প্রান্তের কণ্ঠস্বর, ক্ষমতার ভাষা ও নতুন বিশ্বের সন্ধানে:
সাঈদ থেকে স্পিভাক, ভাভা থেকে মোহান্তি, মাহমুদ থেকে আবু-লুঘোদ: একবিংশ শতাব্দীর মানবিক বোধের পুনর্নির্মাণ
ফরাসি দার্শনিক Michel Foucault একবার বলেছিলেন, “Knowledge is not made for understanding; it is made for cutting.” অর্থাৎ জ্ঞান কেবল বোঝার জন্য নয়, প্রচলিত সত্যকে প্রশ্ন করার জন্যও। গত শতাব্দীর শেষভাগে একদল চিন্তাবিদ ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তাঁরা সাম্রাজ্য, আধুনিকতা, ইতিহাস, নারী, ধর্ম, সংস্কৃতি ও পরিচয় সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছেন।
তাঁদের কাজের কেন্দ্রে ছিল এক মৌলিক প্রশ্ন—মানুষকে আমরা কার চোখ দিয়ে দেখি? ক্ষমতার চোখ দিয়ে, নাকি মানুষের নিজের চোখ দিয়ে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা শুধু নতুন তত্ত্ব নির্মাণ করেননি; বরং জ্ঞানের নৈতিক ভিত্তিকেই পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
পূর্বকে পুনরাবিষ্কার: এডওয়ার্ড সাঈদের বিপ্লব
১৯৩৫ সালে জেরুজালেমে জন্মগ্রহণকারী Edward Said ছিলেন সাহিত্য সমালোচক, সংস্কৃতিচিন্তক এবং ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রশ্নের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবন কেটেছে জেরুজালেম, কায়রো এবং নিউইয়র্কের মধ্যে।
তাঁর অমর গ্রন্থ Orientalism শুধু একটি বই নয়; এটি মানববিদ্যার ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো ঘটনা।
সাঈদ দেখিয়েছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে “প্রাচ্য”কে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন তা রহস্যময়, পশ্চাৎপদ, আবেগপ্রবণ এবং শাসনের উপযুক্ত। এই বর্ণনা ছিল না নিরীহ; এটি ছিল ক্ষমতার ভাষা।
আজও যখন কোনো জাতি, ধর্ম বা সভ্যতাকে একরৈখিকভাবে বিচার করা হয়, তখন সাঈদের চিন্তা আমাদের সতর্ক করে দেয়—বর্ণনার মধ্যেও রাজনীতি লুকিয়ে থাকে।
স্পিভাক: নীরবতার শব্দ শুনতে শেখা
১৯৪২ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া Gayatri Chakravorty Spivak বাংলা ভাষাভাষী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী।
তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত তাঁর যুগান্তকারী প্রবন্ধ Can the Subaltern Speak?-এর জন্য।
স্পিভাকের মূল উদ্বেগ ছিল ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষদের নিয়ে—আদিবাসী, দরিদ্র, নিম্নবর্গ, নিপীড়িত নারী, যাদের তিনি “Subaltern” নামে অভিহিত করেন।
তাঁর প্রশ্ন ছিল গভীর—
প্রান্তিক মানুষ কি সত্যিই কথা বলতে পারে, নাকি তাদের কণ্ঠস্বর ক্ষমতার ভাষায় অনুবাদ হয়ে হারিয়ে যায়?
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও প্রশ্নটি সমান প্রাসঙ্গিক। কোটি মানুষ কথা বলছে, কিন্তু সবাই কি সমানভাবে শোনা যাচ্ছে?
ভাভা: পরিচয়ের নতুন ভূগোল
১৯৪৯ সালে মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণকারী Homi K. Bhabha বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Location of Culture আধুনিক সাংস্কৃতিক তত্ত্বের ক্লাসিক।
ভাভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Hybridity এবং Third Space।
তিনি বলেন, কোনো সংস্কৃতিই বিশুদ্ধ নয়। সভ্যতার ইতিহাস মূলত মিশ্রণ, ধার, বিনিময় এবং পুনর্গঠনের ইতিহাস।
এই প্রসঙ্গে ভাভার বিখ্যাত “Third Space” বা “তৃতীয় পরিসর”-এর ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, যখন দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য বা পরিচয় পরস্পরের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা কেবল মুখোমুখি অবস্থান করে না; বরং তাদের মধ্যবর্তী এক নতুন সৃজনশীল ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এই ক্ষেত্রটি পুরোপুরি এক পক্ষের নয়, অন্য পক্ষেরও নয়। বরং উভয়ের মিথস্ক্রিয়া, সংলাপ, দ্বন্দ্ব ও সমন্বয় থেকে গড়ে ওঠা এক নতুন সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। ভাভা এই মধ্যবর্তী সৃজনশীল ক্ষেত্রকেই “Third Space” নামে অভিহিত করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, একজন বাংলাদেশি তরুণ যদি লন্ডনে বেড়ে ওঠে, তবে তার পরিচয় কেবল বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ নয়। সে হয়তো বাংলা ভাষায় ভাবতে পারে, ইংরেজিতে কাজ করতে পারে; ঈদও উদযাপন করে, আবার পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক উৎসবেও অংশ নেয়। তার পরিচয় দুটি সংস্কৃতির যান্ত্রিক যোগফল নয়; বরং একটি নতুন ও স্বতন্ত্র পরিচয়। এই নতুন পরিচয়ের জন্মই ঘটে Third Space-এ।
ভাভার মতে, মানবসভ্যতার বহু গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি—নতুন সাহিত্য, নতুন শিল্পধারা, নতুন রাজনৈতিক চেতনা, এমনকি নতুন সামাজিক পরিচয়—এই Third Space থেকেই জন্ম নেয়। ফলে সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কোনো একক ঐতিহ্যের মধ্যে নয়; বরং ভিন্নতার সংলাপ ও সৃজনশীল সহাবস্থানের মধ্যেই নিহিত।
আজকের এক তরুণ একই সঙ্গে বাঙালি, মুসলিম, দক্ষিণ এশীয়, ডিজিটাল নাগরিক এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে। ভাভা আমাদের শেখান—পরিচয়ের এই বহুত্ব কোনো দুর্বলতা নয়; বরং মানবসভ্যতার স্বাভাবিক শক্তি।
মোহান্তি: বৈচিত্র্যের পক্ষে এক দৃঢ় কণ্ঠ
ভারতের মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া Chandra Talpade Mohanty নারীবাদী চিন্তার জগতে এক অনন্য নাম।
তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Under Western Eyes আধুনিক নারীবাদী আলোচনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
তিনি দেখান, “তৃতীয় বিশ্বের নারী” বলে কোনো একক বাস্তবতা নেই। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী, মরক্কোর নারী, ভারতের নারী এবং লাতিন আমেরিকার নারী—সবার অভিজ্ঞতা আলাদা।
মোহান্তি আমাদের শেখান—
ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া।
সাবা মাহমুদ: স্বাধীনতার প্রচলিত সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ
১৯৬২ সালে পাকিস্তানের কোয়েটায় জন্ম নেওয়া Saba Mahmood ছিলেন সমকালীন নৃতত্ত্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Politics of Piety সামাজিক বিজ্ঞানকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তায় স্বাধীনতা প্রায়শই কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মাহমুদ দেখিয়েছেন, অনেক মানুষ ধর্মীয় অনুশীলন, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক চর্চার মধ্য দিয়েও স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা খুঁজে পান।
তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা—
স্বাধীনতার ভাষা এক নয়; মানবজীবনের অভিজ্ঞতাও এক নয়।
আবু-লুঘোদ: অন্যকে বোঝার নৈতিকতা
Lila Abu-Lughod ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ। তাঁর পিতা Ibrahim Abu-Lughod ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ।
মধ্যপ্রাচ্যের নারী, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
তাঁর আলোচিত গ্রন্থ Do Muslim Women Need Saving? আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আবু-লুঘোদ আমাদের শেখান
মানুষকে উদ্ধার করার আগে তাকে বোঝা জরুরি।
সহানুভূতি তখনই অর্থবহ, যখন তা শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
রণজিৎ গুহ: ইতিহাসের নিচুতলার মানুষের ইতিহাস
১৯২৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাকেরগঞ্জ জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণকারী Ranajit Guha দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে Subaltern Studies আন্দোলন।
তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস শুধু নবাব, সম্রাট বা গভর্নরদের কাহিনি নয়। কৃষক, শ্রমিক, বিদ্রোহী, নীরব জনগণ—তারাও ইতিহাস নির্মাণ করে।
বাংলার কৃষক বিদ্রোহ কিংবা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নতুনভাবে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য।
দীপেশ চক্রবর্তী: ইউরোপের বাইরে আধুনিকতার সন্ধান
১৯৪৮ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী Dipesh Chakrabarty সমকালীন ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রভাবশালী নাম।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Provincializing Europe আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার এক মাইলফলক।
চক্রবর্তী প্রশ্ন করেন—
আধুনিকতার একমাত্র মানদণ্ড কি ইউরোপ?
তাঁর মতে, বিশ্বের প্রতিটি সমাজ তার নিজস্ব ঐতিহাসিক পথ ধরে আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হয়। ফলে আধুনিকতার কোনো একক কেন্দ্র নেই।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন তাঁরা আজও অপরিহার্য?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ, তথ্যযুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয়-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের যুগে তাঁদের চিন্তা নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।
– সাঈদ শেখান, তথ্যের উৎসকে প্রশ্ন করতে।
– স্পিভাক শেখান, অনুপস্থিত কণ্ঠস্বরকে খুঁজে বের করতে।
– ভাভা শেখান, বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে।
– মোহান্তি শেখান, সাধারণীকরণের বিপদ বুঝতে।
– মাহমুদ শেখান, স্বাধীনতার বহুবিধ রূপকে স্বীকার করতে।
– আবু-লুঘোদ শেখান, সহানুভূতির আগে বোঝাপড়ার প্রয়োজন।
– গুহ শেখান, ইতিহাসকে নিচুতলার মানুষের চোখে দেখতে।
– চক্রবর্তী শেখান, বিশ্বের জ্ঞানকে বহুকেন্দ্রিকভাবে ভাবতে।
উপসংহার: ভবিষ্যতের মানবসভ্যতার নতুন ব্যাকরণ
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির অভাব নেই; অভাব রয়েছে গভীর উপলব্ধির। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, কিন্তু প্রায়ই কম বুঝি। এই চিন্তাবিদদের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁরা আমাদের নতুন তথ্য দেননি; তাঁরা আমাদের নতুন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন।
তাঁরা শিখিয়েছেন, সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই ঘটে, যখন আমরা ক্ষমতার উচ্চ মিনার থেকে নয়, মানুষের জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে পৃথিবীকে দেখতে শিখি; যখন ইতিহাসে শুধু বিজয়ীর নয়, পরাজিতেরও স্থান হয়; যখন জ্ঞান আধিপত্যের ভাষা নয়, সংলাপের ভাষায় কথা বলে।
এক অর্থে, সাঈদ, স্পিভাক, ভাভা, মোহান্তি, মাহমুদ, আবু-লুঘোদ, গুহ ও চক্রবর্তী কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের প্রবক্তা নন; তাঁরা এক নতুন মানবিক চেতনার নির্মাতা। তাঁদের চিন্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বিশ্বকে বদলানোর প্রথম পদক্ষেপ হলো তাকে নতুনভাবে দেখা।
আর সেই দেখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভবিষ্যতের আরও ন্যায়সঙ্গত, আরও বহুত্ববাদী এবং আরও মানবিক বিশ্বের সম্ভাবনা।
কাজী জিয়া উদ্দিন
অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি
Leave a Reply