মেয়েবেলার সাত সতের -১০
দাদু আর ভাইডির হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হয়েছে৷ আজ থেকে পূজোর ছুটি শুরু৷ ভোর বেলা আমি আর ভাইডি শিউলি ফুল কুড়িয়ে মাঝারি আকারের একটা মালা গেঁথেছি৷ সুচ থাকে মায়ের হেফাজতে৷ তা সব সময় পাওয়া যায় না৷ দাদু-ভাইডিকে তাও মাঝে মধ্যে এটা সেটা সেলাই করতে দেন মা কিন্তু আমাকে তো ছুঁতেই দেন না! একটা চিকন শলা দুই ভাঁজ করে তার মাঝখানে সুতা ঢুকিয়ে তাই দিয়ে আমরা মালা গাঁথি৷ শলার সাথে শিউলির বোঁটার ভেতর থেকে কমলা রঙের রেনু বের হয়ে ভাইডির হাত দু’টো কমলা হয়ে যায়৷ আমার দায়িত্ব সুতার পিছনটা ধরে রাখা যাতে ওদিক দিয়ে ফুলগুলো বেরিয়ে না যায়৷ চার পাঁচটা ফুল এক সাথে শলায় ঢুকিয়ে তারপর ঠেলে সুতোয় নামিয়ে দেয় ও, আর আমি টেনে টেনে মাথা পর্যন্ত নিয়ে যাই৷ অর্ধেক ফুল প্রায় গাঁথা শেষ৷
– অত টেনে ধরিসনে, ছুটে যাবে হাত থেকে!
– কই টেনে ধরেছি?
– আল্লাহ! আল্লাহ!! যাহ! ছেড়ে দিলি সুতো?
– সরে গেছে, আমি কি করব?
– এ্যা….থলে গেতে, আমি কি কলব?? একটু ঢিলা করে ধরা যায় না?
ও এমন ভেংচি কাটলে আমার গা জ্বলে যায়৷ আবার ঝগড়াও করলো!
– পারব না আমি সুতো ধরতে, যা!
ছেড়ে দিয়ে বারান্দা থেকে এক লাফে উঠোনে৷ আর সুতা ছাড়তেই অর্ধেক ফুল খুলে পড়ে গেল মাটিতে৷ দেখ কেমন লাগে!
– এই! যাসনে! মালাটা তো তোকেই পরাব! একটু ধর আবার!
শিউলির মালা গলায় দিতে আমার খুব ভালো লাগে৷ যদিও নয়টা দশটা বাজতে না বাজতেই ফুলগুলো নেতিয়ে যায়, তবু৷ কী মিষ্টি একটা গন্ধ! কিন্তু যতই পছন্দ হোক, রাগ করে নেমে এসেছি, এখন তো চট করে ফিরলে চলবে না! ও আরও অনেকবার ডাকবে৷ বলবে, আপু আসো, আপু আসো, আমার লক্ষ্মী আপু, তবেই না!
একটুও না ঘুরে হনহন করে চললাম রাস্তার দিকে৷ মালা ফেলে ভাইডি দৌঁড়ে এসে আমার হাত ধরলো,
– চল, আজকের মালাটা বেশ বড় হবে দেখিস! দুই ভাঁজ করে পরতে হবে৷
– তুই পরগে যা!
– না,না, আপু! (দুই হাতের তালুতে মুখটা ধরে) লক্ষ্মী আপু!! আর ভেঙাবো না ৷
কোন কথা না বলে ঘুরে একই বেগে বারান্দায় উঠে সুতা ধরলাম৷ মালা গাঁথা শেষ হলো৷ আজ অনেক ফুল পড়েছিল৷ সত্যিই দুই ভাঁজ করে পরা গেল মালাটা৷ মালা গলায় দিয়ে মাকে দেখাতে যেয়ে দেখি দাদু লগার মাথায় কাঁচি ঢুকিয়ে তিনটে কলার মোচা কেটে এনেছে৷ জরিনা দাদী আর আঞ্জু বু বাছতে বসেছে৷ মোচার মাথী তিনটে আমাদের তিন জনের কিন্তু তার জন্য তো বাছা হতে হবে৷
আমি পিঁড়ি পেতে বসেছি পাশে৷ জরিনা দাদী মোচার খোলাগুলো একটা একটা করে খুলে খুলে পাশে রাখছেন যাতে তাড়াতাড়ি মাথীগুলো বেরোয়৷ আঞ্জু বু সেগুলো বেছে বেছে বাঁশের ডালায় রাখছে৷ ফুলের মাথায় নখ দিয়ে চেপে ধরে মাঝখানের শক্ত দন্ডটা টেনে বের করে ফেলে দিচ্ছে ৷ ওটা নাকি সেদ্ধ হয় না৷ আমিও হাত লাগালাম৷ কিন্তু আমি ধরলে দন্ডটা মাথা থেকে কেটে যায়৷ বেশ কয়েকটা বেছে (আমার মতে৷ ওগুলো আবার বাছতে হবে) রাখতে রাখতে দাদীর তিনটে মাথী বের করা হয়ে গেল৷ তিন জনকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন –
– যাও বু, আর বাছতি অবে না৷
মোচার মাথী নিয়ে খেতে শুরু করেছি কেবলই৷ ভাইডি ঝড়ের বেগে নিজেরটা খেয়ে আমারটায় হাতা মারছে ৷ নিষেধ করেছি, শোনেনি৷ আবার করলো, চিৎকার দিলাম৷ মা রান্না ঘর থেকে বলছেন –
– এ…ই…! আমার যেন আসা না লাগে!
তাতেও কাজ হলো না৷ আবার হাত বাড়িয়েছে৷ আর সহ্য হলো না৷ একটা বাঁশের কঞ্চি ছিল পাশে, দিয়েছি সপাং করে সই করে৷ এখন তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আর কাঁদছে৷ বেশ হয়েছে!
মা বের হয়ে আসলেন৷ ভয়ে সিটিয়ে গেছি আমি৷ শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন
– কি হয়েছে?
ও ভীষণ আশ্বস্ত হয়ে কষ্টে কান্না থামিয়ে মাকে নালিশ করলো
– দীপা মেরেছে৷
সাথে মারার কারণ যে কত সামান্য এবং সেই সামান্য কারণের বিপরীতে মার যে কত বেশি, তার একটা নাতিদীর্ঘ বিবরণ৷ কান্নার দমকে তার কতক বোঝা গেলো, কতক গেলো না৷ আবার কান্না শুরু৷ আমি ভয়ে তটস্থ৷ এই বুঝি মা আমাকে মারেন! এরপর যা ঘটলো তা ছিল ধারণাতীত৷ মা ওর কথা মন দিয়ে শুনলেন৷ এরপর বিদ্যুৎবেগে কঞ্চিটা উঠে গেলো মায়ের হাতে৷ আমার চোখ বন্ধ ৷ পিঠে পড়ার অপেক্ষায় ৷ হঠাৎ শুনি ভাইডি আরও জোরে চিৎকার করে কাঁদছে৷ মা বলছেন
– দীপা তোর কত ছোট, ও তোকে মারে কেন?? আর মারবে?? বল! দীপা তোকে আর মারবে??
আমি হতভম্ব৷ আশেপাশের সবাইও৷ জরিনা দাদী ছুটে এসে কঞ্চিটা কেড়ে নিলেন মায়ের হাত থেকে৷ মা চলে গেলেন৷ ভাইডি কাঁদছে খুব৷ আমার কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে৷ মা ওকে কেন মারলেন অমন করে? আমি তো অত জোরে মারিনি মায়ের মত! তাতেই ও কাঁদছিল৷ ইস! কী ব্যথাটাই না জানি লেগেছে ওর! কান্না পাচ্ছে খুব৷ সরে চলে এসেছি ওখান থেকে বৈঠকখানার সামনে৷ কাঁদছি তবে খুব কষ্টে শব্দ চেপে ৷ মা যাতে না শোনেন৷ একটু পরেই দেখি ভাইডিও চলে এসেছে কাঁদতে কাঁদতে৷ আমাকে কাঁদতে দেখে ওর কান্নার বেগ কমলো একটু৷ কাছে এসে দাঁড়ালে আমি ওর হাতটা ধরেছি শুধু, আর ঠেকানো গেলো না ৷ এবার তীব্র শব্দসহ সকল মনঃকষ্ট গাল বেয়ে গলে গলে পড়ছে৷ ভাইডি প্রাণপণে নিজের কান্না থামানোর চেষ্টা করছে আর আমার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে৷
– আপু থাক৷ কাঁদিসনে৷
একই কাজ করছি আমিও৷
– খুব ব্যথা লেগেছে, ভাইডি? থাক, কাঁদিস নে!
কান্না থেমেছে আমাদের কিন্তু ফোঁপানি যায়নি৷ দুই ভাই-বোন বৈঠকখানার সিঁড়ির উপর হাত ধরাধরি করে বসে ফুলে ফুলে ফুঁপিয়ে চলেছি সমানে ৷
ফক্রে: কন্যা
Leave a Reply