দিগন্তের গর্ভপাত
সময়ের বন্ধ্যাত্ব যদি পথের অন্ধত্বের সঙ্গে সন্ধি করে,
সেখানে সকল সম্ভাবনা সর্বনাশের দোসর হয়ে মরে—
ঠিক যেমন আলো মরে যায় জানালার সামনে দাঁড়িয়েই,
কারণ ভেতরের ঘর আলো সহ্য করার শপথ ভেঙে ফেলেছে।
তখন ভোর আসে না, বরং ভোরের ভান করে এক ক্লান্ত ধূসরতা,
যে ধূসরতা ঘড়ির ভেতর জমে থাকা ছাইকে সময় বলে চালায়।
ছায়ারা মানুষের আগে আগে হাঁটে দীর্ঘ করিডোরে,
আর মানুষ পড়ে থাকে পেছনে, নাম, মুখ আর উদ্দেশ্য খুইয়ে।
শব্দেরা জন্ম নেয় জিহ্বাহীন অবস্থায়,
উচ্চারণ করতে গেলেই তাদের গায়ে লেগে যায় পুরোনো মরিচা ও ভয়।
আকাশ ভুলে যায় নীল হওয়ার শৃঙ্খলা,
মেঘেরা শেখে কফিনের ভাঁজে কীভাবে চুপ করে থাকতে হয়।
দিগন্ত বারবার গর্ভপাত ঘটায় অনাগত সকালদের,
প্রতিটি সকাল জন্মের আগেই মৃত্যুর কাগজে সই করে।
মানচিত্র অন্ধ হয়ে নিজের দিক নিজেই জিজ্ঞেস করে,
কম্পাস ঘোরে ক্ষতের চারপাশে, দিকনির্দেশ নয়, ব্যথা মেপে।
স্বপ্নেরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষার কক্ষে,
মৃত্যু-অনুমতির সিলে সই পড়ার শব্দ শোনার আশায়।
আশা বসে থাকে কোণঠাসা ঘরে,
চোখে বাঁধা সাদা কাপড়, তবু ভেতরে ভেতরে আলো কাঁপে।
ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকে দেওয়ালে টাঙানো এক ভাঙা ঘড়ির ফ্রেমে,
যেখানে সময় আর চলে না, শুধু প্রদর্শনী হয়ে থাকে।
ইতিহাস দাঁত চেপে হাসে, কারণ সে জানে—
এই অন্ধত্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি শেখানো ও অনুশীলিত।
রাত এখানে দীর্ঘ হয় পরিকল্পনার শৃঙ্খলায়,
অন্ধকার প্রশিক্ষণ নেয় কীভাবে সব প্রশ্ন নিঃশব্দে গ্রাস করতে হয়।
আলোকে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ ঘোষিত,
কারণ উত্তর মানেই অপরাধ, আর অপরাধ মানেই নিয়ম।
মানুষের ভেতর মানুষ নেই, আছে কেবল ব্যবহারযোগ্য ছায়া ও ভূমিকা,
সময় হাঁটে উল্টো দিকে, পেছনটাই তার একমাত্র গন্তব্য।
তবু ধ্বংসস্তূপের নিচে, সব নিষেধাজ্ঞার বাইরে,
সব হিসাব যখন নিজের জালে জড়িয়ে পড়ে,
যুক্তির পাতায় পাতায় ভুলের ঘাম জমে থাকে,
ঠিক তখনই;
জটিল সমীকরণের মানে বুঝতে বুঝতে
চিত্রগুপ্ত হানা দেয়,
খাতার মার্জিনে লিখে যায় অদৃশ্য হিসাব;
কে বাঁচবে, কে মুছে যাবে।
নিয়মেরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়,
সময়ের আদালতে সাক্ষী বলতে কেউ এগোয় না,
কারণ সত্য এখানে অতিরিক্ত প্রমাণ।
আর সেই নীরবতার ভেতর,
যেখানে কথা বলা মানে নিজেকে মুছে ফেলার সম্মতি,
ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়ে থেকেও—
যেখানে প্রাণেরা পরিসংখ্যান হয়ে যায়
আর মৃতেরা কেবল সংখ্যার ভুল;
চিত্রগুপ্ত হানা দেয়
জটিল সমীকরণের মানে বুঝতে বুঝতে;
তার খাতায় আর পাপ-পুণ্যের কলাম নেই,
আছে আনুগত্য, আছে অবাধ্যতার দাম,
আছে কে প্রশ্ন করেছিল,
আর কে চুপ থেকে বেঁচে গিয়েছিল তার হিসাব।
রাষ্ট্রের ভাষা এখানে গণিত, ভুল মানেই শাস্তি,
সঠিক মানেই নিখুঁত নীরবতা।
আর ঠিক সেই হিসাবের ফাঁকে,
সব সিল, সব আইন, সব ভবিতব্য অমান্য করে
একটি অবাধ্য বীজ
প্রশ্ন হয়ে ফেটে পড়ে;
মাটি নয়, ভবিষ্যৎকে খুঁজতে।
Leave a Reply