এলাহী-৮: এক ছাপড়া মেসের গল্প
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। শুরুতে শাহ পরান হলে থাকতাম, পরে উঠি দ্বিতীয় ছাত্র হলে। টিউশনি করে রাত করে ফিরতাম, আর হলে ফিরলে দেখতাম—খাবার শেষ। ক্ষুধা আর ক্লান্তির মাঝে একদিন মনে হলো, এটাই তো জীবন। সময়ের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে চললে, ক্ষুধাও উপেক্ষা করে যেতে হয়।
সেই সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে পড়ে এলাহী-৮ এর কথা। সুরমা আবাসিক এলাকার একচালা টিনসেড মেস, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের বাম পাশে, শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রের খুব কাছেই। সেখানে থাকতেন আমাদের এলাকার বড় ভাই, পরিসংখ্যান বিভাগের সম্পদ সরকার—গণিতে পটু, স্কুলে ফার্স্ট, তাঁর সুনাম ছড়িয়ে ছিল আমাদের হাইস্কুলের প্রতিটি দেয়ালে। আমাদের কলেজও ছিল এক। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় আরও গভীর হয়। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম এলাহী-৮ এ। মেসের পরিবেশ ছিল প্রাণবন্ত, সদস্যরা আন্তরিক ও হাস্যোজ্জ্বল।
আমি সম্পদ দা’কে বলতাম, “দাদা, সিট খালি হলে জানাবেন।” তিনি হাসতেন, বলতেন, “এখানে সিট খালি হয় না, ভাই। কেউ একবার উঠলে আর যেতে চায় না।” একদিন সেই সুযোগ এল। সম্পদ দা’র রুমমেট মাস্টার্স শেষ করে চলে গেলেন। খবর পেয়ে ছুটে গেলাম। সেই দিনটি ছিল আমার জীবনের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। এলাহী-৮ এ আমি শুধু একটি রুম পেলাম না, পেলাম এক নতুন জীবন।
প্রথম দিনটিই ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। টিনসেড ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রুমগুলো যেন একেকটি গল্পের ঘর। রুমে উঠেই বুঝলাম—এখানে ঘুমানোর জায়গা আছে, কিন্তু ঘুমানোর সময় নেই। রাতের খাবার শেষে শুরু হতো গল্পের আসর। কেউ বলত ক্লাসের মজার ঘটনা, কেউ শোনাত টিউশনির অভিজ্ঞতা, কেউ আবার হঠাৎ করে জীবনদর্শনের গভীরে ডুবে যেত। আমাদের রুম ছিল যেন এক চিন্তার ল্যাবরেটরি—যেখানে হাসি, বিতর্ক, স্বপ্ন সবকিছু একসাথে মিশে যেত।
পরে আমাদের রুমে যোগ দেয় সজিব, আমার সাবজেক্টমেট বন্ধু। আমি-ই তাকে এই মেসে নিয়ে আসি। আমরা তিনজন এক রুমে থাকতাম। পাশের রুমগুলোতে ছিল খায়ের, স্মরণ, মানিক, রবি, রনি ভাই, রহমত ভাই, রানা ভাই, সাইদ ভাই, সৈকত ভাই—সবাই যেন একেকটি চরিত্র।
মানিক ছিলেন গণিত বিভাগের, শান্ত স্বভাবের, স্পষ্টবাদী, গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা এক বন্ধু। পরে আমি তাঁর রুমে উঠে যাই, বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। রনি ভাই ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ছিল সংগীতের সুর। রহমত ভাই ছিলেন সমাজকর্মের, তাঁর কথায় ছিল জীবনবোধের ছোঁয়া। খায়ের ছিলেন প্রকৃত প্রোগ্রামার, ধ্যান-জ্ঞানে ডুবে থাকা এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী। রসায়নের স্মরণ ছিলেন সৌখিন ও নিপাট ভদ্রলোক, রবি গণিতে অনার্স শেষ করে নৌবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হন। রানা ভাই তখনই বিজনেসমেগনেট, সাইদ ভাই ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, সৈকত ভাই একাই এক রুমে থাকতেন—পরিপাটি, গিটার বাজাতে পারতেন। বছর বিশেক হতে চলল, অনেকের নামই হয়তো ভুলে গেছি, দুঃখিত! কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে।
পরীক্ষা শেষ হলে সন্ধ্যায় বসত তাসের আসর। আমি তাস খেলায় অনাগ্রহী, তাই আমার জন্য চালু হয় “ফোটা” নামক সহজ খেলা। খেলাটা ছিল নিছক হাসির উপলক্ষ—কেউ জিতলে হাসি, কেউ হারলে আরও বেশি হাসি। হার-জিতের চেয়ে বেশি ছিল সম্পর্কের জয়। শুক্র ও শনিবার রাতের খাবারের পর শুরু হতো নাটক দেখা। হুমায়ুন আহমেদের নাটক, ইংরেজি মুভি—সবাই একসাথে বসে দেখতাম। কেউ হাসত, কেউ ভাবত, কেউ চোখ মুছত। সেই মুহূর্তগুলো ছিল জীবনের ছোট ছোট উৎসব।
মেসের মাঝখানের ছোট্ট জায়গাটি ছিল আমাদের আনন্দের কেন্দ্র। জায়গাটা বড় ছিল না, কিন্তু আনন্দের পরিধি ছিল অসীম। শুক্র ও শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় দিনব্যাপী খেলার আয়োজন চলতো। কেউ বল আনত, কেউ স্টাম্প বানাত, কেউ ব্যাটের জন্য দরাদরি করত। ছোট্ট জায়গায় ক্রিকেট খেলতাম, মাঝে মাঝে টেনিস বল দিয়ে ভলিবল। বল উড়ত, হাসি ছড়াত, চিৎকারে মুখর হতো এলাহী-৮। আমাদের খেলায় কোনো নিয়ম ছিল না, ছিল শুধু আনন্দ।
রাতে যদি বিদ্যুৎ চলে যেত, সেটাই হতো এক নতুন আয়োজন। কেউ গিটার বাজাত, কেউ গলা ছেড়ে গান ধরত, কেউ তালি দিত, কেউ ছন্দে ছন্দে কবিতা বলত। সেই অন্ধকারে আলো ছিল আমাদের কণ্ঠে, আমাদের প্রাণে। সম্পদ দা’র কণ্ঠে “পাগলা হাওয়ার তরে”, রনি ভাই, রহমত ভাইয়ের কণ্ঠে “চাঁদনী রাতে” কিংবা “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে”—আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। একসঙ্গে কোরাস গাইতাম “পূবালী বাতাসে”সহ কত যে গান!
এই আনন্দের মাঝে মাঝে ছেদ পড়ত এক চরিত্রের আগমনে—মালিক চাচা। ষাটোর্ধ্ব, পাকা দাড়িওয়ালা, সিলেটি ভাষায় কথা বলা এক ভদ্রলোক। শহরে থাকতেন, সম্ভবত সুবিদবাজারে। তাঁর ভাইয়েরা লন্ডন প্রবাসী, আর তিনি ছিলেন আমাদের মেসের মালিক। আমাদের খেলাধুলা, গান, চিল্লাপাল্লা তাঁর সহ্য হতো না। মাঝে মাঝে হুট করে চলে আসতেন। কেউ ফিসফিস করে বলত, “চাচা আসতেছেন!” আমরা দৌড়ে রুমে গিয়ে সুবোধ বালক সাজতাম। কেউ বই খুলে বসত, কেউ ঘুমের ভান করত। চাচা এসে সিলেটি ভাষায় বকাবকি করতেন, “এই মেসত খেলার ঘর অই গ্যাছে নি? দিন-রাইত চিল্লা-চিল্লি! মানুষ ঘুমাইত পারে না! আমি তো ত্যাক্ত অই গ্যাছি!” আমরা মাথা নিচু করে থাকতাম। তিনি চলে গেলে আবার শুরু হতো উৎসব। মাঝে মাঝে দেখা যেত, চাচা আসেননি—তবু আমরা অভিনয় করতাম। এই নাটকীয়তা ছিল জীবনের অংশ। চাচার রাগ, আমাদের ভান, আর সেই মুহূর্তের হাসি—সব মিলিয়ে এলাহী-৮ ছিল এক জীবন্ত নাট্যশালা।
এলাহী-৮ ছিল শুধু একটি মেস নয়, ছিল এক দর্শন—সহাবস্থান, বন্ধুত্ব, আনন্দ, এবং জীবনের সরলতা। সেই ছাপড়া ছাউনির নিচে আমরা শিখেছি কিভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কিভাবে ছোট ছোট মুহূর্ত জীবনের বড় স্মৃতি হয়ে যায়।
এই মেস থেকেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করি। সর্বশেষ, ২০২৩ সালে আমি সিলেটে গিয়েছিলাম। তখন এলাহী-৮ এর সন্ধান করি। দেখি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক বহুতল ভবন। হয়তো সেখানে এখন অফিস, অ্যাপার্টমেন্ট, কিংবা নতুন বাসিন্দারা। তারা জানে না, এই জায়গায় একসময় ছিল এক ছাপড়া মেস—যেখানে জীবন ছিল সরল, সম্পর্ক ছিল গভীর, আর প্রতিটি দিন ছিল এক উৎসব।
আমরা এখন ছড়িয়ে আছি পৃথিবীর নানা প্রান্তে—কেউ বিদেশে, কেউ শহরে, কেউ গ্রামে। কিন্তু এলাহী-৮ আমাদের সবার হৃদয়ে এক স্থায়ী ঠিকানা হয়ে আছে।
https://shorturl.fm/an51r
https://shorturl.fm/QypF6