বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক বিশ্বজিৎ শীল ও সদস্য সচিব রেহেনা পারভীন খুশি এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন দীর্ঘদিন থেকেই ভারতের শিক্ষার্থীরা সে দেশের দুর্নীতিগ্রস্থ,অব্যবস্থাপনার বৈষম্য মূলক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এরই মধ্যে মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস,নিয়োগ বাণিজ্য ও এর পরিণামে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থীর আত্মহনন গোটা দেশের তরুণ তরুণী, যুবকদের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভের জন্ম দেয়।শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে ও শিক্ষাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে দুর্নীতিগ্রস্ত,ব্যর্থ শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সহ তিন দফা দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তর মাঠে ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলনে নেমেছে। গত ২০ জুলাই শিক্ষার্থীরা ভারতের সংসদ অভিমুখে সংসদ চলো, পদযাত্রা পালন করে, এসময় দিল্লি পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়,বহু শিক্ষার্থী, আন্দোলনকারীদের রক্তাক্ত ও গ্রেফতার করে। কিন্তু এত সব নিপীড়ন নির্যাতন সত্ত্বেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাদের লড়াই জারি রেখেছেন। এরই মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকরা ভারত সরকারের সাথে প্রস্তাবিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। তারা হুশিয়ারি দিয়েছেন যে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন শাসকগোষ্ঠীর সাথে তাদের কৃষি ও কৃষক স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করা হলে তারা কঠোর আন্দোলন নামবেন। আমরা ভারতের কৃষক ও ছাত্র জনতার এই দৃঢ় লড়াকু মনোবলের প্রসংশা করছি এবং সেই সাথে আন্দোলন কারীদের যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করছি। একই সাথে আমরা ভারতের সরকারকে আহ্বান জানাই অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিন,অব্যবস্থাপনার দুর্নীতিগ্রস্থ,বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করুন। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের লড়াইয়ে মুখে আপনাদেরকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা,নেপালের মত পরিস্থিতি বরণ করতে হবে। মূলত, পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী ভারত রাষ্ট্রে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকারগুলো ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর সীমাহীন ভোগবিলাসের জীবন আর অন্যদিকে অগণিত শ্রমজীবী মেহনতী দরিদ্র মানুষের অসহায় জীবন বাস্তবতাই সেই দেশের প্রকৃত চিত্র। ভারত একটা বহুজাতিক রাষ্ট্র, প্রায় ২৮ টা প্রদেশের বিপুল সংখ্যক জনগণের এমন অনেক অঙ্গ রাজ্য আছে যেখানে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোর সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ভারত সরকার মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর অস্বাভাবিক আয়ের হিসাব দেখিয়ে তার দেশের প্রবৃদ্ধি দেখায়, অথচ এই রাষ্ট্রে প্রতিদিনই উচ্চ শিক্ষিত থেকে শিক্ষাহীন বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছেই। জনজীবনে দেখা দিচ্ছে নানা মুখী সংকট-সমস্যা। ভারতে চলমান আন্দোলন প্রমাণ করছে যে ভারতীয় পুঁজিবাদ ভারতের জনগণের মানসম্মত জীবনমান নিশ্চিত করতে পারেনি, লুটেরার মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ হাসিলকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা সেই দেশের জনগণের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থায় সীমাহীন অনিয়ম দুর্নীতি ও বাণিজ্য রুখতে পারিনি। শিক্ষা শেষে কাজ প্রতিটি দেশের নাগরিকের একটা অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার।অথচ পুঁজিবাদী ভারত রাষ্ট্র তার দেশের অসংখ্য তরুণ তরুণীদের সেই অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি, বরং তার প্রশাসন মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁস ,নিয়োগ বাণিজ্য-সহ নানা জনস্বার্থ বিরোধী ক্রিয়াকলাপে নিমগ্ন। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ভারতের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তারা তাদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্নীতিবাজ,ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ শিক্ষাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করছেন।এই আন্দোলনে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল,সংগঠন, শিল্পী,অভিনেতা-অভিনেত্রী,সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবী ও সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সমর্থন জানিয়েছেন এবং কেউ কেউ সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত খেয়াল করেছি যে এমন একটা আন্দোলনেও গত ২০ জুলাই নয়া দিল্লি পুলিশ আন্দোলন কারীদের উপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়েছ এবং তাদের প্রধান আন্দোলনকাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অসংখ্য আন্দোলনকারীদের হতাহত করা হয়েছে। নয়া দিল্লি পুলিশের ছাত্র জনতার যৌক্তিক আন্দোলনে এই ন্যাক্কারজনক হামলা ভারতের শাসকগোষ্ঠীর ফ্যাসিস্ট আচরণেই বহিঃপ্রকাশ। তারা কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে ছাত্র জনতার কন্ঠরুদ্ধ করতে চাইছে এবং আন্দোলনকারীদের ষড়যন্ত্রকারী,রাষ্ট্র দ্রোহী আখ্যা দিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে ভরছে,যা কোনো ভাবেই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নমুনা হতে পারেনা। বরং নরেন্দ্র মোদির সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবেরই প্রকাশ পেয়েছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতের ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী শাসক,তিনি সেই দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জীবন মানোন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকাই পালন করেননি বরং কর্পোরেট পুঁজির আওতায় সমগ্র ভারত শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের শ্রমকে পুঁজিপতিদের স্বার্থে বিক্রি করছেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ভারতে ক্রমাগত বেকারত্ব, শিক্ষার অধিকার বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেই সাথে জনগণের জন্য তার দেশে একটা নিরাপদ পরিবেশ নির্মাণেও ব্যর্থ হয়েছেন।যেখানে প্রায় প্রতি দিনই নারী ও শিশু নিপীড়ন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হন, শিক্ষার অধিকার সহ বেঁচে থাকার সমস্ত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত। আমরা তাদের এই দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়ার আহবান জানাই এবং একই সাথে আন্দোলনে হামলার নিন্দা ও বিচার দাবী করি।
Leave a Reply