প্রজাতন্ত্রের কর্মচারির মনে সেবার মনোবৃত্তি কী জোর করে তৈরি করা সম্ভব?
লেখক:- শ্যামসুন্দর সিকদার
পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে আমলাতন্ত্র নেই।এই আমলাতন্ত্র যাদের নিয়ে, তাদেরকে আমাদের দেশের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি বলে।এখানে আবার ‘কর্মচারি’ শব্দটার মধ্যে কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত।আর আমলা দু’রকমের হয় – সামরিক আমলা ও বেসামরিক আমলা।কিন্তু আমাদের দেশে কার্যত আমলা বলতে অনেকেই শুধু বেসামরিক আমলাকেই বোঝে।তাও আবার ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদেরই প্রধানত মনে করা হয়।কারণ নীতি নির্ধারণে ও দেশ পরিচালনায় তারা সংশ্লিষ্ট।আর জনগণ তাদের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের সেবা পেয়ে থাকে।
যাক, আমি আজ আলোচনা করবো ওই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের সেবার মনোবৃত্তি প্রসঙ্গে।আমি যখন চাকরি করতাম তখন এবং এখন যা দেখেছি – তাতে আমার অভিজ্ঞতা হলো, জনগণকে সেবা দেবার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারিদের মধ্যে ‘কতিপয়’ কর্মচারির মন-মানসিকতা ইতিবাচক নয় ।তাই তাদের সেবা মনোবৃত্তির দুর্বল দিকটা প্রশ্নবিদ্ধ করে পুরো পেশাদারিত্বকে।আমি বলি, অনেক সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারি আছেন যাদের সেবা প্রদানে আন্তরিকতা ও কর্মতৎপরতা খুবই প্রশংসাযোগ্য।তারা প্রকৃতই জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেন।কিন্তু সমস্যা রয়েছে ওই যে বললাম কতিপয়ের মধ্যে।
দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সুনিদিষ্ট বিষয়ে এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের নিয়ম আছে।আর সেখানে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রত্যাশী ওই নিয়মে সহজেই সেবা পাওয়ার কথা।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেবা সহজে মিলে না।বরং হতে হয় নানাভাবে হয়রানি ।এই হয়রানির পেছনে কাজ করে ওই ‘কতিপয়’ দুষ্ট প্রকৃতির কর্মচারি বা কর্মকর্তা।আমি আজ এমন দু/একটা ঘটনার উল্লেখ করবো।তবে তার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক অন্য কথা বলি।
প্রকৃতপক্ষে সেবা মনোবৃত্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রথমে নিজ পরিবার থেকে এবং পরে তার শিক্ষাজীবনের পরিবেশ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে।সন্দেহ নেই – দেশে পারিবারিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবেশ এখন খুব একটা সুদৃঢ় ও সন্তোষজনক নয় বলেন অভিজ্ঞমহল। শুধু সংক্ষেপে এইটুকুই বলি যে, উভয় শিক্ষার ক্ষেত্রেই এখন নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ হতাশাজনক।কাজেই প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশে এখন দিনে দিনে ইতিবাচক সেবা মনোবৃত্তির মানুষ কতজনকে তৈরি হচ্ছে? তাই পরিণতিতে যা ঘটার তাই ঘটছে।
আমি আমার চাকরিতে প্রবেশন পিরিয়ড শেষ করার পর সহকারি কমিশনা(ভূমি) হিসেবে প্রথম স্বতন্ত্র অফিসের দায়িত্ব পেয়েছিলাম।উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ম্যাজিস্ট্রেট-কর্মকর্তাকে উপজেলা ভূমি অফিসের দায়িত্ব দিয়ে সহকারি কমিশনার(ভূমি) পদটি সৃজন হয়েছিল আমার ব্যাচ থেকেই।আমি এটা প্রথমে আন্তরিকভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না।কারণ আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মানজনক চাকরি ছেড়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলাম আমার পিতার নির্দেশে।আমার পিতা বলেছিলেন, “শোনো, মৃত মানুষের বিচার করেন ভগবান।আর জীবিত মানুষের বিচার করে হাকিম।আর এই দায়িত্ব পাওয়া যায় অনেক পুণ্যের ফলে।তাই তুমি হাকিম হও “। আবার পরে মৃত্যুকালে তাঁর শেষ কথা ছিল, “ কখনো বিচার বিক্রি করবে না এবং গরীবের পেটে লাথি মারবে না”।
আমি মানুষের সেবা করার জন্যই মনে মনে ব্রত নিয়েছিলাম।সহকারি কমিশনার(ভূমি) হিসেবে কাজ শুরু করার পর আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলি।একজন গরীব মানুষ আমার অফিসে ঢোকার সময় আমার পিয়ন তাকে দরজায় বাধা দেয় এবং বলেছিল – অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাবে না।আমি তা শোনতে পেয়ে তাকে ডেকে বলি, এভাবে কখনই কোনো মানুষকে আমার অফিসে ঢুকতে বাধা দেওয়া যাবে না। [ আমি সচিব থাকার সময়ও কোনোদিন অফিসের দরজার সামনে এক সেকেণ্ডের জন্যও আমি লাল বাতি জ্বালাইনি।]
বস্তুত আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারিগণ যে জনগণের সেবক – সেই কথাই কতিপয় কর্মচারি মনে রাখে না।অনেকেই নিজেকে মাস্টার(প্রভু) মনে করে।তাই আমার ওই পিয়নের মনেও সেই শিক্ষাটা ছিল।যাহোক, প্রসঙ্গক্রমে একটু বলি যে আমি ওই ভূমি অফিসে কর্মরত থাকার সময় একটা গুচ্ছগ্রামে(আদর্শ গ্রাম) ৪৫টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।[ঘরগুলো তৈরি করে দেয় একটা এনজিও কারিতাস।আমরা শুধু সরকারি খাসজমি দিয়েছিলাম।] আরেক গুচ্ছগ্রামে ৭০টি ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি দেওয়া হয়েছিল।আবার একটা চরজমিতে ৪০০টি ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি প্রদান করা হয় । আরেকটা বেশ বড় সমবায় সমিতিকে ৩৬৪ একর খাস জমি দেওয়া হয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয় হতে।এছাড়া ভূমিসংস্কার কর্মসূচির আওতায় মোট ১৭টি ইউনিয়নে প্রায় ১৪০০ ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল।আবার তখন ঋণ সালিশী বোর্ডের মামলা নিষ্পত্তির আইন (১৯৮৮)করা হয়েছিল।আমি সেই ঋণ সালিশী বোর্ডের মামলা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম নিষ্পত্তি করেছিলাম।তখন যিনি আমার ইউএনও (আবদুর রহমান সাহেব) ছিলেন তিনিও খুব সৎ এবং জনদরদী মানুষ ছিলেন।আমার চাকুরী জীবনের সেটা ছিল স্বর্ণযুগ এবং এত হতদরিদ্র মানুষের সেবা করার সুযোগ আর পরে কখনো আমি পাইনি।
আমার চাকুরিকালে আমি অনেক মানুষের বৈধ অনুরোধ রক্ষা করতাম।আবার আমার বন্ধু ব্যাচমেট কিংবা সিনিয়র/ জুনিয়র অনেক কর্মকর্তাকেও আমি অনেকের পক্ষ হয়ে অনুরোধ করতাম।আমি নিজে যে সকল অনুরোধ পেতাম তা আইনগত সমস্যা না থাকলে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখবো বলতাম এবং আমি কোনো অনুরোধ না পেলেও যেটা মানুষের আইনত প্রাপ্য সেবা, সেটা এমনিতেই আমি করে দিতাম।আর আমি যাদেরকে অনুরোধ করতাম, তাদেরকে বলতাম সহযোগিতা করুন, কোনো বেআইনী সুবিধা দিতে বলছি না। তখনও অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি, আইনত বৈধ বিষয়েও কতিপয় কর্মকর্তা তড়িৎ গতিতে প্রার্থিত সেবা না দিয়ে বরং হয়রানি করতো।এমনই ছিল আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা।আমি কখনই কোনো মানুষকে ঘুরানো পছন্দ করতাম না।আমার একটা অভ্যাস ছিল, সহকারি সচিব থেকে ফাইল পুট আপ হলে এবং সেটা আমার পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য হলে একই দিনে সিদ্ধান্ত দিয়ে তা আবার সহকারি সচিবের টেবিলে ফেরৎ যেতো।এরকম কার্যপদ্ধতি আমি আমার অফিসে নিশ্চিত করেছিলাম।
এবার বলি সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা।একটা মিউটেশন কেসের জন্য আমি এক উপজেলার এসিল্যাণ্ডকে একটা অনুরোধ করেছিলাম।কিন্তু আমি অনুরোধ করার পরও ওই এসিল্যাণ্ড মিউটেশন কেসটি নামঞ্জুর করে দেয়।পরে আবার ওই এসিল্যাণ্ডকে কারণ জিজ্ঞেস করলে সে যথাযথ উত্তর দিতে পারেনি।যাহোক, পরে আবার আবেদন নিয়ে ওই এসিল্যাণ্ড তা অনুমোদন করে দিয়েছিল।আমি খবর নিয়ে দেখেছিলাম ওই এসিল্যাণ্ড একজন সৎ অফিসার।কিন্তু তার দোষ হলো সে সার্ভেযারের উপর নির্ভরশীল।আর সার্ভেয়ারের সেবার মনোবৃত্তি প্রশ্নাতীত নয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটা জনৈক কাকা আর ভাইপোর মধ্য হতে সৃষ্ট।কাকা ভাইপোকে ৫৩ লক্ষ টাকা ধার দিয়ে যৌথ মালিকানার জমিতে দোকান নির্মাণ করতে বিল্ডিংয়ের ফাউণ্ডেশন কাজ সম্পন্ন করে।তারপর আরো টাকা দাবী করে ভাইপো কাকার অংশে নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে।এমন কি দা নিয়ে খুন জখমের ভয় দেখায় তার স্ত্রী ও বখাটে এক ছেলেসহ।বৃদ্ধ কাকা থানায় গিয়ে জিডি করে এবং পুলিশের সহায়তা চাইলে ঠিকমত সহায়তা পায় না।আমি সংশ্লিষ্ট ডিসিকে ফোন করলে ডিসি তখন ইউএনওকে বলে দেয় হেল্প করতে।আমি সেখানের এসপিকে এবং ওসিকে মেসেজ দিলে তারা কোনো রেসপন্স করে না।তখন স্বরাষ্ট্র সচিবকে বললে সে জিডির কপি চায়।তাকে তা পাঠাই।কিন্তু সচিব সাহেব কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা – তার ফিডব্যাক পাই না।
আমাদের সিভিল সার্ভিসের অতীত ঐতিহ্য আছে।সুনাম ও মর্যাদা আছে।অহঙ্কার আছে।গর্ব করার মতন কিছু গল্পও আছে।আবার নিকট অতীত সময় থেকে কিছু নেতিবাচক প্রচারও আছে।আবার ঈর্ষা আছে।বিদ্বেষমূলক কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আলোচনাও আছে।তবে এই প্রচারণার দায় কে নেবে? কোনো সন্দেহ নেই সুনাম আর সুকৃতির দাবীদার হতে চায় সবাই।কিন্তু দুর্নামের দায় কেউ নিতে চায় না।
সুতরাং উপরের বর্ণনায় বুঝতে পারা যায়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের মধ্যে কোন্ লেভেলে এবং কার মধ্যে কতটুকু সেবার মনোবৃত্তি রয়েছে ।এই সেবার মনোবৃত্তি কোনো কর্মচারির মানসিকতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মস্থ না হলে – তা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে কী তৈরি করা সম্ভব?
***
Leave a Reply