লেখক মতিউর রহমান এর ধারাবাহিক -আমার পুলিশ জীবন

লেখক মতিউর রহমান এর ধারাবাহিক -আমার পুলিশ জীবন

আমার পুলিশ জীবন

(পর্ব-১৭)

ইতোমধ্যে ট্রেনিং এর বেশ কয়েকদিন পার হয়েছে। কঠোর প্রশিক্ষনের সাথে সবাই কিছুটা ধাতস্থ হতে শুরু করেছে। নিজের কোম্পানির সদস্য সহ অন্য কোম্পানির বেশ কিছু সদস্যের সাথেও কছুটা ঘনিস্টতা তৈরী হয়েছে। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সারাদিনে ব্যস্ত কর্ম্যকান্ডের সাথে মোটামুটি মানিয়ে নিতে শুরু করেছে সবাই। কয়েকজন ছাড়া প্রায় প্রত্যেকের কঠিন পরিশ্রমের ফলে সৃষ্ট হাত পায়ের ব্যথা কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

পরিবারের সদিস্যদের সাথে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হল চিঠি আদান প্রদান। চিঠি নিয়ে পিওন আসলেই মন ভাল হয়ে যায় সবার। একটা চিঠির জন্য সবার কি অপেক্ষা! কারও কারও প্রেম ভাববাসার সম্পর্কের খবর ব্যাচমেটদের মধ্যে চাউর হয়েছে এবং এই নিয়ে হাসি ঠাট্টাও চলে নিজেদের মধ্যে। সব মিলে একটা হার্ড ট্রেনিং এর মধ্যেও কিছুটা ভাল লাগা শুরু হয়েছে।

প্রশিক্ষন মাঠের ত্রাস ইন্সট্রাক্টরদের (হাবিলদার) সাথেও কিছুটা সখ্যতা তৈরী হয়েছে। প্রত্যেক কোম্পানির একজন করে মনিটর নির্বাচিত করা হয়েছে। যার কাজ প্রতিদিনের কাজকর্মের রুটিন জানিয়ে দেয়া। পিটি প্যারেডের আগে সবাইকে মুক্তাংগন এ মিলিত করা। আর ট্রেনিং এর কস্ট যেন কম হয় তার জন্য বখশিষ হিসাবে প্রত্যেক ট্রেনিস এর কাছে অতি গোপনে প্রতি মাসে কিছু টাকা কালেকশন করে তা বিএইচএম ( হাবিলদার মেজর) এর কাছে জমা দেয়া। প্রতিজন মাঠের জন্যে দেড়শো, ল ক্লাসের জন্য দুইশো, হর্স রাইডিং এর জন্য একশো টাকা করে দিবে এরকম একটা গোপনীয় অলিখিত চুক্তি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়েছে। এই কার্যক্রম অতি গোপনে করা হইত।

আমাদের সময় সারদা পুলিশ একাডেমী’র তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন ডিআইজি জনাব শহুদুল হক। যিনি আর্মি থেকে জিয়া আমলে পুলিশে আত্নীকরনকৃত বেশ কিছু আর্মি অফিসারদের অধ্যে একজন। অত্যন্ত স্নার্ট, গুড লুকিং এবং কড়া অফিসার হিসাবে তাঁর সুনাম ছিল। সারা একাডেমী তার ভয়ে কম্পমান থাকলেও মাঠ পর্যায়ের এই সিন্ডিকেট অতি গোপনে এই কর্মকান্ড চালিয়ে এক্সাচ্ছিলেন। শুনেছি যে একটা পর্যায় পর্যন্ত সিনিয়র অফিসার এই কাজের সাথে জড়িত ছিল।

আমরা তখন প্রশিক্ষনকালীন ভাতা পাইতাম ৫৪৭/ টাকা। যার মধ্যে মেসে খাবারের জন্য রেশনে কিছু টাকা ব্যয় হইত। আর প্রতিমাসে সবাই বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসত অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য। একজন প্রশিক্ষনার্থীর এক বছরের ট্রেনিং শেষ করতে সব মিলিয়ে পঞ্চাশ হাজার হতে এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলে শুনেছি।

আমাদের ট্রেনিং শুরুর পর পরই এপ্রিল মাসে সেই বছর রোজা শুরু হয়। এপ্রিল মাসের চরম তাপদাহে আমরা অনেক কস্ট করে ট্রেনিং এর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এর মধ্যেও বেশ কিছু প্রশিক্ষনার্থী রোজা রেখেছিল। তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসত।

সবার মাথায় একটাই চিন্তা রোজার ঈদে ছুটি হবে কিনা। দেড় মাসের উপর পার হয়ে গেছে বাড়ি থেকে আসা। বেশির ভাগ প্রশিক্ষনার্থী ক্যাডেটের এক নাগাড়ে দেড় মাস সময় বাড়ি থেকে বাইরে থাকা হয়নি কখনও। তাও আবার কঠিনতম ট্রেনিং এ থেকে। রোজা শেষে ঈদে বাড়ি যাবে এই ভাবনায় সবাই কেমন যেন মনে চাঁপা আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছে। নতুন চাকরি, প্রথম ঈদ, এতদিন বাড়ি থেকে বাইরে থাকা, সব মিলিয়ে একটা উত্তেজনা কাজ করছে।

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *