ম্যাডাম?
সাধারণত পুরুষদের স্যার ও নারীদের ইংরেজিতে ম্যাডাম হিসেবে সম্বোধন করা হয়। তবে বাংলাদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবক নির্বিশেষে সকলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাদের ম্যাডাম শব্দে সম্বোধন করে থাকেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে “ম্যাডাম” একজনই, তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
সত্তরের দশকে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আক্ষেপ করে বলেছিলেন,
“শেখ সা’ব-রে ইতিহাস স্টেটসম্যান অওনের একডা সুযোগ দিছিলো, তয় তিনি হেইডা রক্ষা করবার পারেন নাইক্কা”।
আজকের এ সময়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বেঁচে থাকলে বলতেন,
“বেগম খালেদা জিয়ারে ইতিহাস স্টেটসম্যান অওনের একডা সুযোগ দিছে, তিনিও হেইডা জুতসই কইরা কামে লাগাইবার পারছেন। শের-ই-বাংলা থেইক্কা অহনতরি বাংলাদেশের রাজনীতিতে, কেবলমাত্র একজন রাজনীতিবিদই স্টেটসম্যান অইয়া উঠবার পরছেন, তিনি বেগম খালেদা জিয়া”।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এখন যা বয়স, তাতে তাঁর সঙ্গে নারী-পুরুষ লিঙ্গভেদ অপ্রয়োজনীয়। কাজেই “স্টেটসম্যান” শব্দের লিঙ্গান্তর করে ওটাকে “স্টেটস ওমেন” না করলেও চলবে। এতে করে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। কেউ কেউ যদি স্টেটস ওমেন বলতে চান বলেন, এতে করে বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী, বয়োবৃদ্ধ বেগম খালেদা জিয়ার গৌরবের বিন্দুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি হবে না। এতে করে যদি কারও গৌরব বৃদ্ধি হয় সেটা হবে, বাংলাদেশের বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়া নাগরিকদের।
তাছাড়া এমনও হতে পারে যে, বেগম খালেদা জিয়া-কে “স্টেটস ওমেন” অভীদায় অভিষিক্ত করলে, তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেসার মতো তা প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা-কে ইংরেজ গভর্নমেন্ট প্রথমে “বেগম” উপাধিতে ভূষিত করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে “নবাব” উপাধিতে ভূষিত করলে তিনি তা গ্রহণ করেন। বেগম খালেদা জিয়াও নওয়াব ফয়জুন্নেসার মতো তেজস্বিনী ও প্রখর স্বাধীনচেতা। যেকারণে সেই আশির দশক থেকে, সারাদেশে তাঁর পরিচিতি আপোষহীন নেত্রী হিসেবে।
এখন বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির বটবৃক্ষ, বিবেক, দেশ হৈতেশি প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এখন এটুকু বিশেষণই বেগম খালেদা জিয়ার জন্য যথেষ্ট। এরচেয়ে বেশি কোনো অভীধা নিষ্প্রয়োজন। তাঁর বয়স অনুপাতে যেটুকু বিনয়ী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কালেভদ্রে ক্যামেরায় দর্শনে অনুমিত হয়, তাতেই বোঝা যায় তিনিও এটুকুতেই সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত। তিনি পরিমিতিবোধের মধ্য দিয়েই জীবনটা অতিবাহিত করেছেন। কাজেই এক্ষেত্রেও তাঁর পরিমিতি বোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ঘটছে।
আজকাল সারা বাংলাদেশে যখন বেগম খালেদা জিয়া প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন, তখন তিনি তার ওম নেয়ার প্রত্যাশা না করে, পরীক্ষিত নেতা-কর্মী ও যোগ্য সন্তানের হাতে দলের দায়িত্বভার দিয়ে, চরম দুর্ভোগের ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে স্বেচ্ছায় পর্দার অন্তরালে চলে গেছেন। তাঁর এই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে যেমন, এক মহাসমুদ্র পরিমাণ কষ্ট রাজনীতি থেকে তিনি পেয়েছেন, বিপরীতে বর্তমানে আরেক মহাসমুদ্র পরিমাণ সম্মান, তিনি জাতির কাছ থেকে দলমত নির্বিশেষে পাচ্ছেন।
যারপরনাই বেগম খালেদা জিয়া যে বর্তমানে, বাংলাদেশি জাতির মূর্তমান প্রতীক বা স্টেটসম্যান হয়ে উঠেছেন, এতে কারোরই সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা না। এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি যে বাংলাদেশি জাতির একজন কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ তা-ও অনস্বীকার্য। পরশ্রীকাতর জাতির দেশ বাংলাদেশ- কাউকে জীবিত থাকতে মূল্যায়ন করতে জানে না, পারেও না। এই কথাটা শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের কী সরকার! কী নাগরিক সমাজ! সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটা আমাদের একটা মহা জাতীয় সমস্যা। “যে সমাজে গুণীর কদর হয় না, সে সমাজে গুণী জন্মায় না”। এটা আমার কথা না, বাণী চিরন্তন।
ক্ষোভের কথাটি বললাম এই কারণে যে, যিনি তার জীবনের উৎকৃষ্ট সময়টুকু নিজের সন্তান ও পরিবার পরিজনকে নিয়ে উপভোগ না করে, বরঞ্চ দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য, নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকালকে উৎসর্গ করেছিলেন। যে কারণে তাঁর সমসাময়িক কালের রাজনীতিবিদগণ প্রায় সকলেই আজ মৃত। দু’ একজন জীবিত থাকলেও নিশ্চল। তাতেই বোঝা যায় তিনি কতোটা অল্প বয়সে রাজনীতিতে এসেছেন! মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে ‘৯১ সনে তিনি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নিরঙ্কুশ নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়লাভ করে, প্রথমবারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বের আসন অলংকৃত করেন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন বেগম খালেদা জিয়ার। এহেন ত্যাগী, স্বল্পভাষী, দেশ হৈতেশি, জনগণ অন্তপ্রাণ বেগম খালেদা জিয়াকে এই জীবন সায়াহ্নে “স্টেটসম্যান” উপাধি দিয়ে বরণ করে নিলে কি ক্ষতি? কোনও ক্ষতি নেই। মূল ক্ষতটা হলো আমাদের অহমে, পরশ্রীকাতরতায়।
অথচ আমরা সমষ্টিগত ভাবে ভেবে দেখি না কেনো যে, জাতিগত ভাবে এটা আমাদের জন্য একটা সৌভাগ্য বটে। পৃথিবীর খুব কম জাতি নিজেদের মধ্যে এই রকম নির্লোভ, ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছে। পৃথিবীর অনেক জাতি ইচ্ছে করলেও নিজেদের একজন স্টেটসম্যান খুঁজে পাবে না। আমরা পেয়েছি এটা আমাদের গর্ব। তাই আমি নির্দ্বিধায় বলতে চাই, বেগম খালেদা জিয়া-কে আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তির প্রতীক “স্টেটসম্যান” করে তুললে, বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়ার না, পরোক্ষভাবে লাভটা জাতিগতভাবে আমাদের সকলেরই হবে। কারণ, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের উপর ভিত্তি করে, পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র মহিলা ফ্যাসিস্ট যেমন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে। বিপরীতে আমরা বিশ্ব সমাজ-কে এ-ও বলতে পারবো যে, দ্যাখো পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র মহিলা স্টেটসম্যানও আমাদের দেশেই জন্ম নিয়েছে।
শুভেচ্ছা নিরন্তর।
Leave a Reply