1. pszxbqua@oonmail.com : angelastine3 :
  2. ashelyculver@poochta.ru : ashelyculver8 :
  3. hthvlixr@mailkv.com : charlene45s :
  4. liubomir8745@gmail.com : creatanlije :
  5. sirazul2664@gmail.com : dakhinbongonews : দক্ষিণবঙ্গনিউজ ২৫.কম
  6. diarly@teml.net : diarly@teml.net :
  7. gisdosmh@mailkv.com : hassanrude7 :
  8. jordozognu@gufum.com : jordozognu :
  9. Nadiburipaji@gmail.com : Nadia :
  10. nola_partee@poochta.ru : nolapartee02 :
  11. pamalaisom@spacemaiil.ru : pamalaisom4 :
  12. patty_pokorny.8035@smass.store : pattypokorny7 :
  13. Shahneowanalam@gmail.com : Shahneowaj :
  14. Shahneowajalamkb@gmail.com : Shahneowajalam :
  15. shibuojha1997@gmail.com : shibu ojha :
  16. tara_benedict@poochta.ru : tarabenedict882 :
  17. vilma.ontiveros@poochta.ru : vilmaontiveros :
  18. fullermichaelsen980@kingsemails.com : wintermargin47 :
জনপ্রিয় লেখক মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার এর গল্প “সাদা পিরিচ”। - dakhinbongonews25
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৮:২৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
আসন্ন রামপাল ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হবেন মোহাম্মদ হোসেন পুস্তি সরিকল ইউনিয়নকে আদর্শ ইউপিতে রুপান্তর করতে চেয়ারম্যান হতে চান মিরন ৫ নং ধাওয়া ইউনিয়নে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছাএনেতা মোহাম্মদ সম্রাট সিকদার। ৫ নং ধাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও তরুণ সংগঠক মোহাম্মদ সম্রাট সিকদার  ইকড়ি ইউনিয়নে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে, আলোচনায় শীর্ষে এস.এম.এ আলীম সরকারকে বাংলাদেশ ন্যাপ : জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহন করুন সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি প্রত্যাশী বেগম রহিমা শিকদার জাতির উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা: নতুন ভোরের ডাক। আড়িয়লে ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারণায় নির্বাচনী গণসংযোগ নাটোর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী
বিজ্ঞাপন
★বইমেলা-২০২৬★ বইমেলার ২০২৬ উপলক্ষে আমাদের প্রস্তুতি বেশ ভালো, অনেকগুলো নতুন পাণ্ডুলিপির কাজও চলমান। সম্মানীত লেখকদের বলছি, আগামী বইমেলার জন্য লেখা প্রস্তুতের এখনই উপযুক্ত সময়। কেন বলছি? কারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে নির্ভুল সম্পাদনা, পাঠকপ্রিয় ও মানসম্মত বই প্রকাশের সুযোগ থাকে বেশি। তাই পাণ্ডুলিপি নির্বাচন ও প্রস্তুতের এখনি উপযুক্ত সময়। মনে রাখবেন, পাণ্ডুলিপি ২৫টি ধাপ পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে একটি বই হয়। তাই মানমম্মত বই প্রকাশ করতে হলে যথেষ্ঠ সময়েরও প্রয়োজন। আগামী বইমেলায় সপ্তর্ষি প্রকাশন এর সাথে যারা যুক্ত হতে চান তারা যোগাযোগ করতে পারেন। ধন্যবাদ। Shibu Chandra Ojha প্রকাশক, সপ্তর্ষি - Saptarshi ৩৭/১ খান প্লাজা, তৃতীয় তলা, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ ফোনঃ 01714225520/01712158340 হোয়াটস অ্যাপ -01318403248 ই-মেল:shibuvgco@gmail.com

জনপ্রিয় লেখক মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার এর গল্প “সাদা পিরিচ”।

  • সর্বশেষ আপডেট শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ৩৮৩১ বার দেখা হয়েছে

সাদা পিরিচ
লেখক: মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার

দরজা খুলে রবিউলকে দেখে প্রচণ্ড অবাক হলো সুষমা। কয়েক সেকেন্ড লাগল তার রবিউলকে চিনতে। ছুটির দিনে অফিসে যেতে হয় না বলে সুষমা একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে। তাই কলিং বেল বাজায় সে খুব বিরক্ত হয়েছিল। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে দরজা খোলে সুষমা। বাইরে দাঁড়ানো লোকটিকে দেখে প্রথমে মনে হলো, তার পরিচিত কেউ। কিন্তু সে ঠিক চিনতে পারছিল না। ঘাড় কাত করে রবিউল যখন জিজ্ঞেস করল, ‘কী কর?’ সুষমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল—এ তো রবি! তার এক্স-হাজবেন্ড।
তাদের ছাড়াছাড়ি হয়েছে প্রায় সাত বছর আগে। রবি কখনো তাকে ‘কেমন আছ?’ জিজ্ঞেস করত না; সে বলত ‘কী কর?’ কেন বলত—কে জানে! তবে সে এই কথাটা বলত মাথা ঝুঁকিয়ে ঘাড় কাত করে। সেই ভঙ্গিটা এখনো সুষমার চোখে লেগে আছে। তাই রবিউল কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই সে ওকে চিনতে পারল।
কিন্তু কী অবস্থা রবির! কেমন যেন জবুথবু, অনেক বয়স্ক মনে হচ্ছে তাকে। রবি সব সময় ক্লিন-সেভড থাকত; স্টাইলিশ জামা-কাপড় পরত, চুল থাকত পরিপাটি। কিন্তু আজ—উসকোখুসকো চুল, গালভরা দাড়ি, অতি সাধারণ জামা-কাপড়ে রবিকে দেখে সুষমা হিসাব মেলাতে পারছিল না। হতভম্ব সুষমা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না সে রবিকে ভিতরে আসতে বলবে, না কি দরজায় দাঁড়িয়েই তার সাথে কথা বলবে। কী যেন সাত-পাঁচ ভেবে সুষমা বলল, ‘আস, ভিতরে আস।’
রবিউল ভিতরে এসে সোফায় বসল; কেমন যেন অস্বস্তি কাজ করছে তার মধ্যে; সুষমার দিকে তাকাচ্ছে না, ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।
সুষমা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছ?’
রবিউল উত্তর দিল, ‘আছি মোটামুটি। বাসায় আর কেউ নেই?’
‘আর কে থাকবে! আমি থাকি আর কাজের বুয়াটা এখনো আসেনি,’ বলল সুষম।
‘ও আচ্ছা।’
রবিউল চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। ঘটনার আকস্মিকতায় সুষমার প্রায় দম-বন্ধ অবস্থা, বুক ধড়ফড় করছে।
‘আচ্ছা তুমি একটু বসো, আমি ঘুম থেকে উঠে এখনো ফ্রেশ হইনি। একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি,’ বলে সুষমা উঠে চলে গেল।
আসলে সে একটু সময় চাইছিল নিজেকে সামলানোর জন্য। রবি যে কোনোদিন এভাবে তার সামনে উপস্থিত হবে, এটা সুষমা কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি। রবির সামনে কী বলবে বা কী করবে কিছুই সে বুঝে উঠতে পারছিল না।
সুষমা ফিরল মিনিট বিশেক পর; হাতে সাদা পিরিচে রাখা এক গ্লাস পানি। পানির গ্লাসটি রবিউলের সামনে টেবিলে রাখল সে। রবিউল তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। পানির গ্লাসের দিকে চোখ পড়তেই সে মুখ তুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল সুষমার দিকে।
তারা যখন বিবাহিত ছিল, রবিউল যখনই ঘরে ফিরত, সুষমা এভাবে রবিউলকে পানি দিত—সাদা পিরিচে করে। রবিউল প্রায়ই বিরক্ত হতো, বলত, ‘পানি দাও গ্লাসে সেটা ঠিক আছে, কিন্তু সাথে সাদা পিরিচ দাও কেন অযথা? এটা কী কাজে লাগে?’
সুষমা সব সময় মুখ টিপে হেসে উত্তর দিত, ‘গ্লাসটা হচ্ছে তৃষ্ণার জল; আর সাদা পিরিচটা হচ্ছে তোমার জন্য আমার ভালোবাসা।’
কথাটা মনে হতে রবিউল একবার সাদা পিরিচটার দিকে তাকাল আবার মুখ তুলে সুষমার চোখের দিকে তাকাল। তারপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে শেষ করল; মনে হলো সে সারা জনমের তৃষ্ণা নিবারণ করছে।
‘তোমার কি কোনো জরুরি দরকার আছে আমার কাছে?’ সুষমা জিজ্ঞাসা করল রবিউলকে।
রবিউল আঙুল তুলে তাকের উপরে রাখা অ্যালার্ম ঘড়িটার দিকে ইশারা করে বলল, ‘ওটাই?’
সুষমা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘ও হ্যাঁ, সেটাই তো। এখন আর কাজ করে না—ব্যাটারি বদল করা হয় না অনেক দিন।’
এই অ্যালার্ম-ঘড়ি নিয়ে প্রতিদিন তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। সুষমা সকালে অ্যালার্ম বাজার পর দশ মিনিটের জন্য অফ করে আবার ঘুমাত, আবার অ্যালার্ম বাজলে আবার অফ করত। কয়েকবার এমন করার পর সে বিছানা থেকে উঠত। এই কাজটি ছিল রবিউলের কাছে প্রচণ্ড বিরক্তিকর। সে বলত, ‘আরে বাবা, অ্যালার্ম আধা-ঘণ্টা পরে সেট করলেই তো হয়, বারবার অন-অফ করার দরকার কী? যখন বাজবে তখন উঠে যাবে।’
কিন্তু কে শুনে কার কথা! সুষমা রবিউলের কথায় কখনো কানের মাছিটিও নাড়তো না। সে রুটিন মাফিক প্রতিদিন একই কাজ করত।
রবিউলের দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকলো ঘড়িটার উপর।
‘নাস্তা করেছ? চা খাবে?’ সুষমা জিজ্ঞাসা করল।
রবিউল একরাশ জড়তা এবং ভয় মেশানো চোখে সুষমার দিকে তাকাল; তারপর বলল, ‘তোমার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। এক রকম সাহায্য চাইতে এসেছিও বলতে পারো। আর কার কাছে যাব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।’
রবি আর সুষমার বিয়েটা হয়েছিল হঠাৎ করে। প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাশীল, নিজের আপন জীবন-বৃত্ত গড়ার সংকল্প ছিল সুষমার। প্রেম-ভালোবাসার দিকে খেয়াল করেনি সে কখনো। তখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী। সেই সময় একদিন, তার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মাধ্যমে রবিউলের প্রস্তাব আসে। রবিউল তখন সদ্য কানাডা থেকে মাস্টার্স করে ফিরেছে, নামী এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছে। সুশিক্ষিত, ভদ্র—সব মিলিয়ে ‘একজন ভালো ছেলে’ হিসেবে পরিবারের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে চলে আসে রবিঊল। সুষমার পরিবার খুশি, পাত্রপক্ষের আগমনে প্রস্তুত হয়ে যায়—কিন্তু সুষমা ছিল দ্বিধায়।
একদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পর ভাবি হাসিমুখে সুষমাকে বলল,
‘আপু আসছেন! আপনার তো ঘণ্টা বাজে গেছে!’
‘ঘণ্টা বেজে গেছে মানে? কিসের ঘণ্টা?’
‘আপনার বারোটা বেজে গেছে, সেই ঘণ্টা।’
‘দূর ভাবি, দুষ্টামি না করে বলো, কী হইছে?’
‘আরে, তোমার বিয়ের ঘণ্টা বাজে গেছে, কাল তোমারে দেখতে আসবে।’
সুষমা কেমন যেন চমকে উঠল, ‘কাল? এত তাড়াতাড়ি?’
‘হ্যাঁ, কানাডা ফেরত রাজ-পুত্তুর। এখন যাও, ড্রয়িংরুমে—বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল সুষমা।
‘বাবা, আমি এখনো পড়ছি, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছি। এখন বিয়ের কথা ভাবছি না,’ বলেছিল সে বাবাকে।
সুষমার বাবা ফরিদ সাহেব খুবই শান্ত, ধীর-স্থির মানুষ। উনি বলেছিলেন, ‘দেখ মা, বিয়ে তো তোকে একদিন করতেই হবে। যতদূর শুনেছি ছেলেটা ভালো। কাল ওরা আসবে, দেখার পর ভালো না লাগলে বা তুই বিয়ে করতে না চাইলে নিষেধ করে দিবি। কেউ তো তোকে জোর করবে না।’
সুষমা চুপ করে ছিল, বাবার কথার কোনো উত্তর দেয়নি।
দিনটি ছিল গ্রীষ্মের এক প্রচণ্ড গরম দিন—রোদের ভিতরে যেন জ্বলে যাচ্ছিল আকাশটাও। সমস্ত বাড়ি ঝকঝকে পরিপাটি করে সাজানো হয়েছিল। ঘরজুড়ে ছিল মায়ের উৎকণ্ঠা, বাবার ব্যস্ততা, আর আতিথেয়তার গন্ধ।
রবিউল ও তার পরিবার সুষমাকে দেখতে এসেছিল। সুষমার মন ছিল বিরক্ত, ক্লান্ত, আর অস্থির।
‘আমি এখনো মাস্টার্স করছি, এসব ঝামেলায় যেতে চাই না,’ মায়ের কানের কাছে গিয়ে বলেছিল সে।
‘দেখা করলেই তো আর বিয়ে করতে হবে না। দেখতে দোষ কী?’ মা বলেছিলেন।
ভাবি সুষমার সাজগোজ ঠিক করে দিচ্ছিলেন। সবকিছুর শেষে কপালের মাঝে ছোট্ট একটা লাল টিপ বসিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এইবার হইছে! ওই ব্যাটার সর্বনাশ কইরা দিলাম, খালি তোমারে একবার দেখলেই হইছে,’ বলে খিলখিল করে হাসছিলেন।
অবশেষে, দুরুদুরু বক্ষে ধীরে পা টেনে টেনে ড্রয়িংরুমে ঢুকল সুষমা। চোখ তুলে তাকাতেই রবিকে প্রথম দেখল। রবিকে দেখার সাথে সাথে একটা বিরাট ধাক্কা খেল সে। রবি যে এতটা সুদর্শন পুরুষ হতে পারে, এটা সে ভাবেনি। গায়ের রং তেমন ফর্সা নয়, তবে জামাকাপড় বেশ ফ্যাশনেবল, এবং রবির মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস, একটা সৌম্যতা ছড়িয়ে ছিল—যা অন্য কারো মধ্যে সে আগে দেখেনি।
রবি অন্য সবার মতো চুপচাপ বসে ছিল না। বরং একটা ছোট্ট বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দেখছিল। মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, চোখে মায়া ভরা আলো।
চোখে চোখ পড়তেই রবির ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। বলল না কিছু, শুধু একটু মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল।
সুষমা ভাবল, এমন পুরুষ কি সে কখনো স্বপ্নে দেখেছিল—যে কাছে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়!
আলোচনার এক পর্যায়ে রবির মা জিজ্ঞেস করলেন,
‘তোমার কি একটু আলাদা করে কথা বলতে চাও, মা?’
সুষমা ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও সম্মতির ভান করল।
সুষমার মা বললেন, ‘তোরা ছাদ থেকে ঘুরে আয়, ওখানে বসার জায়গাও আছে।’
ছাদে টবে কিছু ফুলগাছ থাকায় ছাদটা বেশ সুন্দর লাগছিল। ভ্যাপসা গরম ছাপিয়ে হালকা বাতাস বইছিল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর রবিই প্রথম বলল,
‘তোমার চোখে আমি স্পষ্ট দেখছি, তুমি এই “দেখা”-র ব্যাপারে আগ্রহী না।’
সুষমা একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, মোটেও না। আপনি বুঝলেন কীভাবে?’
রবি মৃদু হাসল, ‘তাও রাজি হয়েছ দেখা করতে—এটাও একটা সাহসের ব্যাপার।’
সুষমা একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনার কি খুব আগ্রহ এই বিয়েতে?’
‘না। আমি শুধু চাই একজন বন্ধু, যার সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায়, যার পাশে বসে থাকা যায় কোনো কারণ ছাড়া, আর যার নীরবতাও বোঝা যায়—সে কী বলছে।’
এই উত্তরটা সুষমাকে কেমন যেন নাড়িয়ে দিয়েছিল। এত সংযত, অথচ গভীর কথা সে খুব কম শুনেছিল জীবনে। তাদের কথা চলল খুবই সংক্ষিপ্তভাবে। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই সুষমা অনুভব করল—এই মানুষটি কেমন যেন অন্যরকম।
সেদিন রাতে মা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেমন লাগল তোর রবিউলকে?’
সুষমা চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে বলেছিল,
‘বিয়ে করতে চাই না… কিন্তু ছেলেটা—ছেলেটা যেন কেমন মনে লেগে গেছে।’
মা হেসে বলেছিল, ‘মনে লেগে গেলে বুঝতে হবে, এই না চাওয়ার মধ্যেই তোর আসল চাওয়া লুকিয়ে আছে।’
মা রুম থেকে বেরুতেই ভাবি ঢুকে বললেন,
‘কইছিলাম না, রবিউল ব্যাটার সর্বনাশ করমু আমি! তোমার কপালে টিপ দেওয়ার সময় দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়া দিছিলাম। দেখ, কাম হইছে। ওরাও তোমারে পছন্দ করছে।’
‘দূর ভাবি, খালি ফাজলামি করো,’ সুষমা বলেছিল।
বিয়ের পর রবি ঠিক সেই মানুষটিই ছিল—নীরব, সহনশীল, আর ভরসার, একটি শান্ত নদীর মতো, যার পাশে দাঁড়ালে আর কোনো উত্তাল ঢেউ সুষমাকে স্পর্শ করতে পারত না। তারা হাসতে হাসতে ঘর সাজিয়েছিল, একসাথে বাজার করতে বেরোত, বইমেলায় যেত, ছাদে বসে চা খেত, রাতে একসাথে বসে টিভি দেখত। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই জীবন হয়ে উঠেছিল পরিপূর্ণ। দেখতে দেখতে ওদের বিবাহিত জীবনের তিনটি বছর কেটে যায়। এই তিনটি বছর ছিল তাদের জীবনের সুন্দরতম সময়, এক অদ্ভুত প্রাপ্তির দিনলিপি।
কিন্তু সময় বদলায়। একসময় সংসারের সবার কাছ থেকে আসতে শুরু করে বিভিন্ন রকম কথাবার্তা, নানা কৌতূহল, কানাঘুষা—কখনো সরাসরি, কখনো বা তির্যক ইঙ্গিত প্রশ্নে…

সবারই যেন একই প্রশ্ন—
‘তোমাদের ছেলে-মেয়ে নেই কেন?’
‘বাচ্চাকাচ্চা হবে কবে?’
‘সব ঠিক আছে তো?’
প্রতিদিনের পরিচিত মুখগুলোর হাসির আড়ালে জমে থাকা কিছু অব্যক্ত প্রশ্ন তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধতে থাকে রবি ও সুষমার মনে। শুরুতে এসব কথায় হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে, যখন সংসার নিয়ে কথা উঠত, তখন সুষমার মনে হতো তার নিঃশব্দ কোনো দোষ সবার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। রবিউলের মা তো রীতিমতো নিয়ম করে বলতেন,
‘তোমাদের সংসারটা শূন্য শূন্য লাগে রে বাবা। একটা বাচ্চা হলে সব ঠিক হয়ে যেত। আমার তো এখনো নাতি-নাতনির মুখ দেখা হলো না। মরার আগে এইটুকু দেখতে ইচ্ছে করে!’
শুরুতে রবি এসব নিয়ে মজা করত।
‘মা, মরা এতো সোজা না, যে তুমি চাইলেই হবে? তোমারে আমি মরতে দিলে তো!’
তবে একসময় এই কথাগুলোতে আর হাসির খোরাক থাকত না; বিরক্তি জমতে লাগল রবির ভেতরেও।
‘মা, এসব নিয়ে আর বাড়াবাড়ি কোরো না। সময়মত সব হবে।’
কিন্তু সময় যেন কেবল চলতেই থাকে—সমাধান দেয় না। রবির মায়ের কথার সুরেও পরিবর্তন আসে—স্নেহের বদলে আসে কৌতূহল, কৌতূহলের নিচে চাপা ব্যঙ্গ, একরাশ হতাশা আর গোপন কান্না জমে উঠত। সুষমার মনজুড়ে একটা অপরাধ-বোধ জমে উঠতে থাকে। সে ভাবত, কোথাও একটা ‘দোষ’ নিশ্চয় তারই। হয়ত তার জন্যই সংসারটা পূর্ণতা পাচ্ছে না। রাতে একা বসে কখনো কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করত, ‘আমি কি অপূর্ণ একজন মানুষ?’
একদিন রবি বাসায় ফিরতেই, সুষমা তাকে বলল,
‘আমি ফার্টিলিটি টেস্ট করাতে চাই। বুঝতে চাই সমস্যা কোথায়।’
রবি অবাক হয়ে বলল,
‘কেন এসব নিয়ে ভাবছো এত? আমরা কি খুব খারাপ আছি? আল্লাহ যখন চাইবেন, তখন হবে। অস্থির হয়ো না।’
‘না রবি, এসব শুনতে চাই না। আমি টেস্ট করাবোই। এটা আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় দুজনেই ফার্টিলিটি টেস্ট করাবে।
হাসপাতালের নিঃশব্দ করিডোরে পাশাপাশি বসে ছিল তারা। কেউ কোনো কথা বলছিল না।
একসাথে টেস্টের স্যাম্পল জমা দিয়ে আসে। দিন দশেক পর রিপোর্ট আসে হাতে।
রবিউল সেদিন অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় বসে রিপোর্ট খুলে পড়ে। তার হাতটা হঠাৎ জমে গেল কারণ রিপোর্টে লেখা ছিল—
Patient: Mrs. Sushama R. Chowdhury; Diagnosis: Congenital Uterine Anomaly. Natural conception unlikely. অর্থাৎ সুষমা কখনো মা হতে পারবে না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে নিশ্বাস নেয়। রিপোর্টটা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিয়ে চোখের কোনে জমে থাকা জলটুকু হাতের পিঠে মুছে নেয়।
সেই রাতে সুষমা জিজ্ঞাসা করল, ‘কি গো, রিপোর্টে কী বলেছে?’
রবির মুখে একটা আলতো হাসি ছিল।
সে শুধু বলল, ‘আমার স্পার্ম কাউন্ট কম। চিকিৎসা করা যাবে। দুশ্চিন্তা কোরো না।’
সুষমা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী! তোমার সমস্যা! ফালতু কথা, তুমি একদম সুস্থ!’
রবি বলল, ‘দেখো, বাচ্চা না থাকাটা আমাদের সম্পর্ক কেড়ে নিতে পারে না। তুমি আর আমি, একসাথে আছি এই সংসারের, এটাই আসল সত্য। বাকি চাওয়াগুলো পাওয়া হলে হবে, না হলেও দোষ নেই।’
সুষমা চোখ ভিজিয়ে ফেলেছিল সেদিন। রবিকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল সেই রাতে।
কিন্তু সমাজ তো থেমে থাকে না; কথা চালাচালি চলতেই থাকে। রবির মা একদিন তো রীতিমতো সুষমাকে অপমান করে বলে বসেন, ‘তোমার জন্যই আমার ছেলের ঘর ফাঁকা। একটা বাচ্চা জন্ম দিতে পারো না—কী রকম মেয়ে তুমি? সংসার করতে এসেছো, না ভাঙতে?’
সেই রাতেই সুষমা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল বিছানায়। তারপর ধীরে ধীরে রবিকে বলেছিল, ‘তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও রবি।’
রবি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, ‘তুমি এসব বলছ কেন?’
‘কারণ আমি জানি… আসল সত্যিটা। আমি বুঝি, তুমি আমাকে রক্ষা করার জন্য নিজেকে দায়ী করেছিলে। বাচ্চা না হওয়ার শারীরিক অসুবিধাটা আমার, তোমার নয়। তুমি লুকিয়েছ, কিন্তু এইটা আমি জানি। আর আমার অস্তিত্ব যে তোমার উপর বোঝা হয়ে দাঁডিয়েছে, সেটা আমি মেনে নিতে পারছি না।’
‘কী যা তা বলছ! বললাম না, আমার স্পার্ম কাউন্ট কম। আর তুমি আমার বোঝা নও। তুমি আমার সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা।’
‘রবি, আমি তোমাকে জলের মতো পড়তে পারি। তুমি সব সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো। ওইদিন যখন তুমি ফার্টিলিটি টেস্ট-এর রেজাল্ট বলছিলে, তুমি আমার চোখের দিকে তাকাওনি, আর তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, যে সমস্যাটা আমার। সত্যিটা স্বীকার করো, রবি। আমাদের জীবন আর আগের মতো সহজ নয়। আমি চাই না, তোমার জীবনে আমার অপূর্ণতার ছায়া হয়ে থাকুক। তুমি সব কিছু আবার শুরু করো। আমি কালই বাবার বাসায় চলে যাচ্ছি’
রবি আর কথা বলেনি। মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল যেন সুষমা তার চোখের পানি দেখতে না পায়।
কিছুদিন পর, এক সন্ধ্যায়, ডাকপিয়ন একটা খাম দিয়ে যায়; সুষমা বাবার বাসা থেকে পাঠিয়েছে তালাকনামায় স্বাক্ষর করা কাগজ। সাদা খামে, ভেতরে এক লাইনের একটা চিঠি, লেখা শুধু একটি লাইন—’ভালো থেকো, রবি।’ রবি চুপচাপ খামটা রাখে টেবিলের ওপর। তার প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণা পাচ্ছিল, এক গ্লাস পানির জন্য, সাদা পিরিচে উপর রাখা এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানির জন্য।
তারপর, গত এতটা বছর রবি কখনোই সুষমার সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেনি। সুষমা কার থেকে যেন শুনেছিল, রবি আবার বিয়ে করেছে, একটা মেয়েও আছে তার। এর বেশি কিছু সে জানত না বা জানতে চেষ্টাও করেনি । তাহলে এতদিন পর রবির তার কাছে আসার কারণ কী! সুষমার বুকের মধ্যে কেমন যেন এক অচেনা শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। ঘরটা হঠাৎ খুব ভারী মনে হলো তার কাছে। খানিকক্ষণ নীরবতা বজায় রেখে ধীরে বলল, ‘কী রকম সাহায্য দরকার তোমার?’

রবিউল সোফায় বসে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। অস্বস্তি দুর করার জন্য সুষমা বলল, ‘আমি বরং তোমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসি।’
রান্নাঘর থেকে চা এনে রবির সামনে রাখল সুষমা; রবি তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না; সুষমা বসল তার সামনের চেয়ারে, ঘরে নিস্তব্ধতা।
অনেকক্ষণ পর, এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে রবি বলল,
‘আমার একটা মেয়ে আছে, ‘ঝুনঝুন’, ভাল নাম ‘নিশাত রুবি’। ওর হার্টের অসুখ ধরা পড়েছে; অপারেশন করাতে হবে খুব দ্রুত।’
সুষমার ভ্রূ কুঁচকে গেল, একটু বক্র কষ্টের হাসি দিয়ে বলল,
‘মেয়ে? রবি তুমি মেয়ের বাবা হয়েছ, আমি জানিও না!’
রবি চুপ করে আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল,
‘হ্যাঁ, তবে আমি ঝুনঝুনের জন্মদাতা নই। ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর আগের ঘরের সন্তান। কিন্তু আমি ওকে নিজের মেয়ে বলেই ভাবি সবসময়। জন্ম না দিলে কী হবে, আমি তো ওকে মানুষ করেছি।’
এবার সুষমার গলা শুকিয়ে এলো, ‘আর তোমার স্ত্রী?’
রবিউল সুষমার দিকে তাকিয়ে, নিচু স্বরে বলল,
‘ও চলে গেছে। বছর-খানেক হলো। কানাডায়, টাকার জন্য, ‘বেটার লাইফ’-এর জন্য। বলেছিল, আমি আর ঝুনঝুন, দুজনেই নাকি তার জন্য বোঝা। চলে যাওয়ার আগে ঝুনঝুনকে রেখে গেছে; তারপর একবারও খোঁজ নেয়নি।’
ঘরে কিছুক্ষণ জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বাজছে ঠিকই, অথচ সময় যেন স্থির হয়ে আছে।
রবি আবার বলল, ‘ওর চিকিৎসা করাতে গেলে কয়েক লাখ টাকা লাগবে। তোমার সাথে দেহভিন্ন হওয়ার পর আর কেরিয়ারে মন দিতে পারিনি। চাকরিবাকরি আর তেমনটা করা হয়নি আমার। বাবার রেখে যাওয়া ফ্ল্যাট দুটো থেকে বাসা-ভাড়া যা পাই, তাতে একসাথে এমন খরচ আর টানতে পারছি না।’
সুষমা চমকে উঠল। ডিভোর্স শব্দের বাংলা কি ‘দেহভিন্ন’ হয়! এটা সে আগে কখনো শুনেনি। তার মানে কি তাদের শুধু দেহ আলাদা হয়েছে; রবি কি এখনো ভাবে তাদের দুজনের মন এক সাথে আছে! আসলে কি তাই!
‘ভেবেছিলাম কারো কাছে হাত পাতব না, কিন্তু ঝুনঝুনকে বাঁচাতে না পারলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। আমার এই মাথা-খারাপ অবস্থায় তুমি ছাড়া আর কারো কথাই মনে করতে পারছিলাম না’, রবি বলল।
এই কথা শুনে সুষমা একটু ইতস্তত করে বলল,
‘রবি, আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, তুমি যদি কিছু মনে না করো। ঝুনঝুনের আসল বাবা কে? তার সাথে যোগাযোগ করনি কেন?’
রবি একবার চোখ তুলে তাকাল, তারপর আবার নিচু করে ফেলল। তার কণ্ঠটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেছে,
‘জানি না সু, আসলে ওর মা নিজেও ঠিক জানত না। ওর আগের জীবনে কয়েকটা জটিল সম্পর্ক ছিল, সে সময় ঝুনঝুনের জন্ম হয়, ও নিজেই আমাকে বলেছিল,‘আমি নিশ্চিত নই’। এরপর ধীরে ধীরে এই প্রশ্ন আর ওঠেনি। আমি তখন শুধু একটা শিশুকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিলাম, রক্তের হিসাব তখন আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।’
সুষমা তাকিয়ে ছিল রবির দিকে, নির্বাক, স্থির, আর একরকম হতভম্বের মতো। যেন তার ভিতরে কিছু একটা গলে যাচ্ছে। বাইরে থেকে তার মুখ শক্ত, কিন্তু ভিতরে চলছিল এক অদ্ভুত টানাপোড়েন।
রবি খালি দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর চোখ নামিয়ে বলল,
‘তুমি জানো, ও আমাকে বাবা বলে ডাকে না কখনো। শুধু বলে, ‘রবি’। তবু আমি ওর স্কুলের নোটবুকের পেছনে আমার নাম লিখি, ‘নিশাত রুবি, পিতা: রবিউল ইসলাম চৌধুরি’। ভাবি যদি কোনোদিন এটা দেখে সত্যিই ও আমাকে বাবা বলে ডাকে; এই নামটা যেন মুছে দিতে না হয়।’
সুষমা রবির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, যে মানুষটা তার সামনে বসে আছে, সে আর আগের সেই রবি নয়। এই রবি অনেক ধাক্কা খেয়েছে, অনেক কিছু শিখেছে, হারিয়েছে, তবু হারায়নি তার জেদ আর ভালোবাসা। তাকে একটু বাজিয়ে দেখার ইচ্ছা হলো সুষমার। গভীর দৃষ্টিতে রবির দিকে তাকিয়ে ধীরে কিন্তু নির্ভুলভাবে প্রশ্ন করল,
‘ঝুনঝুন তো তোমার মেয়ে নয়, রবি। তবে ওর জন্য কতটুকু করবে?’
রবি মাথা তুলে চাইল। তার চোখে যেন জ্বলে উঠল ক্লান্তিতে চেপে রাখা অভিমান। কণ্ঠে রাগ, কষ্ট আর ক্ষোভ মিলেমিশে এক তীব্র বিস্ফোরণ হলো।
‘না, সু! কী বলছ তুমি! ঝুনঝুন আমার মেয়ে! শুধু জন্ম দিলেই কেউ বাবা হয় না! বাবা হতে হয় প্রতিদিন, ওর পাশে থেকে, ওর ভয়ের সময় বুক দিয়ে আগলে রেখে, ওর কান্নার সময় জড়িয়ে ধরে, ওর আনন্দে চোখে সুখের অশ্রু ঝরিয়ে। বাবা হওয়া অর্জন করে নিতে হয়, দায় নিয়ে, ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়ে। আমি সেটা করেছি, আমিই ওর বাবা।’
ঘরের ভেতর আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা। শুধু রবি আর সুষমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল সেই অদৃশ্য সত্য, যে কেউ এক শিশুর জন্ম দিতে পারে, কিন্তু তাকে হৃদয়ে ধারণ করে দায়িত্ব নিতে পারে শুধু একজন প্রকৃত মানুষ। সুষমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, শুধু চেয়ে রইল সামনের মানুষটার দিকে, যাকে একদিন তার ছেড়ে যেতে হয়েছিল। জীবন যে তাকে এই রকম ত্রিমুখী রাস্তার মোড়ে ছেড়ে পরীক্ষা নেবে এটা তার ধারণাতীত ছিল। কী করবে সে; অনেক চেষ্টা করেও তার সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলো স্পর্শ করতে পারছে না সুষমা।
সুষমা চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তার চোখ দুটি যেন এক জায়গায় স্থির, কিন্তু মনের ভিতরে এক অজানা অস্থিরতা। নিজের মনের ছড়িয়ে থাকা ভাবনাগুলো একত্র করে সে শান্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। রবিকে বলল,‘দাঁড়াও আমি আসছি।’
বেডরুমে গিয়ে সে তার ওয়ার্ডরোব খুলল। তার জীবনের হরেক জিনিস রাখা এই ওয়ার্ডরোবের ভিতর; ছোটখাটো খুঁটিনাটি অনেক কিছু। এই প্রত্যেকটা জিনিসের সাথেই তার জীবনের কোনো না কোনো সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার গল্প জড়ানো। জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুক চিরে দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসলো, যেন তার মন কিছু না খুঁজে শুধু সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো অনুভব করতে চাইছে।
ওয়ার্ডরোবে কোন থেকে ছোট্ট একটা বাক্স হাতে নিলো সুষমা, আর একদম নিচের তাকে রাখা একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ থেকে সে তার ব্যাংকের চেক-বইটা বের করল। মনে পড়ল, একসময় তারা দুজনেই মাসের শুরুতে একসাথে বসে বাজেট করত, কে কোন খরচ দেবে, কে সঞ্চয়ের কত ভাগ রাখবে আরও কত কী! সেই দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো। সুষমা ধীর পায়ে এসে টেবিলের পাশের চেয়ারটাতে বসল। একটু ভেবে নিয়ে একটা বেশ বড়-অঙ্কের চেক লিখল সে। হাতটা সামান্য কাঁপছে, কিন্তু লেখাটা স্পষ্ট, প্রাপকের জায়গায় লিখল, ‘রবিউল ইসলামচৌধুরি।’
চেকটা হাতে নিয়ে রবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সুষমা; চোখ ভরা অভিমান আর না-বলা অনেক কথার ভার।
‘এই চেকটা রাখো। অপারেশনের খরচের জন্য হয়ত কম, কিন্তু এটা দিয়ে শুরু করো। এটাতে যদি তোমার যুদ্ধটা একটু সহজ হয়।’
রবি চেকটা হাতে নিয়ে দেখল, মৃদু হেসে বলল, ‘আমার নামের বানানটা এখনো মনে আছে তোমার! প্রথম প্রথম চৌধুরি লিখতে দীর্ঘ ই-কার দিতে তুমি।’ তারপর হঠাৎ করেই রবি বলল, ‘আচ্ছা সু, তুমি কি ভাবো, আমি বোকা, বুদ্ধি-সুদ্ধি কম? লোকজন আমাকে ঠকায়, সুবিধা নেয়?’
সুষমা মাথা নেড়ে গভীর স্বরে বলল, ‘না রবি, আমি সেটা মনে করি না, আসলে তুমিই প্রকৃত মানুষ, সত্যিকার মানুষ বলতে যা বোঝায়।আজকের পৃথিবীতে সেইটা হওয়া খুবই দুরূহ কাজ।’
‘থ্যাংক ইউ, সু। কিন্তু এতগুলো টাকার চেক দিলে, তোমার অসুবিধা হবে না?’
‘রবি, তোমার মনে আছে, আমরা যখন একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম, তখন তুমি আমাকে একটা চেক পাঠিয়েছিলে, কাবিনের টাকার; অনেকগুলো টাকা একসাথে। আমি জীবনে অনেকবার ভেবেছি, তুমি এত টাকা ওই সময় কীভাবে ম্যানেজ করেছিলে! তোমার সেই টাকা আমি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর আর কখনো খরচ করা হয়নি; আসলে ওই টাকাটা আমার খরচ করার দরকার হয়নি কখনো। আজ প্রথম ওই টাকায় হাত দিলাম।’
‘কী বলছ সু’ – ঘরে বজ্রপাত হলেও বোধহয় রবি এত অবাক হতো না! সে হতভম্ব হয়ে বসে রইল। কিন্তু তার অবাক হওয়ার আরো কিছুটা তখনও বাকি।
ওয়ার্ডরোব থেকে যে ছোট বাক্সটি এনেছিল সুষমা, সেটা রবির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ধরো, এটা রাখো তোমার কাছে।’
‘এটা কী’ – রবি জিজ্ঞাসা করল?
‘খুলে দেখো।’
রবি বাক্সটি খুলে দেখল, ভিতরে একটা সোনার চেইন এবং লকেট। রবি আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘এটা কেন, টাকার চেকটা তো দিয়েছ?’
‘এটা কী জানো রবি?’
রবি বোকার মতো সুষমার দিকে তাকাল।
‘এটা আমার ছোটবেলার লকেট’- সুষমা বলল, ‘আমার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন আমার মা ‘পোদ্দার জুয়েলার্স’ থেকে অর্ডার করে এটা বানিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর এতটা বছর জিনিসটি আমার কাছে আছে। আজ মা নেই, কিন্তু এটাতে আছে তার স্মৃতি, তার স্পর্শ।’
‘এটা আমাকে দিচ্ছ কেন? না না, এটা আমি নিতে পারব না, এটা তুমি রেখে দাও সু।’
‘এটা তোমাকে দেওয়ার একটা কারণ আছে রবি’ – সুষমার গলা কাঁপছে, বৃষ্টি-ভেজা চড়ুই পাখির মতো।
রবির জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সুষমার দিকে।
‘রবি আজ যখন তুমি বাসায় ফিরে যাবে, তুমি আমার জন্য একটা কাজ করবে’- সুষমা বলল, ‘তুমি ঝুনঝুনকে এই লকেটটা পরিয়ে দিবে; আর বলবে এটা তাকে তার মা দিয়েছে। কি? পারবে না?’
রবির সারা শরীর যেন তড়িৎ স্পর্শে শক্তিহীন অসাড় হয়ে গেল। সে বোকা শিশুর মতো সুষমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কোনো রকমে একটা ঢোক গিলে রবি বলল, ‘পারব সু, অবশ্যই পারব।’
‘রবি, আমি জানি তুমি জেদি মানুষ, কিছুতে হার মানতে চাও না। এই যুদ্ধটাতে তুমি হারবে না। আমার মন বলছে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, ঝুনঝুন সেরে উঠবে।’
রবি অনেকক্ষণ মাথানিচু করে বসে থেকে তারপর উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে থামল একটু। ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো সুষমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি ভালো থেকো সু।’
সুষমা হালকা হেসে বলল, ‘তুমি কতদিন আমার খবর রাখনি রবি, আজ থেকে কি রাখবে?’
রবি বিড়বিড় করে কী যেন বলল, সুষমা ঠিক বুঝতে পারল না। তবে তার চোখের ভাষাই সব বলে দিচ্ছে, বুঝতে সুষমার কোনো কষ্ট হলো না। রবি মাথানিচু করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
সুষমা দরজাটা কিছুক্ষণ খোলা রেখেই দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে রবির গন্ধ মিশে আছে যেন পুরোনো দিনের সেই সুগন্ধ, যার সাথে একসময় জড়িয়ে থাকত তার প্রতিটি সকাল-সন্ধ্যা, প্রতিটি ক্ষণ।
অবশেষে দরজাটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল সে। তার চোখ গেল সোফার টেবিলের দিকে। হঠাৎ তার বুকে বড় একটা ধাক্কা লাগল; সে দেখল, খালি পানির গ্লাসটা সাদা পিরিচ দিয়ে ঢেকে রাখা।
এই দৃশ্যটা তার পুরোনো দিনের অতি প্রিয় স্মৃতি। তাদের বিবাহিত জীবনে রবি এমনটাই করত। যদি সুষমা জিজ্ঞাসা করত, ‘খালি গ্লাসটাশুধু শুধু পিরিচ দিয়ে ঢাকার দরকারটা কী?’
রবি হাসতে হাসতে বলত, ‘তোমার ভালোবাসার পিরিচের উপর রাখা তৃষ্ণার জল পান করলাম, আর খালি গ্লাস সাদা পিরিচ দিয়ে ঢাকলাম মানে, উল্টানো পিরিচটা হচ্ছে তোমার জন্য আমার ভালোবাসা।’
সেই কথা মনে পড়তেই সুষমার চোখে জল চলে এল। এত বছর পর রবির সেই একই অভ্যাস দেখে তার বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। মনে হলো যেন সেই সময়টা আবার ফিরে এসেছে, আবারও রবির ভালোবাসা যেন তাকে স্পর্শ করছে।
সে দৌড়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে সকালের সূর্যের আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, গাছগাছালি। সূর্যের নরম আলোয় গা ভিজিয়ে রবি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। তার পা ভারী, চলার গতি মন্থর। মনে হচ্ছে যেন সে অনেক দূর কোনো গন্তব্যের দিকে যাত্রা করেছে। মনে হচ্ছে, রবির পাশেই যেন হেঁটে যাচ্ছে তাদের অতীত এক ছায়া-সঙ্গীরমতো। সুষমার মনের চাপা ক্ষোভ যেন ফুলে-ফেঁপে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সে মনে মনে বলল, ‘কার কী এমন ক্ষতি হতো, যদি বিধাতা এই মানুষটিকে আমার কাছ থেকে কেড়ে না নিতেন! কী এত মহাভারত অশুদ্ধ হতো! বেশি কিছু তো আমি চাইনি জীবনের কাছে।’
তাকিয়ে থাকল সে রাস্তার দিকে, যতক্ষণ পর্যন্ত রবিকে দেখা যায়। তারপর জানালাটা বন্ধ করল সে, যেন সে তার বুকের দরজা বন্ধ করছে। ফিসফিস করে বলল, ‘ভালো থেকো রবি, অনেক ভালো থেকো। ঝুনঝুনআমাদের মেয়ে, ও ভালো হয়ে যাবে। বিধাতা তোমাকে আমার কাছ থেকে সরিয়েছেন, ঝুনঝুনকে উনি নিশ্চয়ই ভালো করে দিবেন। তিনি তো নিষ্ঠুর নন; বিনা পাপে আমাকে তিনি দুবার শাস্তি দিবেন না।’
কলিং-বেলের শব্দে চমক ভাঙ্গল সুষমার, খেয়াল করে দেখল অনেক বেলা হয়ে গেছে, কাজের বুয়াটা এসেছে বোধ হয়।
(সমাপ্ত)

শেয়ার করুন

One response to “জনপ্রিয় লেখক মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার এর গল্প “সাদা পিরিচ”।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো খবর দেখুন...
©দৈনিক দক্ষিণবঙ্গনিউজ২৫.কম এর সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০২৩-২০২৫
❤️Design With Tamim Zarif