সূর্যাস্ত
মারিয়াকে প্রথম দেখি চেন্নাইয়ের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে।
আনমনে সে ওয়াটার কালার ব্যবহারের জন্য প্যালেট, তুলি আর ওয়াটার কালার কিনছে। ‘আর্টিস্ট ওয়াটার কালারের’ প্যাকেটটা ট্রলিতে নিয়েছে। তুলি বা ব্রাশ কেনা নিয়ে কিঞ্চিত দ্বিধায় আছে।
সম্ভবত কোনটা ভাল হবে বুঝতে পারছেনা।চব্বিশ পঁচিশ বছরের একটা বিষন্ন সুন্দরী মেয়ে ছবি আঁকার সরঞ্জাম কিনছে দেখে যে কারোর ধারনা হবে,
নিশ্চয় তার কোন ছোট সন্তান আছে যাকে ছবি আঁকার তালিম দিতে চায়। বা বাচ্চার স্কুলের আর্ট ক্লাসে এসব লাগবে। সময় নিয়ে সে আনমনে তুলিগুলো হাতড়াচ্ছে। অবাক হলাম। কিনতে চাইলে এত সময় তো নেবার দরকার নেই। কিন্ত মেয়েটার যেন অফুরন্ত সময়। কোন ব্যস্ততা নেই।
কাকতলীয়ভাবে আমিও কয়েকটা তুলি ও আর্ট পেপার কেনার ইচ্ছাতেই ডিপার্টমেন্ট স্টোরের এই স্টেশনারীর দিকটাতে এসেছি। আমি তুলিতে হাত দিতেই খুব শান্ত ও আপন স্বরে আমায় ইংরেজিতে প্রশ্ন করল,
“আপনার কি ধারনা আছে এ ব্রাশ সম্পর্কে। এটা কি ভাল হবে?”
এবার মনোযোগ দিয়ে তাকালাম তার দিকে।
আয়ত কালো চোখ। সেখানে কেমন জানি জলভরা মেঘের হাতছানি। একটা বিষাদ। যদি তার মুখাবয়বের মায়ার কারনে সে বিষাদ বা ক্লান্তি খুব একটা চোখে পড়ল না আমার। ইংরেজিতে বললাম,
” আমিও যে খুব বুঝি তা নয়। আমি টাইম পাস করার জন্য একটু আঁকিবুঁকি করব বলে ব্রাশ-পেপার নিচ্ছি”
” হোয়াট আ সারপ্রাইজ। আমিও সেই একই কারণে”
ও মৃদু হাসলো।
মায়াহাসি। কিন্ত উচ্ছল হাসি তাকে একেবারেই বলা যাবেনা। ব্যথা লুকাতে যেমন হাসি ব্যবহার করে সেরকম। তবুও এই হাসিতেও টোল পড়ল গালে।
প্রশ্ন করলাম, হোয়ার আর ইউ ফ্রম?
বলল, ঢাকা বাংলাদেশ।
আমি বললাম, সেম হেয়ার।
এবার খাটি বাংলায় বললাম, এর চেয়ে ভাল ব্রাশ আপাতত আশেপাশে নেই। তাই এটা নেয়া শ্রেয়।
আমি এক সেট তুলি আর কয়েকটা পেপারস নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগোলাম।
মেয়েটা আবার রঙ তুলি নিয়ে আনমনা হয়ে গেল।
এর ঠিক দুদিনপর একই ডিপার্টমেন্ট স্টোরে আবার দেখা হল মারিয়ার সাথে। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে ঐ স্টোরটা একটা বড় ল্যান্ডমার্ক। ওখানে প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়। আমি বীট আর মিষ্টি আলু কিনতে গেছি। হাসপাতালের কাছে এই স্টোরটাকে কেন্দ্র করেও বাড়িভাড়াটা এখানে বেশি। এবার মারিয়াকে দেখে ভ্রু নাচালাম।
মনে হল আমায় মনে রাখতে পারেনি সে।
ও অবাক আর আনমনে আমায় দেখলেও কোন রেসপন্স করলনা। আমি অবাক ও আহত হলাম৷ দুদিন আগেই না সামান্য কথা হল। আমি কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করলাম,
‘তুলিগুলো কাজে লেগেছে?’
‘নাহ। কিন্ত আপনাকে তো চিনলাম না’ অবাক দৃষ্টি ফেলল আমার উপর।
‘আমি মিল্টন, ফ্রম ঢাকা, বাংলাদেশ।’ ঢাকা শব্দটা ইচ্ছে করেই বললাম কারন মারিয়া প্রথম দেখার দিন এভাবেই বলেছিল।
ও উত্তরে বলল, ‘আমি মারিয়া, ফ্রম ঢাকা বাংলাদেশ’
আমাদের এই পরিচয় পর্বটা হচ্ছিল চেন্নাইয়ের এপোলো হাসপাতাল থেকে এক কিলোমিটার দূরে কাট্টুপাক্কাম এলাকার একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে।
এর কিছুদিন পরে দূর থেকে একটা রেস্টুরেন্টে আমি মারিয়াকে খেতে দেখেছিলাম। সাথে আরো দুএকজন ছিল হয়ত।। প্রাইভেটলি খাওয়াদাওয়া করছে দেখে আমি আর এগিয়ে যাইনি। একই ভাবে মারিয়াকে আরেকদিন দেখেছি, পাশের একটা কফিশপে।
সেদিন সে খুব হাসছিল। মজা করছিল। পাশে একটি ছেলে, সম্ভবত ভাই আর গম্ভীর হয়ে থাকা মধ্যবয়সী একজন মহিলা সম্ভবত মা বসেছিল। দেখে মনে হচ্ছিল গম্ভীর হয়ে বসে থাকা মা একজন রোগী। হয়ত তারই কারো চিকিৎসার জন্য ওরা এখানে এসেছে।
কেননা চেন্নাইতে কোন বাঙালী হানিমুন করতে বা ছুটি কাটাতে আসেনা। অবশ্যই চিকিৎসার কারণে আসে। এরাও নিশ্চয় এই কারনে এসেছে।
আমিও সে একই কারণে এসেছি। এটেনডেন্ট হিসাবে।
কিন্ত মারিয়ার সাথে আলাপ না করলে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, কে আসলে রোগী। আমি মনে মনে ওর মা’কে রোগী বানিয়ে ভাবা শুরু করলাম যে, ভাইবোন এসেছে মায়ের সাথে। আমি যেমন ছোট খালার এটেনডেন্ট হিসাবে এসেছি। এমনটি হলে আমি বা মারিয়া মূলত একই স্টাটাসের। দুজনেই এটেন্ডেন্ট। এটা ভেবে মারিয়ার সাথে আলাপের গভীরতা তৈরী করার জন্য মনের মধ্যে একটা তাড়া অনুভব করলাম।
ধরে নেওয়া ঠিক হবেনা যে, এটা মুগ্ধতা বা প্রেম। বিদেশের মত জায়গায় যেখানে বাংলাদেশের সমাজ নীতি কাজ করেনা, লোকভয় নেই, নিজের ভাষায় কথা বলা লোকের অভাব সেখানে একটা উদার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য এটাকে এক ধরনের আকাঙ্খা বলা যেতে পারে। আমার মধ্যে তাই আলাপের একটা আকাঙ্খা তৈরী হচ্ছিল। আকাঙ্খা এমন হচ্ছিল যে আমার রোগীর এটেনডেন্ট হিসাবে আমার কিছু কর্তব্য ছিল তা প্রায় ভুলে আমি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের দিকে নিয়মিত ভাবে পাক দেবার ব্যাপারটা নিয়মিত রুটিন হিসাবে রেখে দিচ্ছিলাম।
কিন্ত নিয়তি অলক্ষ্যে হাসল।
মারিয়া আসেনা। তা প্রায় সপ্তাহখানেক। কোন কিছু না পেলে তার আকাঙ্খা যে জ্যামিতিক হারে বাড়ে তা বলা বাহুল্য। আমারও একই অবস্থা। একদিন আমার রোগী ছোট খালা আমার এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন আমি ঠিক আছি কিনা! আমি যে কিঞ্চিত এলোমেলো তা তার মনে হয়েছে।
এরপর একদিন ভাগ্যদেবী সহায় হলেন,
ফের ডিপার্টমেন্ট স্টোরে মারিয়ার সাথে দেখা। এবার আমিই এগিয়ে গিয়ে পাকড়াও করলাম৷ কিন্ত তার দুচোখে দূর নীল সমুদ্রের উদাসীনতা। আমায় চিনল কি চিনল না সেটা ওর বাহ্যিক হাসিতে বুঝতে পারলাম না। আমি দমে না গিয়ে অধিকার নিয়েই বললাম,
‘কি ব্যাপার মারিয়া, এতদিন কোথায় ছিলেন?’
এবার স্মিত হাসলো, ‘কেন খুঁজছিলেন আমায়? ‘
‘হ্যা, খুঁজেছিলাম। প্রায় প্রতিদিন’
‘ওমা তাই নাকি! আমি তো আপনাকে দুদিন দেখলাম।’
‘কবে?’
‘ঐ যে চেন্নাই এক্সপ্রেস হোটেলে আর কফিশপে।’
‘আপনি আমায় দেখেছিলেন?’
‘হ্যা দেখলাম তো, আপনি স্পাই এর মত আমাদের দেখছিলেন। আচ্ছা, আপনি আবার স্পাই না তো?’
এটা বলে সত্যিই এবার টোল হাসি হাসলো। মনটা আমার ভাল হয়ে গেল। ও বললো,
‘আপনি এগিয়ে আসতেন। আমার মা আর ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতাম।’
এবার বিস্তারিত আলাপ হলো মারিয়ার সাথে।
আলাপের সারমর্মটা খুবই হতাশার ও কষ্টের।যা শোনার জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তত ছিলাম না। আমি যা ভেবেছিলাম তার উল্টাটা ঘটেছে দেখে আমিও কেমন বাকহারা হয়ে গেলাম।
মারিয়া ক্যানসারের পেশেন্ট। প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার। লাস্ট দু’মাস চেন্নাইয়ের এপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্টেজ থ্রি। কয়েকদিনের মধ্যে অপারেশন করবে বলে ডাক্তার জানিয়েছে।
মারিয়ার দৃঢ় ধারনা, সে বাঁঁচবেনা। অপারেশনের পর সে মারা যাবে বলে সে মোটামুটি নিশ্চিত। তাই তার ইচ্ছামত জীবন যাপন করছে। ওর সাথে আসা মা আর ভাই ওর স্বাধীন জীবন যাপনে কোন প্রকার বাঁধা তো দেয়না বরং ওর ইচ্ছাটাকে সম্মান দেখিয়ে ও যা চায় সেটা করতে সহায়তা করে যাচ্ছে। বুয়েটের থার্ড ইয়ারের ছাত্রী সে। এত ব্রিলিয়ান্ট একটা মেয়ে হটাৎ করে জীবনের এমন একটা কঠিন বাঁকে এসে দাঁড়াবে ভাবাই যায়না। কেউ ভাবতেই পারেনা। যে বা যারাই শোনে তাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।
এসব শোনার পর কোন কথা দিয়ে সান্তনা দেব?
শক্তি হারিয়ে ফেলি আমি। ও যে এমন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত তা ওকে দেখে বোঝার উপায় ছিলনা। কিছুদিন আগেও যখন টেস্ট করা হয়নি তখন ও নিজেও নাকি জানতনা যে এমন একটা মারাত্মক রোগ শরীরে বহন করে চলছে। কী আশ্চর্য!
আমি মারিয়ার সাথে আলাপ করতে করতে নিজে কেমন দিকহারা হয়ে পড়ছিলাম বারবার। নিজেকে সামলে একপাশে রাখা একটা টুলের উপর বসে থাকলাম৷ কিছুক্ষন পর সম্বিত ফিরে তাকাতেই খেয়াল করলাম ততক্ষনে মারিয়া সে স্থান ত্যাগ করেছে। আমার মন এত খারাপ হল যে গেস্ট হাউজে আমি একা বসেই থাকলাম। সন্ধ্যা হল। এখানকার সন্ধ্যায় আলাদা তেমন কিছু না বরং দেশের তুলনায় এখানে অপেক্ষাকৃত শান্ত, চুপচাপ আর হিউমিড। আমিও চুপচাপ হয়ে থাকলাম। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা যে মারিয়ার অবস্থাটা।
পরবর্তি তিন চারদিন আমিও আর বেরোলাম না। এরপর মনে মনে মারিয়াকে খুঁজতে আবার গেলাম ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। যদি দেখা পাই। নাহ নেই।
আমি আনমনে এটা কিনি ওটা কিনি। এভাবে স্টোর বন্ধ করে দেবার উপক্রম হওয়ার মত হলে বেরিয়ে যাই। এভাবে কাটতে থাকে বেশ কিছুদিন। তবে একদিন দেখা হয়ে গেল মারিয়ার সাথে।
সেদিন আরো চঞ্চল লাগছিল তাকে।
আমাকে দেখে প্রশ্ন করল, ‘কি মি: জন মিল্টন। কই ছিলেন? আপনাকে আমি ভীষনভাবে খুঁজছিলাম। খুব দরকার ছিল’
‘কি বল তাই নাকি? কি সৌভাগ্য আমার।!’
‘সৌভাগ্য আমার।আপনার না। তা না হলে আপনার দেখা পাই?’
আমি মারিয়ার চোখের দিকে তাকালাম। সেই চোখের গভীরে কি এক বেদনার ঢেউ আর তা যেন আমার বুকের মধ্যে এসে বাড়ি মারছে।
‘শুনুন, আমাকে হেল্প করতে হবে আপনার।আমার মা বা ভাই কেউ যেতে চাইছেনা কিন্ত আমি পুলিক্যাট লেকের আইল্যান্ড, ইরুক্কাম বীচে একটি জোছনারাত কাটাতে চাই। নারকেলের পাতায় ঝিলিক জোছনা দেখব আপনার বাহুতে মাথা রেখে। দুজনে বালিতে উদ্দাম নাচ নাচব। হাত ধরাধরি করে বালুকাবেলায় হাঁটব আদিবাসিদের দেয়া কাঠগোলাপের মালা পরে। একটা দিন চুটিয়ে প্রেম করব। আপনি নিয়ে যাবেন আমায়?’
আনন্দটুকু লুকিয়ে আমি গাঢ় স্বরে তুমি করে বললাম, ‘তোমার পরিবার আমার সাথে যেতে দেবে?’
‘কি যে বলেন না, মৃত্যু পথযাত্রী একটা মেয়েকে আর কি দিয়ে বাঁধবে ওরা।’
‘ধ্যাত, এসব মৃত্যু ফিত্যু নিয়ে কথা বললে আমি যেতে চাইনা।আর এসব আপনি করে বললেও আমি যাবোনা।’
মারিয়া হেসে মাথা কুর্নিশ করে বলল, ‘আচ্ছা বাবা, ঠিকাসে। বলছি না। রাজি তো?’
‘হুম।রাজি।’
‘গ্রেট। এজন্যেই আপনাকে না মানে তোমাকে কে আমার আলাদা লেগেছিল। রঙ তুলির মানুষ তুমি তাই হৃদয়টা সবার থেকে আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। রঙ তুলির মানুষেরা নরোম মনের হয়।’
ও তো আর জানেনা মারিয়ার দুখানি চোখ টোল হাসিতে আমি আগেই খুন হয়ে আছি। একেবারে আমার মার্ডার অবস্থা।
সেদিন রাতেই সমুদ্রপারের হোটেল, রেস্টুরেন্টের খাওয়াদাওয়ার তালিকা, ঘোরাফেরার বোটসহ সবকিছুর বুকিং দিয়ে ফেললাম।
হাসপাতালের ফিনাইলের মাথা ধরা গন্ধ, মৃত্যুর স্পর্শ, ডাক্তারদের নানাবিধ টেস্ট আর তাদের গম্ভীর চেহারা, জীবনমৃত্যুর দোলাচাল থেকে দূরে যেতে পেরে ভাল লাগছে আমার। সবচে ভাল লাগছে মারিয়ার চোখেমুখে উদ্দাম হাসি আর আনন্দ দেখে। ওর চোখ উপচে পড়ছে আনন্দ। সে আনন্দ এক অপার্থিব আনন্দ। ও আগামী কালকের আগত বেদনায় ন্যুব্জ হয়ে না থেকে আজকের মুহুর্তটাকে এনজয় করছে। দুদিন পর জীবন হাতে নিয়ে অপারেশনের টেবিলে শুয়ে পড়বে তা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না।বরং ওকে নয় আমায় বারবার উদাসীনতা বা বিরহ ঘিরে ধরতে চাইছিল। সেটা দেখে মারিয়ার চিৎকার করছিল পানিতে হাত ডুবিয়ে। চিৎকারে আমার উদাসীনতা তা খানখান হয়ে যাচ্ছিল,
‘এই যে শুনছ, দু:খু মিয়া? এই যে একদিনের প্রেমিক আমার।এসব মৃত্যু নিয়ে ভেবে তুমি মাঝে মাঝে চুপ হয়ে যাচ্ছ কেন? শোন, এসব ভেবনা আর দোহাই সত্যিকারে আমার প্রেমে পড়োনা। আমায় সিরিয়াসলি ভালোবেসোনা। আমায় ভালবাসলে তখন আমার বাঁচতে খুব ইচ্ছে করবে, কিন্ত আমি তো আর বাঁচবনা। বরং আজ আমার সাথে আনন্দ করে নাও। দোহাই তোমার ‘ এই বলে গাইতে থাকল সে-
“দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও দাও ফুর্তি কর
আগামীকাল বাঁচবে কিনা বলতে পার?”
এই মেয়ের সাথে মন খারাপের মানে হয়না। এর সাথে মন খারাপ করা যায়না। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি কিভাবে মারিয়াকে সারাক্ষণ হাসিখুশি রাখা যায়। সেটা সে নিজেই থাকছে।আমি লেকের বীচ এলাকায় আদিবাসিদের দিয়ে একটা প্রগ্রাম ফিক্সড করে রেখেছি। ওরা নেচে গেয়ে এন্টারটেইন করবে।আর আমার সাথে নিয়েছি কয়েকটা পেপার, ব্রাশ আর জলরং। দুজনে ছবি আঁকব সমুদ্র পাড়ে বসে।
সাগরের বিশাল ব্লু ক্যানভাস পাড়ি দিয়ে নারকেল সারিতে ঘেরা একটা বীচে এসে পৌছালাম আমরা। মালপত্র রুমে রেখে বীচের উদ্দাম বাতাসে একপাক নেচে উঠল মারিয়া। বীচের পাশে পাম আর বাদাম গাছের নীচে নানা রঙের ইজিচেয়ার সাজানো। আমি ভাবছিলাম বিকালে ওখানে বসে দুজন ওয়াটার কালার নিয়ে বসব। ছবি আঁকব।
মারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর হটাৎ দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেল।আমি ওর কোমরে হাত রাখলাম।
“চলো আগে ঝিনুক কুড়িয়ে আনি।”
সারাক্ষন গুন গুন করে গাইছে মারিয়া। আসলে ও একাই মজা করছে। করুক। আমি ওর সাপোর্টে আছি।
বিকালে দুজনে ওয়াটার কালার নিয়ে বসলাম। আমি আঁকলাম নীল জলের এক অসাধারন সমুদ্র যা উচ্ছল জীবনের৷ আর মারিয়া আঁকল অসাধারন সূর্যাস্তের ছবিটার ভাষায় যেন ওর ফুরিয়ে যাবার সময় এসেছে বোঝাতে চেয়েছে। বিলীয়মান সূর্যের আবীর রঙ জীবনের মত সে।আমরা ছবিদুটো ইন্টারচেঞ্জ করলাম৷ আমার কাছে রইল মারিয়ার স্বাক্ষর করা সূর্যাস্তের ছবিখানা।
সন্ধ্যায় বীচের সৌন্দর্য অন্যরকম। মারিয়া
আমার হাতের মধ্যে হাত দিয়ে সারাটা বীচ ঘুরল। কখনো আমার কাঁধে মাথা রেখে সমুদ্রের পানে চেয়ে রইল। বলল,
‘আচ্ছা আমার যদি এই রোগ না হত তাহলে তুমি কি আমায় বিয়ে করতে? ‘
‘না হলে কি? এখনো বিয়ে করতে পারি। এখনই আমি বিয়ে করতে চাই’
হাটুগেড়ে প্রপোজ করার ভঙ্গি নিয়ে বললাম,
‘আমায় বিয়ে করবে? চলো, আদিবাসিদের ঐ নাচের অনুষ্ঠানে। ওখানেই মালাবদল হবে আমাদের। রাজি?’
মারিয়া খুউব খুশি হল। বলল, সত্যি?
‘হ্যা’
আমরা আদিবাসীদের মেলায় গিয়ে কাঠগোলাপের দুটো মালা নিয়ে এই সমুদ্র আর উঠি উঠি চাঁদকে, বিশাল বালুকারাশিকে, মায়াবী ঢেউগুলোকে স্বাক্ষীকরে মালাবদল করে ফেললাম। আমাদের দুজনের মনের বিয়েটা হয়ে গেল। তারপর দুজনে বীচের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষন চুমু খেলাম। ও হাঁপিয়ে উঠল। বুক ধড়ফড় করে উঠল মারিয়ার।
বলল, ‘বেশি চুমু খেওনা। তাহলে কিন্ত আমার মরার বদলে বাঁচার ইচ্ছে হবে। তখন অযথা যমে মানুষে ব্যাপক টানাটানি হবে। তাতে আমার কষ্ট হবে। তারচেয়ে এই আনন্দটুকু নিয়ে আমি বরং ওটির বিছানায় শুয়ে পড়ি’
আমি ওর কপালে গাঢ় একটা চুমু খেয়ে বললাম ‘আসো এই সময়টাকে সুন্দর করে রাখি।’
দুজনে সাঁতার কাটলাম, বারবিকিউ খেলাম, জুস খেলাম,মিউজিকের তালে তালে নাচলাম, । এরমধ্যেই দেখতে পেলাম চিরল চিরল নারকেলের পাতায় জোছনা খেলে যাচ্ছিল। চিক চিক করে উঠছে চারপাশ। স্বর্গীয় একটা পরিবেশ।
আমরা দুজন সমুদ্রকে সামনে নিয়ে বালির মধ্যে বসে ছিলাম। আমার কাঁধে মারিয়ার মাথা এলিয়ে দিয়ে জীবনকে ভোগ করছে, বেঁচে থাকাকে শেষবারের মত সেলিব্রেট করছে। মাঝে মাঝে আমাকে চুমু খাচ্ছে, জড়িয়ে ধরছে। আমার মধ্যেও অসীম মায়া আর ভালবাসা জন্ম নিচ্ছে মারিয়ার জন্য।
রাত গভীর হলে ঠান্ডা আর ঘুমজড়ানো মাতাল কন্ঠে মারিয়া বলল,
‘এই আমি তোমার বউ না? আজ আমাদের বিয়ে হল না?’
‘হ্যা’
‘তাহলে বৌ কে নিয়ে সারারাত বাইরে বসে থাকবে ? বাসর করবে না?’ – বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
আমি ওকে কোলে করে কটেজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ে চাদর টেনে দিলাম। তারপর জানালায় তাকিয়ে সমুদ্রের আবছা ঢেউ দেখতে দেখতে কখন জানি আমার চোখ নোনাপানিতে ভরে উঠল টের পেলাম না।
মারিয়া ঘুমাচ্ছে।
আর আমি ওর পায়ের কাছে বাচ্চাদের।মত ফুঁপিয়ে কাঁদছি। কেন ওর এমন অসুখ হল!!
এর ঠিক তিনদিন পর আমি ওটির বাইরে বসে আছি। হাতে মারিয়ার আঁকা সূর্যাস্তের জলরং ছবিখানা। ভেতরে মারিয়ার অপারেশন চলছে। কেউ জানেনা সে অপারেশনের পর ফিরবে কিনা? খুবই রিস্কি একটা অপারেশন। সময় যেন থমকে গেছে হাসপাতাল এলাকায়। শব্দ নেই। শুধু আমার বুকের মধ্যে ঘড়ির মত টিকটিক শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমি বারবার মারিয়ার সূর্যাস্তের ছবিখানা দেখছি। সেখানে তার করা স্বাক্ষরখানি দেখছি। তারপাশে লেখা আছে ‘আমি মরে গেলেও আমার ছবি কইবে কথা’। আমার চোখে ঝাপসা দেখছি বারবার। চোখ দুটি ভরে যাচ্ছে নোনাপানিতে।
দূর থেকে ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি ওটির লালবাতি।
আর আমি মনে মনে বলছি,
‘মারিয়া একবার ফিরে আসো
তোমার সাথে আমার শুরু করা হয়নি কিছু।
এখনো অনেক বেঁচে থাকা বাকী আমাদের’।
Leave a Reply