাকে বেছে নেয়,
যখনই নীরবতা সত্যকে বেছে নেয়,
যখনই কোনো নাগরিক দায়িত্ববোধকে বেছে নেয়।
পথটি এখনও বন্ধুর-
পাথরগুলো এখনও সেখানে পড়ে আছে-
কিন্তু সামনে কোথাও,
এক প্রজন্ম কাজের হাতিয়ার হাতে এগিয়ে চলেছে-
তারা কোনো অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় নেই-
তারা নতুন মানচিত্র আঁকছে-
তারা ভাঙা সেতু মেরামত করছে-
তারা প্রশ্নগুলোকে পদক্ষেপে রূপান্তর করছে-
আর মানুষ, অবশেষে,
একসাথে চলতে শিখছে।
=0=

