সাধ মিটানো !
॥ সাজাহান সরদার ॥
যখন মাঝ রাতে ঘুম ভেঁঙ্গে যায় ; খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে আছরে পরে আমার বিছানায় , চোখে , মুখে । দূরে , লাউড স্পীকারে অবিরাম বেজে চলে খালেক দেওয়ানের গান —
‘ মা লো মা , ঝি লো ঝি
করলাম কি , রঙ্গে ;
ভাংঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাংঙে ‘ ! কিংবা ,
- ‘ বাপের বাড়ি ছাড়িয়া কন্যা
শ্বশুর বাড়ি যায় ….. ‘
এমন একটার পর একটা গান বেজেই চলে। আন্দাজ করি গান বাজছে আশেপাশের
কোন গ্রামের বিয়ে বাড়িতে । মধ্যরাতের
নির্জনতায় একলা ঘরে গান শুনতে ভাললাগা
মাত্র শুরু হয়েছে অষ্টম শ্রেনী পড়ুয়া আমার !
লোক-গানে খুব যে আমার মনযোগ ছিল
তা নয় ! কলের গানের সুবাদে খুব ছোটবেলা থেকেই আমার মনযোগ তৈরী হয়ে যায় গীতা দত্ত , হেমন্ত , মান্না দে , শ্যামল, সন্ধ্যা , প্রতিমার যাদুকরী গানে । তবুও নিশি রাতের গান আমাকে টানে , আমোদিত করে । আমি কান খাড়া রাখি ,
শুনি মাটি-মানুষের গন্ধ মাখা গান , ব্রাত্যদের
প্রানের সুর।
সুর-ছন্দ ও বাজনার সম্মোহনে কাতর আমি শৈশব থেকে । শিল্প-সংস্কৃতি , সাহিত্য , বিজ্ঞান , দর্শন , ফ্যাশন , প্রকৃতি , – এই সবের আগে আমাকে ছুঁইয়েছে সুর ছন্দ ও বাজনা । আমার মর্মে সুরের প্রথম প্রবেশ সরদার পাড়া জামে মসজিদের মিনার চূড়া থেকে ভেসে আসা আযান ধ্বনি । আমার শ্রবন ইন্দ্রিয় মোহিত হয়েছে ভোরবেলা মায়ের সুর করে কোরান পাঠ শুনে শুনে । তারপর এক এক করে নানা সুর-ছন্দ ও বাদ্য-বাজনা আমার ভেতর ঢুকতে থাকে । সাঁজ-বেলার ঘন্টা আর শঙ্খ ধ্বনি , পূজার ঢাক-ঢোল , কীর্তন , দাদীর শোক ও মৃত্যু গীতি , গাঁয়ের মহিলাদের সমবেত বিয়ের গান , গ্রাম বালিকার ছড়ার ছন্দ এবং আরও কত কিছু যে ঢুকে গেছে রিদ মাঝারে , সেই শৈশবে । সবচেয়ে ভীতিকর শ্রবন ছিল আমার দাদীর কন্ঠের মৃত্যু-গীতি । সন্ধ্যা রাতে যখন দাদীর কাছে গল্প শুনতে যেতাম তখন দাদী এ রকম ভীতিকর গীত শোনাতেন । সুর , ছন্দ , গান , ছড়া এই
সব কিছুকে গীত বলতেন দাদী । হারিকেনের
নিবু নিবু আলোয় প্রায় অন্ধকার ঘরে তার সেই ভয়াল গীত শুনে বরফ শীতল হয়ে ঘুমিয়ে পরতাম । ওই ভয়ার্ত গীতের একটির নমুনা
ছিল এই রকম :
“ হিয়ালে ডাক দিয়া কয়
গিদ্দীন রে ভাই
এই মুদ্দারের শরীরে
নেকের গন্ধ নাই “ !
দাদী গলা কাঁপিয়ে মিহি সুরে গীতখানি শেষ করে তা আবার আমার বোধ্য ভাষায় তরজমা
করতেন । উন্মুক্ত গোরস্থানে মরা লাশের মাংস খেতে এসেছে শিয়াল এবং গৃধিনী বা রাজ
শকুন । শিয়াল কিছু মাংস খেয়ে গৃধিনীকে ডেকে বলছে : ওহে গিদ্দীন ভাই এই মুদ্দারের ( লাশের )
শরীরে নেকের বা পুণ্যের গন্ধ নাই , অর্থাৎ এই
লোক নেকী বা পুণ্যবান ছিলনা । অতএব এর
মাংস খাওয়া পাপের কাজ হবে । এর শানে নজুল
ছিল পাপ বিষয়ে আমাদের সতর্ক করা ।
ছোট বেলায় একবার গ্রামে হৈই চৈই পরে গেল ;‘ রূপবানের গান আইছে রতনপুর গ্রামে , জোতি দাশের নাট্য মন্দিরে , খালপাইড়া দল ‘ । কয়েকদিন দশ গ্রামের লোক রাতভর গান শুনে আর দিনভর নাক ডেকে ঘুমায় । লোকের মুখে মুখে রূপবানের গান –
‘ ও দাইমা কিসের বাদ্য
বাজেগো … ‘ । শুনে শুনে আমিও দুই-চার লাইন শিখে ফেললাম :
‘ আমায় যদি ভালবাস গো ,
ও রহিম কিনা দেব ঘোড়ারে …. ‘ ।
নবম দশম শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন আহমদ রুশদী , মালা , আইরিন পারভিন , রুনা লায়লা, নূরজাহানের উর্দু গানে ভেসে গেলাম । লুকিয়ে লুকিয়ে আহমদ রুশদী চর্চা করি । বয়েস আঠারো পূর্ণ হলে মুকেশ , মেহেদী হাসান , লতা , কিশোর কুমারে ঝুঁকে পরি । কিশোর কুমারের বাংলা ও হিন্দী গানে গলা মিলাই । একটা সময় নজরুল গীতি আমাকে মাতাল করে তোলে ! আমি লাজ-লজ্জা ভুলে গিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করি ।
সাধ মিটাই । কেউ কেউ তাৎখনিক আবিষ্ট হয়ে আমার কন্ঠে সুর আছে বলে পিঠ চাপড়িয়েছে ! ব্যাস ওই টুকুই , সুরের চাষি আমি হতে পারিনি , শুধুই সাধ সাধ খেলা !
রাখাল ছেলের গল্পের মতোই বাঁশি ও বাজনা
আমাকে মুগ্ধ করেছে । বিশেষত: বাঁশি ! ‘ বাঁশির শব্দে মুই আউলাইলি রন্ধনে’র মতো আমি
বংশীবাদকের সুরের পেছনে
ছুটতাম ।
নিশি রাতের বংশীবাদক ছিলেন
আমার গৃহ-শিক্ষক শহাবঊদ্দীন মাস্টার ।
রাতের বেলা ঝোঁপ-জঙ্গলের আড়ালে বসে
নলের বাঁশি বাজাতেন । গাঁয়ের লোকেরা ফিস-ফাঁস করতো তাঁর এই অপরাধ কর্মের জন্য । নলের বাঁশি বাজানো ছিল পাপ কাজ । কেন বাঁশি বাঁজানো পাপের কাজ তা আমার বোধগম্য ছিলনা । তবু ভয় ডর উপেক্ষা করে তাঁকে আড়ালে ডেকে আমার বাসনার কথা বলি : স্যার আমাকে বাঁশী বাজানো শেখাবেন । তিনি গোপনে আমাকে তালিম দিয়েছেন । আমিও দুই চার দিন বাঁশি বাঁশি খেলেছি , আমার সাধ মিটেছে , ওইটুকুই !
প্রতিবেশী ছানু শেখ বেনজু নামক একটা যন্ত্র বাঁজাতেন । ওটা ছুঁতে , বাজাতে , আমি তাঁকে বিড়ি ঘুষ দিয়েছি ! বেনজুর রিডে হাত চালিয়ে চেষ্টা করেছি , সাধ মিটিয়েছি । ছানু শেখ সেই সূযুগে আমার কাছ থেকে এক আনা দুই আনা গুরুদক্ষিণা আদায় করে নিয়েছে । আব্দুল হাই কানা বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করতো দোতারা বাঁজিয়ে । আমার খুব বাসনা ছিল গলায় দোতারা ঝুলিয়ে বাঁজিয়ে পথে পথে গান করবো !
এক-আধবার আব্দুল হাইয়ের দোতারাটা ছুঁইয়ে
দেখা এবং তার টেনে ঝংকার তোলার সুযোগ পেয়েই ধন্য হয়েছি ! বিনিময়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে
এক পুরা চাল এনে আব্দুল হাই’র হাতে
তুলে দিয়েছি ।
আমাদের এলাকায় ছিল একটা বাজাইন্না বাড়ি ।বাদ্যকরের নাম নগেন । তার ছিল বিরাট দল । বিয়েশাদী , পূজা , কপাডী খেলা , ঘুড়ি প্রতিযোগীতা ও উরশে তাঁর ডাক পরতো ! ঝলমলে পোষাক পরে নগেন কাকা ও তাঁর দল হাজির হতেন । পোষাক , নানা রকম
বাজনা-বাদ্য দেখে আমি বিষ্মিত হতাম ।
আপ্লুত হয়েছি বাজনা শুনে । খুব ইচ্ছা ছিল
বড় হয়ে নগেন কাকার হাত ধরে বাজনাদার
হবো , ঝলমলে পোশাক পরে বাজনা বাজাবো ।
আমাদের নিকট প্রতিবেশী ছিলেন নূরু মাস্তান । তাঁর আস্তানায় জিকির ও গানের জলশা হতো প্রতি বিষ্যুদবার রাতে । গান আর ঢোল-ডুগীর টানে ওখানে হাজিরা দিয়েছি তাবৎ শাসকদের অলক্ষ্যে ।ডুগডুগি , সারিন্দা আর একতারার সাথে পরিচয় ও প্রেম এখান থেকে । টুকটাক বাজাতেও চেষ্টা করি । আহা ডুগডুগি বাজাইয়া যদি জীবনটা কাটাইয়া দিতে পারতাম । কীর্তনের
মোহে সাত দিন সাত রাত কাটিয়েছি
কিশোরগনজের এক হিজল বাগে বৈষ্ণবদের
আখরায় ।
অভিজাত বাদ্যযন্ত্র বেহালা , সেতার , সরোদ , বীনা , তানপুরা’য় আমার আগ্রহ ছিল কিন্তু নাগাল পাইনি ! বড় বেলায় পেশাগত কাজে গিয়েছিলাম গোপালগনজের চান্দাবিলে । সেখানে গিয়ে মতুয়াদের ডংকা নামক ঢাকের তালে মতুয়া নাচ নেচেছি এবং ডংকা বাজানোর তালিম নিয়েছি । এখন এই অপরাহ্নে তালিম
নিচ্ছি তানপুরা বৎ এক পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের , এর ইংরেজী নাম হার্প ( Harp ) , ধলা চামড়া গুরুর নাম প্যাট । জয় গুরু ….
আলোক চিত্র : প্রমিলা

