জাপান থেকে শিক্ষা গ্রহণ জরুরি🌿
অন্যান্য উন্নত দেশের খবর জানি না, জাপানের ক্ষেত্রে যতখানি জানি সেটা জোর গলায় বলতে পারি যে, এই দেশে ইচ্ছে করলেই খারাপ হওয়া, বখে যাওয়া সম্ভব নয়। এটা হতে গেলে কেউ বাধা দেবে এমনও নয়। তাই বলে যে খারাপ হয় না মানুষ তা নয়। খারাপ, বখে যাওয়া বিস্তর আছে কিন্তু চোখে দেখা যায় না।
জাপানে ছেলেমেয়েরা অবাধে বেড়ে ওঠে। খারাপ হওয়ার সমূহ সুযোগ ও আয়োজনও রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই দেখা যায় খারাপ হওয়ার লক্ষণটা বেশি। ফলে পিতামাতা গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তারা ভালো করে লক্ষ্য করেন কী কারণে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করতে চায় না? ঘরের বাইরে তারা কী করে থাকে? যদি দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কোনো কারণে তাহলে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেন। চিকিৎসা করান। আর যদি দেখেন শিক্ষালাভে অনিচ্ছা প্রবল সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন সমাজে ছেড়ে দিতে, যাও, কিছু একটা করে খাও। কেউ কেউ অল্পবয়সেই ঘর ছেড়ে আলাদা বসবাস শুরু করে। যেহেতু নিরাপত্তা আছে অর্থনৈতিকভাবে তাই কাজ পেতে অসুবিধা হয় না। অনেক বিপথগামী ছেলেমেয়ে কিশোর গ্যাং এবং ইয়াকুজাদের খপ্পরে পড়ে দুর্দান্ত মাফিয়া হয়ে যায়। বিশেষ করে এই প্রবণতা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছিল ষাট-সত্তর-আশির দশকে। রমরমা হয়ে উঠেছিল পাচিনকো জুয়াখেলা, ড্রাগস নেয়া এবং পর্নো ও নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়া।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি এসে সরকার বিশেষ করে রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদদের প্রবল প্রচেষ্টায় তারুণ্যের বাজে প্রবণতা, কিশোর গ্যাং এবং মাফিয়াদের একচ্ছত্র আধিপত্যকে লাগাম টেনে ধরা হয় কঠোর হাতে। তারই ফলাফল আজকের উজ্জ্বলতর জাপান।
তারুণ্যে বখে যাওয়া, বেপরোয়া হওয়া, মাফিয়াচক্রের প্রভাবে কিশোর গ্যাংয়ে হাতেখড়ি, অবাধ যৌনাচার ও নিষিদ্ধ ব্যবসার প্রসার হচ্ছে মার্কিনী সংস্কৃতিপ্রথা, এটা আমার কথা নয়, বিশিষ্ট জাপানিদের অভিমত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কাছে হেরে যাওয়ার পর মার্কিনী সস্তা ও অনৈতিক যত তৎপরতা আছে সবই গ্রাস করেছিল ন্যায়নীতিনিষ্ঠ দেশ জাপানকে।
আমি জাপানে আসি আশির দশকের প্রথমভাগে। তখন এইসব উপলক্ষের নিদারুণ অভিজ্ঞতা লাভ করি। নব্বই দশকের শেষভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রচুর বেকার তরুণ জাপানে অবৈধভাবে অবস্থান করেছিল। তাদের একটি অংশ অনায়াসে বাজে পথে গিয়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জুয়াখেলা, নিরীহ প্রবাসীদের ওপর নানান অত্যাচার, নিপীড়ন করা জাপানের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল। তাদেরকে মূলত প্রশ্রয় দিত কিছু রাজনীতিক ও মাফিয়া। আমার সম্পাদিত “মানচিত্র” কাগজে সেসব অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করি ছবিসহকারে। ফলে জাপানি পুলিশ আমাকে ডেকে নিয়ে পরামর্শ চায় কীভাবে এদেরকে দমন করা যায়?
আমি বলেছি, জাপান আমার দেশ নয়। কাজেই এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না। তবে যেটা করতে পার সেটা হলো, তাদের অর্থের উৎস বন্ধ করে দেয়া। কোথা থাকে এরা অর্থ পাচ্ছে যেকারণে কাজকর্ম না করে অপরাধমূলক কাজ করছে অবাধে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে জানতে পারে একটি গ্যাং সক্রিয়, যাদের সঙ্গে চিনা, ফিলিপিন্স, মার্কিনী, ইতালীয় এবং জাপানি ইয়াকুজা তথা মাফিয়া, মাফিয়ার চ্যালা চিনপিরা ও রাজনীতিকদের গভীর সংযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের মধ্যে প্রধান কয়েকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। চিনা ও ফিলিপিনিদেরও ধরা যায়, যারা জাপানে চিকা গিনকোও বা হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করত।
এরশাদের আমল, বিএনপি ও আওয়ামী আমলের বেশকিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী জাপানে পালিয়ে এসেছিল। কিন্তু টিকতে পারেনি। বর্তমানে এসব আর জাপানে নেই। কিছু যারা ছিল সোজা হয়ে গেছে। কাজ করো, ব্যবসা করো, বিয়ে করো, বাড়ি কিনো কোনো সমস্যা নেই, মাগার নো অপরাধ!
এখন ভাবি যে, আমিও তো খারাপ হয়ে যেতে পারতাম! সমূহ সুযোগ ছিল। কিন্তু জাপানে আসার সময় বাবা অশ্রুসিক্ত চোখে একটি কথাই বলেছিল: “বিদেশে যাচ্ছ সে তোমার ব্যক্তিস্বাধীনতা। আমাদেরকে ভুলে গেলেও দেশকে ভুলে যেওনা! দেশ তোমার শেষ আশ্রয়।” আর এটাই হচ্ছে জাপানিদেরও মূলমন্ত্র। দেশের বাইরে তারা অন্যকিছু চিন্তাই করতে পারেন না। যুবা থেকে যখন তারা সামাজিক জীব হয় এবং কর্মে প্রবেশ করে দেশাত্মবোধকে নতুন করে অনুধাবন করতে শেখে। এই দেশাত্ববোধটাকে মূলত জাগিয়ে তোলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদরা, পরিবারও নয়, শিক্ষকও নয়। সমস্ত অপরাধ, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বৈষম্য, বিদ্বেষ, চৌর্যবৃত্তি, ধ্বংস, যুদ্ধের হোতা হচ্ছে চরিত্রহীন অসৎ রাজনীতিকরা। এদের মূল শক্তিই হচ্ছে টাকা।
বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে যত অপকাণ্ড, অপকর্ম এবং পরিবর্তন ঘটেছে তার মূলে রয়েছে অগণন অসৎ রাজনীতিক। জাপান কীভাবে রাজনৈতিক সংস্কার সাধন করল তা থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া বর্তমান অন্তরর্তী সরকারেরও গতি নেই তা সহজেই অনুমেয়। দুর্বল ও অতিউৎসাহী কতিপয় উপদেষ্টাকে বাদ দেয়া শ্রেয় বলে মনে করি। কারণ তাদের দুর্বল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা তরুণসমাজকে বিপথগামী করে তুলতে পারে। 🤡
Leave a Reply