স্বপ্নের সুবর্ণরেখা
মধ্যরাত্রি…চাকভাঙ্গা মধুর মতো জ্যোৎস্নার সুরে শ্রাবণ কাঁদছে পৃথিবীময় গোপন কথা জড়িয়ে…
মৃদুস্বরে হেড ফোনে চলছে অগোছালো লেখা…
“আয়নায় মুখোমুখি, দেহ নয়,দেহময় মেলা…
তুমি হাঁটো আমি দেখি,
চোখ চুপচাপ তাকায়
চোখে চোখ পড়লেই দেখি,
ভিতরটা কেমন জ্বলে যায়…
তুমি দূরে সরে গেলে
আরও কাছে টানে মন
কেউ যদি কারণ জিজ্ঞেস করে
আমি বলি, নেই ব্যাকারণ…!”
ফোনটা শব্দহীন, ভাইব্রেশনে(কম্পন) ছিল।ফোন ঢুকতেই আবৃত্তি কন্ঠ থেমে যায়।
সূর্যোদয় —– কী করছো, ঘুমাচ্ছো বুঝি ?
সূর্যোতপা —– না, বলো…
সূর্যোদয় —– বাড়ি ফিরলে কখন?
সূর্যোতপা —– নদীর ওপারে পায়ে হেঁটে কিছুটা সময় আমারই নিজস্বতার সাথে…
সূর্য —– লিখলে কিছু?
তপা —– হুম…লিখে রের্কড করে শুনছিলাম।
সূর্য —– বাঃ দুর্দান্ত… শোনার অপেক্ষায় কিন্তু।
তপা —– দেখা হলে,
সূর্য —– তোমার ভালোবাসা ভরা কন্ঠে নতজানু আমি…
তপা —- এইভাবেই চিরকাল ভালোবেসো,
সূর্য —– কাকে?
তপা —– ওই যে বললে,”ভালোবাসা ভরা কন্ঠ”… তাকে—
সূর্য —– ভালোবাসার উৎসবে মাততে ইচ্ছে করে না?
তপা —– আমি তো রাত্রির কপালে টিপ !
সূর্য —– বুঝিয়ে বলো প্লিজ, হেঁয়ালি বুঝি না ! কী অদ্ভুত তাচ্ছিল্য নিয়ে দু’মুঠো দূরত্ব
ছুঁড়ে দিলে বুকের ভাঁজে !
তপা —– নৈঃশব্দের অস্তিত্ব বোঝো? জ্যোৎস্নার মৃদু ঢেউ দেখেছো ? সেই ঢেউয়ের
একটা ফিসফিস শব্দ এসে কতো কথা গোপনে বলে যায়…
সূর্য —– শীতের একলা রোদ্দুরের মতো ? ঢের হয়েছে… আবরণ তো ছেঁড়ো…
তপা —– কী দুর্নিবার সুখ যাপন! রাত জাগা রাত্রি ভোর এনে দেয় চৌকাঠে শালিক,
সূর্য —- তুমি কী নির্জন উপহার দিতে চাও পাহাড়ের গা থেকে নুয়ে পড়া রূপালি
চিহ্ন এঁকে?
তপা —– (মৃদু হেসে) নির্জন উপহার দেওয়া যায় বুঝি? সে-তো এক উপলব্ধি !
সূর্য —– ব্যাকুল ভেঙে তোমার বৃত্তে ভরে দেবো অন্তস্থ আকাশ, অবশ্য যদি প্রেমিক
হই!
তপা —– যতটা মাড়াবে তুমি ততটাই ছিঁড়ে যাবে বসন্তের বুক, ঘাসফুল-জোনাকিরা
নদীর শরীরে পাবে প্রণয়-অসুখ…
সূর্য —– তুমি সেই দূরগামী চাতক,কোনো এক বিভ্রমে তুমি ধূসর বালিয়াড়ি ছায়া।
নাও, একহাতে দিলাম বিজন,অন্য হাতে নির্মোহ…
তপা —– ভিখারির মতো সুখি আমি, অক্ষর স্নান ছাড়া বাকিটুকু আগুনের দায়,
নিরালার ঘরবাড়ি কতোদিন পুড়ে ছারখার, রাত্রির আত্মার অবিশ্রান্ত স্তব,
কিছুটা সন্ধ্যে আর কিছুটা বিকেলের দোষ…
সূর্য —— এসো, কাছে এসো, যতটা কাছে এলে আমরাও বিশেষ একাকী !
তপা —– এই অকল্পনীয় দুনিয়ায় অদৃশ্য হাওয়ার মতো ছুঁয়ে থাকতে চাই অংশের
পূর্ণতা-কে…
সূর্য —— পারলে এড়াও তুমি, প্রেমও আগুন হতে পারে।
বলো কী চাও তুমি ?
তপা —– আমার চোখের ভেতর শান্ত জল অবসন্ন ভিটে…ঘর নেই,রোদ্দুর তাও
কালসিটে, মাথায় আকাশ,পথ…পথ… দূর দূর গাঁয়ে, আমার দিনের খাতা
রাখা আছে পরজন্মের পায়ে।
সূর্য —— ভোরের স্বপ্ন রাস্তা পেরোলে… অনুমতি দাও সম্পর্কে জড়াবো !
তপা —— সম্পর্ক মিথ্যে নয়, মিথ্যে মানবিকতার বিশুদ্ধ কোমলপ্রাণ, চেতনার
আটপৌরে শাড়ির ভাঁজে যৌথ পরিবারের ছোপ লেগে আছে আজও।
সূর্য —— তবে কী দেবো তোমায় ?
তপা —— তোমার – আমার – আমাদের কারও কাছে নেই,দেবে কী করে ?
সূর্য —— বলে তো দেখো…
তপা —– আমরা যখন ফিরে আসি ব্যক্তিগত স্বর্গের অতৃপ্ত সিঁড়িতে বাল্য স্মৃতি
নিয়ে, খুঁজে পাই শান্তি,বিশ্বাস, নির্ভরতা,স্বচ্ছতা, দূরত্বহীনতা… আরও কিছু
সূর্য —– শান্তি…?
তপা —– চুপ কেন ? খুঁজছো বুঝি? পাবে না… পাবে না…
সূর্য —– না, না, ভাবছিলাম শান্তি ঠিক কী !!!
তপা —– প্রত্যাশা বা লোভ নির্মূল করো… ঠিক খুঁজে পাবে ! নিজের সাথে নিজের
বোঝাপড়া ঠিক না থাকলে কোনো বাহ্যিক সুখ, শান্তি দিতে পারে না।
দম্ভ বা অর্থের মাধ্যমে মানসিক শান্তি আসে না।
যে সত্যিকারের মানসিক শান্তি দেবে, সে কখনোই মানসিক অশান্তি কারণ
হবে না। শান্তি এখন বড্ড দুর্লভ, খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ছটফট করছে।
সূর্যতপা বলে চলে এইভাবে অনর্গল, কখন যে ওই প্রান্তের ফোনটা কেটে গ্যাছে বা কেটে দেওয়া হয়েছে বোঝা গেল না, বড় হাসি পায়… জন্মসূত্রে মানুষ হওয়া নয়, সৎ পথে চলে অন্যায় থেকে দূরে থাকা কেই প্রকৃত মানুষ বলে।
Leave a Reply