মুয়াবিয়া ইবনে এজিদের জবানবন্দি-১
ইসলাম এক পরশ পাথর। তার স্পর্শে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সব সোনা হল। আরব জাহানে উদিত সূর্যে বিশ্ব হল রাঙা। সে রাঙা প্রভাতের আলোয় অন্ধকার দূরীভূত হল- কত জড় পেল প্রাণ, তরী পেল তীর; অন্ধ পেল জ্যোতি, বধির-কালা পেল জীবনের সংগতি।
চারিদিকে তখন শুধু জয়গান। এখন আর ৩শ নয়, ডাকার আগেই জড়ো হয় ৩ লাখ। ৪ খলিফার যুগ- সাম্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ইসলামের দ্বিপ্রহর। হঠাৎ দ্বিপ্রহরের ঝকঝকে আকাশে কালো মেঘের হানা, ক্ষুদ্র মরুঝড়ে সবকিছু হল ফানাফানা। তারপর….…! সেসব সোনালী অতীতের উপর লিখিত আশাজাগানিয়া রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর উপন্যাস ” মুয়াবিয়া ইবনে এজিদের জবানবন্দি”। আজ তার প্রথম পর্ব।
প্রাককথন
হযরত আদম (আ:) ছিলেন আমাদের আদি পিতা আর মা হাওয়া আদি মাতা। আদম-হাওয়া দম্পতি থেকে জগতে মানবজাতির সূচনা। ছোট পরিবার বৃদ্ধি পেতে পেতে আজ তা বিশাল।
মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে বহুকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। কালের পরিবর্তনে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন সভ্যতা। সময়ের পরিবর্তনে সভ্যতার প্রয়োজনে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। সমাজ বিনির্মানে কোন কোন মানুষের ভূমিকা ছিল কালান্তরি। মহম্মদ (স:) ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি সর্বশেষ ওহীপ্রাপ্ত, খাতামুন্নবী- পরিপূর্ণ হেদায়েতপ্রাপ্ত। এর পর থেকে আল্লাহর হেদায়েত সরাসরি আসা বন্ধ। মহম্মদ (স:) মৃত্যুর পর কেবল পূর্বের ওহী (আল কোরান) আর তার জীবনাদর্শ (হাদিস) হেদায়েতের উৎস।
মদিনায় মহম্মদ (স:) আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করেন। তার অন্তর্ধানের পর পর্যায়ক্রমে ৪ জন খলিফা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। এরা সকলে ছিলেন আল্লার নবির ঘনিষ্ঠ সহচর। ইসলামের পরিভাষায় সাহাবী। তারা ওস্তাদ মহম্মদের (স:) দেখানো পথে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।
সময় বয়ে যায়। মুসলিম জাহানের কলেবর বাড়তে থাকে। নানান শাখা-প্রশাখার সূচনা হয়। খলিফাযুগের পরে মুসলিম জাহানের মসনদে আসীন হন মুয়াবিয়া (রা:)। তিনি ১ম আমির। লোকে তাকে বলত আমির মুয়াবিয়া। তিনিও নবী মহম্মদের (স:) সাহাবী ছিলেন।
তিনি ইসলামের মৌলিক কাঠামো অনুসারে রাজ্য চালাতে থাকেন। ইসলামের মৌলিকত্ব হল এক স্রষ্টা আর আর তার অগুনতি সৃষ্টি- মহারাজার অজস্র রাজা-প্রজা। রাজা যেমন আমির পৃথিবীতে মহারাজার প্রতিনিধি, বিমূর্ত মহারাজার সসীম মূর্তি। মহারাজা গুণে অশেষ, নীতিতে নিষ্ঠ। সীমাহারা আরশে তার অবস্থান। তিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা, সবজান্তা। তিনি অনাদি ও অনন্ত। তন্দ্রা, নিদ্রা কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। তিনি কায়াহীন, ছায়াহীন, মাত্রাহীন।
জগৎ সৃষ্টির বহুকাল পরে আদম-হাওয়ার সৃষ্টি। তারপর ধুলির ধরায় আগমন। কালান্তরে ধনে, জনে, বলে চারিদিকে পূর্ণ। নবী মহম্মদ (স:) এর আগমন ও তিরোধানে পৃথিবী পরিপূর্ণ। চারিদিকে শুধু জয়ের ডঙ্কা। ক্রমেক্রমে প্রলয়-আশঙ্কা। শেষ বিকেলের লাল আভায় জগৎ তখন রাঙা। আমির মুয়াবিয়া গত হয়েছে, রাজা হয়েছে তার পোলা। নাম ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া। দিনের সূর্য রাতে হারায়। কারবালার হাহাকার ফুরোতে না ফুরোতে কাবা জ্বললো আগুনের শিখায়। কাবার দহন কাবার মালিকের জন্য অসহনীয়। ফলে হন্তারক, অগ্নিসংযোগকারী, চরম অসহিষ্ণু ইয়াজিদকে আকষ্মিক কিন্ত উপায়হীনভাবে পৃথিবী ছাড়তে হলো। মসনদে আসীন হল তারই পুত্র মুয়াবিয়া ২- মুয়াবিয়া ইবনে এজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে সুফিয়ান। আল্লাহ ভয়ে তিনি সর্বদা ভীত থাকতেন। ইতিহাস তার চোখের সামনে ছিল। তিনি পৃথিবীতে আমির না হয়ে হতে চাইলেন খলিফা। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন। মসনদ ত্যাগের ৪০ দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে বলতে না পারা তার অব্যক্ত বক্তব্যই জবানবন্দি।
জবানবন্দি -১
আমি তখন ব্যাথা বিমারে বেহুশ। কপালের নিচে গাড়ির হেডলাইটের মত দুটো চোখ আছে, কিন্ত তাতে তখন কোন আলো নেই। সেই চোখের পাতা, অক্ষিগোলক, আইরিশ, সেই পিউপিল সবই আছে; নেই শুধু জ্যোতি, দেখার কোন শক্তি। মাথার দুই পাশে একজোড়া কান আছে, কিন্ত শোনার সামর্থ নেই। শক্ত চোয়ালের উপরে বাঁশির মত দুটো নাক আছে, কিন্ত তখন গন্ধ নেওয়ার কোন দরকার নেই। মুখের ভিতরে জিহবা আছে, কিন্ত তাতে সুগন্ধ-দুর্গন্ধের কোন অনুভূতি নেই। স্পর্শ অনুভূতি একেবারে শুন্য। মানুষ হিসেবে আমার আর কোন দর্প নেই।
জানের বিবি, ভালোবাসার সন্তান-সন্ততি সকলি বেঘোরে ঘুমে আচ্ছন্ন। পঞ্চ ইন্দ্রীয়ের সকল কার্যক্ষমতা চিরতরে লোপ পেয়েছে। হয়ত নিমিষেই আমার ইহকাল শেষ হবে!
ফজরের নামাজ শেষ হলো। মাত্র ৪০ দিন আগে ইমামের আসন ছেড়ে আমি মুসল্লীর কাতারে শামিল হয়েছি। সালাম ফেরানোর রেশ তখনো কাটেনি। অজানা কারনে মাথাটা ভারী মনে হলো। ক্ষণকাল জায়নামাজেই মাথাগুজে পড়ে থাকলাম। তক্ষুণি বিরাট কায়ার অজানা পুরুষের আগমন হলো। আমার কর্ণকুহরে অজানা পুরুষের আসসালামু আলাইকুম ধবনি শুনে মুদ্রিত নয়নে সর্বশক্তি দিয়ে আমি জবাব দিলাম। বসার ইচ্ছে হলো- উঠতে পারলাম না। আমার চোখ দুটো ভয়ে প্রায় বিস্ফোরিত হলো, মুখ শক্ত হল, কান খাড়ার কসরত করলাম; কিন্ত সব ফলহীন, বৃথা গেল।
৪০ দিন পূর্বে আমি মুসলিম জাহানের সিংহাসন ত্যাগ করেছিলাম। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, স্বজন-সহযোগি আজ সকলেই আমাকে পরিত্যাগ করেছে; বুঝতে পারছি পৃথিবীতে আমি মূল্যহীন। সিংহাসনের জন্য পরিবারের নিকটতম কোন সুহৃদ হয়ত আমাকে দিনে দিনে বিষ প্রয়োগ করেছে। চিরদিনের জন্য এ ভূবন ত্যাগের পূর্বে আমি আমার বয়ান রেখে যেতে চাই।
আমি মুয়াবিয়া। মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া। আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশে আমার জন্ম। লোকে আমাকে দ্বিতীয় মুয়াবিয়া হিসাবে জানে। ২৪ মার্চ, ৬৬১ সনে দামেস্কে আমার জন্ম। সেই বছর আমার দাদা মুয়াবিয়া ইবনে সুফিয়ান এক সন্ধিসূত্রে হাসান ইবনে আলীর নিকট হইতে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এ সময় ইসলামের বিজয়ের নিশানা চারিদিকে দ্রুত ধাবিত হতে থাকে। ঘোড়ার রেসের পরিধি বাড়ে, অগুনতি ঘোড়সওয়ার তাতে শামিল হয়। কিন্ত হায়! কমতে থাকে দক্ষ সহিস।
রাজাধিরাজ মহারাজার কুরসি তলে আশ্রয়ের পরিবর্তে রাজার ক্ষুদ্র সিংহাসন জীবনের লক্ষ্যে পরিণত হয়। এক সময় মসনদকে ঘিরে শুরু হয় রক্তারক্তি। খুনের অমোচনীয় দাগে সে মসনদ হয় অপবিত্র। চারিদিকে খুনের কটুগন্ধে নি:শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে যায়।
আজ ৬৮৪ সাল, আমার মৃত্যুক্ষণ। ২২ বছর বয়সে আমি মুসলিম জাহানের ক্ষমতার মসনদে আরোহন করি। ২৩ বছরেই ইহলিলা সাঙ্গ হতে যাচ্ছে। যে মসনদের জন্যে এত রক্তারক্তি, খুনের ছড়াছড়ি, তা ছেড়ে আমি মহাপ্রভুর দরবারে হাজির হতে যাচ্ছি।
Leave a Reply