প্রকৃতির বড় একটা সুন্দর বদভ্যাস আছে—সে কারও অনুমতি নেয় না। সময়মতো গরম পাঠায়, শীত নামায়, আবার হঠাৎ করেই আকাশভরা মেঘ এনে পৃথিবীটাকে ধুয়ে-মুছে দেয়। মানুষও কম যায় না! একই প্রকৃতিকে একেকজন একেকভাবে গ্রহণ করে। কেউ গরমে আম-কাঁঠালের প্রেমে পড়েন, কেউ শীতের কম্বলে নিজেকে জড়িয়ে সুখ খুঁজে পান, আর কেউ বর্ষার প্রথম ফোঁটায় রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন।
গত তিন দিন ধরে চট্টগ্রাম যেন আকাশের সঙ্গে এক নীরব চুক্তি করেছে। বৃষ্টি থামার নামই নেই। কোথাও ছাতা মাথায় দু’জন মানুষ একই ছাতার নিচে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন। কোথাও বারান্দায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কেউ লিখছেন—“বৃষ্টি মানেই তুমি”। এদিকে ভোজনরসিক বাঙালির ঘরে ঘরে খিচুড়ি, ইলিশ, ডিমভাজি কিংবা মাংসের উৎসব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ছবি—ক্যাপশন, “Rainy Day Mood”।
বৃষ্টিরও বোধহয় একটু হাসি পায়। কারণ সে জানে, একই সময়ে শহরের অন্য প্রান্তে তার আরেকটি পরিচয় আছে।
সেখানে বৃষ্টি মানেই ঘরে পানি ঢোকা। বিছানা ভিজে যাওয়া। চুলার আগুন নিভে যাওয়া। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, মায়ের অসহায় চোখ। যে মানুষটি সারাদিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যায় চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফেরেন, তিনি আজ বৃষ্টির কারণে রাস্তায় বেরোতেই পারেননি। দিনমজুরের কাছে এই টানা বর্ষণ কোনো রোমান্টিক কবিতা নয়; এটি খালি হাঁড়ির শব্দ, অনিশ্চিত আগামী আর ক্ষুধার দীর্ঘশ্বাস।
আমরা কেউ বৃষ্টির শব্দে ঘুমের গান শুনি, আবার কেউ সেই একই শব্দে রাতভর আতঙ্কে জেগে থাকি—পানি আর কতটা বাড়বে?
প্রকৃতি কখনও ধনী-গরিবের হিসাব রাখে না। কিন্তু সমাজের বাস্তবতা সেই হিসাব বড় নির্মমভাবে কষে দেয়। একই বৃষ্টি কারও মোবাইল ক্যামেরায় নান্দনিক ছবি হয়ে ধরা দেয়, আবার কারও জীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায় হয়ে ইতিহাসে থেকে যায়।
তাই বর্ষাকে ভালোবাসুন, অবশ্যই ভালোবাসুন। খিচুড়ি খান, কবিতা লিখুন, বৃষ্টিতে ভিজুন, প্রিয়জনের সঙ্গে এক কাপ চা ভাগ করে নিন। তবে সেই আনন্দের ফাঁকে একবার অন্তত মনে করুন—হয়তো আপনার আশপাশেই এমন একটি পরিবার আছে, যাদের কাছে আজ এক প্লেট গরম খিচুড়ি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার আশীর্বাদ।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার সহমর্মিতা। কারণ বৃষ্টি একদিন থেমে যাবে, আকাশ আবার নীল হবে। কিন্তু দুর্দিনে বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত, একটি উষ্ণ আহার, একটি আন্তরিক খোঁজ—এসবের স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে অনেক দিন, অনেক ঋতু বেঁচে থাকে।
হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা—একই আকাশের নিচে আমরা সবাই ভিজি, কিন্তু মানুষ হয়ে উঠি তখনই, যখন অন্যের অশ্রুও নিজের বৃষ্টির মতো অনুভব করতে শিখি।
Leave a Reply