জরিনার বিশটি ছেলে
মোঃ সাইফুদ্দিন গিয়াস
দারিদ্র্য যেন জন্ম থেকেই জরিনা বেগমের জীবনের সঙ্গী। চার সন্তানের মধ্যে বড় হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সংসারের অভাব-অনটনের ভার যেন তার কাঁধেই এসে পড়ে। অনেক দিন এমন কেটেছে, যখন দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও জোটেনি তাদের পরিবারে।
মাত্র ছয় বছর বয়সে বাধ্য হয়ে তাকে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় কাজ করতে পাঠান মা-বাবা। পুলিশের স্ত্রী জরিনাকে ভালোবাসতেন, তাকে আদরও করতেন। কিন্তু সেই আদর কখনো শিক্ষার আলো হয়ে তার জীবনে আসেনি। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সে কাজ করেছে—কোনো বেতন ছাড়াই।
কাজ করতে করতে শিশু জরিনা এক সময় যুবতী হলো। সেই পুলিশ কর্মকর্তা তার দীর্ঘদিনের পরিচিত এক মুদি দোকানদার শফিকের সঙ্গে জরিনার বিয়ে দেন। শফিক ছিলেন সহজ-সরল, পরিশ্রমী মানুষ। স্বামীর সংসারে এসে জরিনা প্রথমবারের মতো শান্তি ও নিরাপত্তার স্বাদ পেল। দু’বছর পর তাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তারা ছেলের নাম রাখলেন মোঃ রাফিন আহম্মদ।
সুখের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হলো না জরিনার। একদিন জানা গেল, শফিক ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য বিক্রি হয়ে গেল মুদি দোকান, বাবার বাড়ির সম্পত্তি—যা ছিল সব। জরিনা দিন-রাত স্বামীর সেবায় নিজেকে নিঃশেষ করে দিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শফিক চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
স্বামী হারানোর আগেই জরিনা হারিয়েছিলেন বাবা-মাকেও। আশ্রয়ের শেষ ঠিকানাটুকুও হারিয়ে গেল শ্বশুরবাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ছোট্ট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে তিনি চলে এলেন ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে।
সেখানেই শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। রেলস্টেশনে পানি বিক্রি করে কোনো মতে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে লাগলেন তিনি। নিজের জন্য নতুন জীবন গড়ার অনেক সুযোগ এসেছিল। মধ্যবয়সী জরিনাকে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলে রাফিনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেননি।
নিজে কখনো শিক্ষার সুযোগ পাননি, কিন্তু ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি। না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে, অবিরাম কষ্ট করে তিনি ছেলেকে পড়িয়েছেন। একসময় রাফিন সরকারি চাকরি পেল। মা ভাবলেন, এত দিনের ত্যাগ-তিতিক্ষার অবসান বুঝি এবার হলো।
রাফিন বিয়ে করল এক পুলিশ কর্মকর্তার মেয়েকে। প্রথমদিকে জরিনা ছেলের সংসারে থাকতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ছেলের স্ত্রী ছেলেকে বোঝাতে লাগলেন, “অশিক্ষিত শাশুড়ি ঘরে থাকলে আমাদের মান-সম্মান নষ্ট হবে।”
নানা অযুহাতে ছেলের বউ জরিনাকে ছোটলোক বলে গালমন্দ করতেন। সবচেয়ে বড় আঘাতটি ছিল ছেলের নীরবতা । রাফিন সব দেখেও যেন না দেখার ভান করত। মায়ের পক্ষে একটি কথাও বলত না। একদিন সকালবেলা একবুক অভিমান নিয়ে জরিনা ঘর থেকে বের হলো।
জরিনা বেগমের চোখের জল তখন শুকিয়ে গেছে। বুকের গভীরে যে কষ্ট জমেছিল, তা আর কান্না হয়ে বেরোয় না। আবার শুরু হলো তার সংগ্রাম।
মিরপুর শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের সামনে ফুটপাতে বসে তিনি ভাত ও পরোটা বিক্রি শুরু করলেন। রিকশাচালক, ভ্যানচালকসহ বিশ-পঁচিশজন শ্রমজীবী মানুষ নিয়মিত তার কাছে খেতে আসত। জরিনা তাদের পরম যত্নে সকাল, বিকেল ও রাতে তিনবেলা খাওয়াতেন।
ধীরে ধীরে সেই মানুষগুলো জরিনাকে “জরিনা খালা” বলে ডাকতে শুরু করল। কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিত, কেউ খাবার বিক্রি কম হলে বাড়তি সাহায্য করত। তারা বুঝেছিল, এই নারী শুধু খাবার বিক্রি করেন না—তিনি মমতা বিলিয়ে দেন, মাতৃত্বের উষ্ণতা বিলিয়ে দেন।
একদিন সন্ধ্যায় এক রিকশাচালক বলেছিল, “খালা, আপনি তো আমাদের সবার মা।”
কথাটা শুনে জরিনা একটু থেমেছিলেন। তারপর মৃদু হাসলেন। বহুদিন পর সেই হাসির ভেতর একফোঁটা জল চিকচিক করছিল।
আজ তার এক ছেলে রাফিন নেই—আছে বিশটি ছেলে। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর—এই মানুষগুলোই তার নতুন পরিবার। তারা জরিনা বেগমকে শুধু “খালা” বলে না, হৃদয়ের গভীর থেকে “মা” বলে ডাকে।
সেই ডাকেই জরিনা বেগম আজ বেঁচে আছেন। নিজের সন্তান তাকে ভুলে গেলেও, জীবনের কঠিন পথে পাওয়া এই বিশটি সন্তান তাকে মায়ের আসনেই বসিয়েছে।
Leave a Reply