সংরক্ষণের অভাবে পুরাকীর্তি ধ্বংসের
পথে চৌগ্রাম রাজবাড়ীর ইতিহাস ঐতিহ্য
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার – আবুল বাশার:
প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশ্বর্যে ভরপুর বরেন্দ্রভূমির এক অপরূপ নিদর্শন চৌগ্রাম রাজপ্রাসাদ। এটি নাটোর শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে নাটোর – বগুড়া মহাসড়ক সংলগ্ন একটি সুবিশাল গ্রাম। চৌগ্রাম বাসস্ট্যান্ড হতে পশ্চিমে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটলে রাজবাড়ী। চৌগ্রাম পরগনা ছিল নাটোর রাজ্যের শাসন কেন্দ্র। এটি এক সময় নবাব আলীবর্দী খানের সুবে বাংলার
পরগনা ছিল। নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামজীবন এ পরগনা ক্রয় করেছিলেন। রাম জীবনের একমাত্র পুত্র কালিকা প্রসাদ মারা গেলে তিনি দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তৎকালীন চৌগ্রাম ধনাঢ্য রসিক রায়ের ছিল দুই পুত্র। কনিষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্রকে দত্তক পুত্র হিসেবে নেন রাজা রামজীবন। বিনিময়ে রসিক রায়কে দান করেন চৌগ্রাম এবং রংপুরের ইসলামাবাদ পরগনা। তারপর রসিক রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণকান্ত চৌগ্রাম রাজ্যের প্রথম স্বাধীন রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এভাবেই চৌগ্রাম রাজ্যের উত্থান ঘটে।
এ সুবাদে ১৭২০ সালে চৌগ্রামে গড়ে ওঠে সুবিশাল রাজপ্রাসাদ। রাজা কৃষ্ণকান্তের অধীনে ১৭২০ থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যে জমিদারির ব্যাপক প্রসার লাভ করে। স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন এ জমিদার বরগুনার আয়তন ছিল ২৯ হাজার ৪৮৭ একর। স্টেট সংখ্যা ছিল ৬৫ টি। জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখে আছে বিরাট প্রবেশ পথ বা মূল ফটক।
তারপর সেই দ্বিতল ভবন সম্মিলিত রাজ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে ছিল, পার্শ্বে কাচারি বাড়ি, অতিথি শালা, রানী মহল,বহু দক্ষিণে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সূউচ্চ দুটি মঠ। এসব মঠে পূজা অর্চনা করা হতো। এখন রাজপ্রাসাদ প্রায় ধ্বংসের পথে। তবে বর্তমানে এখানে ইউনিয়ন ভূমি অফিস কওমি মাদ্রাসা এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় ফায়ার সার্ভিস ও গুচ্ছগ্রাম স্থাপিত হয়েছে। জমিদার বাড়ির দক্ষিনে বাজে সব দিকে বাদে সবদিকে বিশাল দিঘি রয়েছে। তৎকালীন সময়ে খননকৃত বেশ কয়েকটি দিঘী ও পুকুর রয়েছে। যা বর্তমানে সরাসরি খাস সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত। রাজবাড়ীর পূর্ব দিকে রয়েছে একটি বিশাল দীঘি, যার নাম অন্নপূর্ণা দিঘী
এর মাঝখানে একটি মাটির ঢিবি রয়েছে।
রাজপরিবারের সদস্যরা অবসরে নৌকায় চড়ে এখানে এসে সময় কাটাতো। যা বন্যার পানিতে ডুবে না। ঢিবিতে বর্তমানে একটি কুল গাছ রয়েছে। রাজবাড়ীতে রয়েছে একটি প্রসিদ্ধ মাজার শরীফ। রামজীবনের শাসনামলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য হযরত শাহ সুফি সুজা উদ্দিন ইয়েমেনি (র) সাহেবের শুভাগমন ঘটে চৌগ্রামে। এ সময় জমিদার খুব অসুস্থ হন। বহু চিকিৎসার পরেও তিনি সুস্থ না হওয়ায় ইয়েমেনী সাহেবের শরণাপন্ন হন। তার দোয়ায় জমিদারের রোগ মুক্তি হয়। এর প্রতিদান স্বরূপ রাজা ইয়েমেনি সাহেব কে জমিদারি কিছু অংশ দান করার প্রতিশ্রুতি দিলে তা প্রতাক্ষাত হয়। মৃত্যুর আগে হযরত শাহ সুফি সুজাব উদ্দিন ইয়েমেনী (রহ:) সাহেব চৌগ্রামে ফিরে আসেন।
এবং গ্রামে তার কবর স্থান নির্ধারণ করেন। সেই ধর্মযাজকের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে মৃত্যুর পর তাকে চৌ গ্রামে সমাধিত করেন। যা বর্তমানে বুড়া পীর সাহেবের মাজার নামে পরিচিত। রাজা রামজীবনের বদন্যতায় ৩০ শতক জায়গা হযরত শাহ সুফী সুজাব উদ্দিন ইয়েমেনী (রহ:) এর নামে লিখে দেন। হযরত শাহ সুফী সুজাব উদ্দিন ইয়েমেনী ( রহ:) এর মাজারের উপর সৌধ নির্মাণ করা হয়। সমাধি সংলগ্ন নির্মিত হয় ছোট্ট একটি রাধা কৃষ্ণ মন্দির। একই স্থানে মাজার এবং মন্দির ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা ও সাম্প্রদায়িক এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
প্রতিবছর চৈত্র মাসে চৌগ্রামের মাজার প্রাঙ্গনে বসে অত্যাধিক গানের আসর এবং মেলা। মোটকথা চৌগ্রাম রাজপ্রাসাদ ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যে ভরপুর। রাজা কৃষ্ণকান্তের ছেলে রুদ্রকান্ত একজন কবি ছিলেন। কৃষ্ণকানতে মৃত্যুর পর রাজ কুমার রুদ্রকান্ত ক্ষমতা গ্রহণ করেন। রুদ্রকান্তের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি ক্ষমতা উত্তরসূরী হিসেবে রোহিনীকান্তকে দত্তক নেন।। রোহিণী কান্ত বেশ প্রভাবশালী রাজা ছিলেন। তিনি নাটোরের জোয়ারী গ্রামের সৌদামিনীকে বিবাহ করেন। রোহিণী কান্তেরও কোন সন্তান ছিল না। কার মৃত্যুর পর স্ত্রী সৌদামিনি নাটোরের পাটুল গ্রামের কৃপানাথ মৈত্রের ছেলে রমণীকান্তকে দত্তক নেন। রমণীকান্ত নাবালক হওয়ায় রাজ্য কোড অফ ওয়ার্ডস এর অধীনে ন্যাস্ত হয়।
পরে প্রাপ্ত বয়সে তিনি তা ফিরে পান। রাজা রমণীকান্ত রায় বাহাদুর অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সুশিক্ষিত ছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে তিনি বিএ পাস করেন। তার রাজত্বকালে চৌগ্রাম ব্যাপক বৃদ্ধি ও আয়ের প্রসার ঘটে। সে কালে নদিয়া জেলার খালিশপুর ও বরিশাল জেলার মহাবাজপুর তার জমিদার বাড়ি ছিল। তারই নিদর্শন আজকের চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। চতুর্দিকে বারান্দা বেষ্টিত প্রায় শত বছরের পড়ানো মাটির ভবনটি আজও কালের সাক্ষী হিসেবে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। রাজা রমণীকান্ত ১৯৪৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু কালে তিনি পুত্র রাজেশ কান্ত, রবীন্দ্রকান্ত ও রমেন্দ্রকান্তকে রেখে যান।
তার মৃত্যুর পর বড় পুত্র রাজকুমার রাজেশকান্ত চৌগ্রাম রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর রাজপ্রাসাদ ছেড়ে রাজা রাজেশকান্ত স্বপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন। অদ্যাবধি তাদের কোন বংশধর আর চৌগ্রামে ফিরে আসেনি। এখানে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মাদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ সহ সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাদের পদচারণা ঘটলেও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের কোন উন্নতি হয়নি।
এমতাবস্থায় চৌগ্রাম রাজপ্রাসাদ চত্বরে পর্যটন কেন্দ্র বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে পুরাতন ঐতিহ্যকে উজ্জীবিত করলে এলাকাবাসী উপকৃত হবে বলে সবারই আশা। রাজ প্রাসাদটি সংস্কারের মাধ্যমে এলাকাবাসীর উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন চৌগ্রাম রাজবাড়ী চত্
Leave a Reply