‘ইনবক্স’ গল্পের আত্মজাগরণ ও পলাশ রাঙা উপজীব্যতা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির বোধোদয় করে
রুদ্র সুশান্ত
পৃথিবীর যে কোন গল্প অনিবার্য নিয়তির ফল—লেখককে সে গল্প তৈরি করে দিতে হয় আর পাঠক গল্পপাঠে সে ভূমিতে মসৃন বিচরণের আশায় লিপ্ত হন। লেখকের ভাষাশৈলী আর বাক্য গঠনের কারুকার্য পাঠককে যত বেশি আলোড়িত করবে পাঠক তত আগ্রহে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাবে। এমন একটা সামাজিক বাস্তব গল্পের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম— গল্পটার নাম ‘ইনবক্স’। লিখেছেন সাহানা মওলা। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটকে তুখোড় বাইকচালকের মতো ব্যাপক মোরাল ও কনফিডেন্সে কলমের কালিতে সুসজ্জিতভাবে গল্পটাকে লেখিকা এগিয়ে নিয়েছেন অদৃশ্য সুতার গাঁথুনিতে । একজন জ্ঞানী ও সমসাময়িক আধুনিকমনস্ক নারীকে সমাজে ধড়ফড়িয়ে বাঁচতে হয়, লেখক ‘দিশা’ চরিত্রে সেটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। দিশা গল্পের নায়িকা, সে নবচিন্তাধারার উদারপন্থী। খিস্ট্রীয় মেথডিস্টদের মতো জীবনকে ধর্ম ও আধুনিকতায় সমানভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও মনোগত পরিসরে এগিয়ে নেয়ার মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি তার চরিত্রে প্রগাঢ় উদ্দীপ্ত ও জোরালো। পাঠক জরি চরিত্রকেও আলাদা সংস্কারে আবিষ্কার করতে পারবেন। জরিকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিবেশে নিজেকে বারবার মানিয়ে নিতে হয়েছে। যে মেয়েটা সুচিত্রা সেনের মতো সাজতে চাইতো বিয়ের পর তার কথাবার্তা ও কাজকর্মে আমূল পরিবর্তন আসে। একটা তথাকথিত ইতর-ভদ্র পরিবারে তাকে নাকানিচুবানি খেতে হয়।
গল্পের মধ্যভাগে এসে এমন মনে হবে, লেখিকা কোথাও কোথাও শুদ্ধসত্ত্বা ও আত্ম-চৈতন্যভাব আবিষ্কারের কঠোর-প্রবল নেশায় মত্ত হয়েছেন। গল্পের যতো ভিতরে যাচ্ছি মনে হচ্ছে, ঘুমন্ত নির্মল শিশুর হাতের মুষ্টির মতো ধীরে ধীরে কপাটের ঝাঁপি খুলে যাচ্ছে — পরতে পরতে জীবনানন্দের সোনালি রৌদ্রের ন্যায় স্বাভাবিক শব্দের বিস্তৃতি পাঠককে সহজে নজড় এড়াতে অবকাশ দিবেনা। একজন পাঠক নির্দিদ্বায় পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক প্রেমের উত্থান-পতনের স্মৃতি ফ্লাসব্যাকে আয়ত্ত করতে পারবেন।
’ইনবক্স’ উপন্যাসের চিত্ররূপে মনকে রোমান্টিক ধারায় ভাসানোর আবহ আছে। দিশাকে মাঝেমধ্যে অলকের নির্মোহ প্রেমে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়, এমনকি শাশুড়ি যদি কখনো তাকে বাসা থেকে বের করে দেয় তাহলে সে প্রেমিক অলকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত মনেমনে পুষছে। অষুধের সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আইয়াট্রোজেনিক হবার মতো গল্পের চরিত্রগুলো পাঠককে অন্তত অল্পকিছুক্ষণের জন্য হলেও বাইরের পরিবেশকে ব্লার করে দিবে।
এই উপন্যাসে শহুরে সামাজিক পরিবেশ ও পারিবারিক সামাজিকতার ত্রিমাত্রিক মেটাফর বেশ চমৎকারভাবে চোখে পড়ে। উপন্যাসের শব্দবন্ধে কোমলতা আছে; বাট গল্পের আবহে চার্চকেন্দ্রিক কোমলতা নেই। দিশা একইসাথে একঘেয়ে-আনুপুঙ্খিক সংসারী, অস্পষ্ট-অসংগত কোন ব্যাকরণ তার মধ্যে নেই; প্রচণ্ড আপটুডেট সংস্কৃতিমনাও।
প্রেমকে এখানে সবসময় ফিলোসোফিক সরলরেখায় আবেগের ফুলেল কাব্য হিসেবে পাওয়া যাবে না । পড়তে পড়তে এমন মনে হচ্ছিলো চরিত্রগুলো যেনো “দেখতে সোজা, ভেতরে গোঁজামিল” টাইপের। জাহিদ এমন একটি চরিত্র; স্ত্রী দিশাকে তার কাছে কামুকরুপে এসেও সেক্সহীন ফিরে যেতে হয়েছে। সামাজিক ভেদরেখা, মানবিক প্রভেদচিহ্ন, পারিবারিক চাপ, লোকলজ্জার ভয়, মান-মর্যাদা রক্ষা ও স্বামীর সম্মান আগলানোর দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে নিয়ে নীরবে জীবনের যৌগিক সমীকরণকে সরলীকরণ করে কতো নারীকে নিজ-ইচ্ছার আত্মহূতি দিয়ে জীবনযাপন করতে হয় লেখিকা সেটা দিশা চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন পুরুষগুলোকে আমার কাছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বদমাশ বলে মনে হয়।
জাহিদ চরিত্রে পারিবারিক পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন লেখিকা। পরিবারে একটা ছেলে শুধু উপার্জন করলেই হয়, তার যেনো সকল দায়িত্ব শেষ, ঘরে বা বাসায় তাদেরকে এক গ্লাস জল ঢেলেও খেতে হয় না— জাহিদের অন্তর্লোকে পুরুষআধিপত্যবাদী চিন্তা নিঃশব্দে বিকৃত-জোছনারূপে ডানা মেলে আছে।
সময়ে সময়ে মানুষের হৃদয়ে অনেক ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের জন্ম হয়, স্পেশালি নারী হৃদয়ের সেই আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার সমুচিত মূল্যায়ণ না হলে তা পারমাণবিক বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়। নারী হৃদয়ে যতটা কোমলতার অবস্থান ,তারচেয়ে বেশি উশৃঙ্খল দৃঢ়তার প্রতিমূর্তি রয়েছে৷ উপন্যাসটিতে দিশা ও জরিকে বর্তমান সমাজের বাস্তব ব্যক্তিত্ব ও সমসাময়িক নারীর প্রতিকৃতি মনে হবে।
নারী চরিত্রগুলোকে ঔপন্যাসিকা সমকালগত সমযুগের প্রকৃত অর্থে উন্মোচন করতে পেরেছেন। পুরুষের মনে ঘরেবাইরে নারীদেরকে সবসময় দমিয়ে রাখার যে মনস্তাত্ত্বিক অনগ্রসরতা, এই গল্পে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগের সাথে সেই বিষয়টা ধরা পড়ে। নারী পাঠকরা এই গল্পে বারবার নিজেদেরকে আবিষ্কার করতে পারবে; পাঠিকার মনে ও গোপন অন্তস্থলে আত্মচেতনা জাগ্রত হবে— সম্ভবত এটাই লেখিকার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
গল্প পড়তে পড়তে মনে হবে আমি শহরের কোন অলিগলিতে হাঁটছি, আবার হুট করে কোন একটা পরিবারে ঢুকে গেছি। মনের অজান্তে নিজেই যেনো কোন একটা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সংগোপনে এগিয়ে যাচ্ছি। এই চেতনাবোধটা একজন পাঠককে অবশ্যই অন্যরকম গভীর অনুভূতি দেবে।
প্রেমের ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণেও শব্দের ছলচাতুরী নেই। সাবলীল বাক্য গঠন— যেনো ছোটো ছোটো বাক্য মানবহৃদয়ের সকল কথা অনায়াসে গলগল করে বলে দিচ্ছে।
বাক্য গঠনের দিক থেকে গল্পটি সরল ও সুখপাঠ্য। শব্দের আচমকা জোচ্চুরি নেই, বাক্যে কঠিন বা অপ্রচলিত শব্দের ডলাডলি নেই, ছোট্টবেলার খেলাঘরের মতো উপন্যাসের শব্দগুলো হুটহাট প্রাণে মিশে যায়।
‘ইনবক্স’ এই উপন্যাস পাঠ শেষে পাঠকের হৃদয়ে কাহিনী ও চরিত্রগুলো যতো দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করবে সেই অবস্থানটাই মূলত একজন লেখকের সার্থকতা। এই স্বচ্ছন্দপাঠ্য, প্রাঞ্জল ও মনোগ্রাহী উপন্যাস মনকে রোমান্টিক প্রশান্তি দিবে, একথা অন্তত বলতে পারি।
বই- ইনবক্স
লেখক- সাহানা মওলা
প্রকাশনা- সপ্তর্ষি
প্রকাশক- শিবু ওঝা
প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইংরেজি
প্রচ্ছদ- আল নোমান
মুদ্রিত মূল্য- ৪৭০ টাকা।
Leave a Reply