সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১.
মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী যতদিন জীবিত ছিলেন, একটা সময়ে আসামে ও পরবর্তীতে আমৃত্যু পূর্ব বাংলার, প্রকারান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির নিয়ন্তা- পুরোহিত পুরুষ ছিলেন। বৃটিশ ভারতে প্রথম যৌবনে আসাম প্রদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। যৌবনে, প্রৌঢ়ত্বে, বৃদ্ধ বয়সে সক্ষমতা থাকলেও কোনো কালেই বাংলা কিংবা আসাম, কোন প্রদেশেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আয়ত্বের চেষ্টা তিনি করেননি। তাঁর সময় কালে কে বা কারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে? কে বা কারা যাবে না? এই দেশে দীর্ঘ কয়েক দশক তা নির্ণিত হতো, মাওলানা ভাসানীর সমর্থন অসমর্থনের অঙ্গুলি হেলনের উপর। মাওলানা ভাসানী চেয়েছিলেন বলেই ‘৫৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। মাওলানা ভাসানীর তৎপরতায় ‘৫৪-র নির্বাচনে, মুসলিম লীগের ভরাডুবি ও যুক্তফ্রন্ট অভাবনীয় সাফল্য পেলো। মাওলানা ভাসানী সমর্থন দিয়েছেন বলেই, আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী সভা গঠিত হতে পেরেছিলো। মাওলানা ভাসানী রাস্তায় নেমেছিলেন বলেই, জেনারেল আইয়ুব বিরোধী ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান সফল হতে পেরেছিলো। ফল স্বরূপ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি থেকে খালাস পেয়ে, শেখ মুজিবুর রহমান ফাঁসির কাষ্ঠের মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে, জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বেরুতে পেরেছিলেন। ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে শেখ মুজিবুর রহমান, যদিও মাওলানা ভাসানীর সেই ঋণ পরিশোধ করেছেন, নিজ শাসনামলের পুরোটা সময় ধরে, মাওলানা ভাসানী-কে টাঙ্গাইলের সন্তোষে গৃহবন্দী করে রেখে।
জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি, গণভিত্তি পেয়েছিলো মাওলানা ভাসানীর সমর্থন পেয়ে। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক এটাই হচ্ছে নিরেট বাস্তবতা। মাওলানা ভাসানীর আনুকুল্য পেয়েছিলো বলেই বিএনপি আজোবধি সমগ্র বাংলাদেশের ব্যাপক জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন। এমনকি মাওলানা ভাসানীর অনুসারী বহু নেতা কর্মী পরবর্তী কালে বিএনপির কান্ডারী হয়েছেন। মাওলানা ভাসানী পরবর্তী কালে একদিকে বিএনপি করে রাজনীতিতে পুনর্জীবন লাভ করেছেন। অন্যদিকে তাঁরা বিএনপি-তে পুনর্বাসিত হয়ে বিএনপিকে গণনভিত্তি দিয়েছেন। উইন উইন সিচুয়েশন। এমনকি বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক যে ধানের শীষ, এটাও মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর গড়া রাজনৈতিক দল ন্যাপ এর নির্বাচনী প্রতীক ছিলো। যা মাওলানা ভাসানী স্বেচ্ছায় সতঃস্ফূর্ত ভাবে, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি)-র দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার্যের নিমিত্তে। এতেই প্রমাণ মিলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর নিজের আদর্শের প্রতিফলন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর মাঝে পেয়েছিলেন বলেই, তিনি নিজেই আর তাঁর রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবার আগ্রহবোধ করেননি। বলা চলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে, তাঁর তিলে তিলে গড়ে তোলা রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাপ-কে, নিজের জীবদ্দশায়ই অঘোষিত ভাবে বিএনপি-তে লীন করেছিলেন।
আওয়ামী মুসলিম লীগ যা পরবর্তী কালে আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হয়েছে, তারও আগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠা। মুসলিম লীগের পরেই বৃটিশ ভারত, পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল হলো, “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ”। অধুনা যা “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী” নামে পরিচিত। ‘৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভুল রাজনীতির সূচনা। ‘৭১ সনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে করেছেন চরম ভুল। ‘৯৬ সনে সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের সাথে মিলে, বিএনপি সরকারের পতন আন্দোলন করাটা ছিলো, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের চুড়ান্ত বোকামি। এই ভুলের মাসুল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে দিতে হয়েছে অঢেল খেসারত। জামায়াতে ইসলামীর নীতি নির্ধারনী প্রায় সকল নেতৃবৃন্দকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে, জুডিশিয়াল কিলিং করেছে রাজপথের মিত্র আওয়ামী লীগ নেত্রী হাসিনা ওয়াজেদ।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়াটা অবধারিত। কারণ আওয়ামী লীগের ভোটও বিএনপির বাক্সেই যাবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করলেও যাবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন না করলেও যাবে। মুসলিম লীগ কি নিষিদ্ধ? না। তবে শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগাররা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই বিএনপিকে ভোট দিয়ে আসছে। ঐ একই সূত্রানুসারে এবার আওয়ামী লীগাররাও তা-ই করবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হোক বা না-ই হোক। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কতৃক ছাত্র-জনতার ন্যাক্কারজনক গণহত্যার দায়, কোনো আওয়ামী লীগারই স্বেচ্ছায় নিতে চাইবে না। হাসিনা ওয়াজেদ এর এই ন্যাক্কারজনক ঘৃণ্য বর্বরতাকে কোনো আওয়ামী লীগার ওউন করবে না। আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবিত করে ও ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, গণহত্যার দায় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা নিবে না। ৫-ই আগষ্ট ‘২৫-র পর থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, এই বাংলাদেশে কালিমাময় অধ্যায়ের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জার্মানীর হিটলারের ন্যাৎসি পার্টি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বার্থ পার্টি, ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির কাতারে এসে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে, না ফেরার দেশে চলে গেছে। তাই বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার ভয়ে, বিএনপির বাড়া ভাতে ছাই দিতে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি সহ এটা সেটা মুলা সামনে ঝুলিয়ে দিতে পারা যাবে, নির্বাচন বিলম্বিত করা যাবে সত্য। তবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। বরঞ্চ দিন যতই গড়াবে ক্রমশ বিএনপি আরও জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে উঠবে। কারণ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, এই দেশ জনগণ সব সময় নিপীড়কের বিপক্ষে, নিপীড়ীতের পক্ষে একাট্টা লৌহ প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
২.
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি অন্তরে ধারণ করে এগুতে হবে। কেমন? ধর্মীয় লেবাস আঁটা কোনো রাজনৈতিক দলই এই বিশ্বায়নের যুগে, বিশ্ব রাজনীতিতে সমালোচনার উর্ধ্বে উঠতে পারবে না। সেটা খৃষ্টান, মুসলিম, ইহুদি কিংবা হিন্দু ধর্ম- যে কোনো ধর্ম নির্ভর দল-ই হোক না কেন। ইহুদি ও হিন্দু ধর্মের ঝান্ডা নিয়ে লিকুদ পার্টি ও বিজিপি ইসরায়েল ও ভারতে, ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বলে, উভয় দেশই বিশ্বে প্রগতিশীল ভাবমূর্তি হারিয়ে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনুল্লেখ্য, ম্লান, ম্রিয়মাণ ও তুচ্ছ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে তদ্রূপ ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করলেও তাদেরকে, সংযম প্রদর্শন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ঐ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার মতো জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে। সাধারণ মানুষ আর একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের মধ্যে কিছুটা ব্যবধান তো থাকা জরুরি। তাই নয় কি? সাধারণ মানুষ আবেগে ভর করে চললেও একজন রাজনীতিককে বিবেকের উপর ভর চলা অপরিহার্য ও অত্যাবশ্যকীয়। বিশেষ করে বর্তমান অত্যাধুনিক বিশ্ব হলো গ্লোবালাইজেশনের যুগ। “একলা চলোরে নীতি” বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে একেবারেই অকার্যকর পন্হা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র উচিত বিএনপিকে সামনে রেখে, ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, সরকার পরিচালনায় শরীক হওয়া। একক প্রচেষ্টায় বা নিজেদের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন করবার মতো, কোনো প্রকার চেষ্টা না করা হবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সুবিবেচনা প্রসূত কাজ। বরঞ্চ বিএনপির ছত্রছায়ায় থেকে ২০০১ সালের জোট সরকারের মতো, নিজেদের কাঙ্ক্ষিত এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করাটা হবে উত্তম ও সমীচীন।
এনসিপি হলো এক সময়ে সমগ্র বাংলাদেশে দোর্দণ্ড প্রতাপে দাবড়িয়ে বেড়ানো রাজনৈতিক দল “জাসদ” এর প্রতিচ্ছায়া। আনকোরা কোনো নতুন রাজনৈতিক দল গঠন না করে, এনসিপি-র প্রতিশ্রুতিশীল নেতৃবৃন্দের উচিত ছিলো, শিবির ব্যাকগ্রাউন্ডের যাঁরা তাঁদের জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেয়া। আর প্রগতিশীল ও নিরপেক্ষ অন্যদের বিএনপি-তে লীন হওয়া। তাঁদের ফ্যাসিস্ট হাসিনা ওয়াজেদ বিরোধী ভূমিকাকে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি অবশ্যই মূল্যায়ন করতো। তা তাঁরা করলেন না। কাজেই এনসিপি-র পরিণতিও হবে জাসদের মতোই। জাসদ যেমন ৭৩ সনের নির্বাচনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলো। আগামী নির্বাচনে এনসিপি তেমনই ব্যাপক আলোচিত হবে। সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, নির্বাচনের ফলাফলটা যদিও শেষ পর্যন্ত জাসদের ফলাফলের অনুরূপ কার্বন কপি বা কপি পেস্ট হবে নিঃসন্দেহে। মূল কথা হলো হঠাৎ আবেগ, হঠাৎ বৃষ্টির মতোই কখনও দীর্ঘস্হায়ী কিছু না। জাসদ যেমন তারুণ্য মিশ্রিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিলো। আজ এনসিপি হলো তেমনই তারুণ্যের আবেগের জোয়ারে ভাসা সংগঠন।
একটা সময়ে দুর্নিবার আবেগের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং বিবেক বিবেচনাবোধ জাগ্রত হয়। জাসদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, এনসিপি-র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। কারণ, আদর্শ বিহীন আবেগ সর্বস্ব রাজনৈতিক দল দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে অক্ষম। যেকারণে জাসদ দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকেনি। জাসদ ও এনসিপি উভয়ই আবেগে টুইটুম্বুর শ্রেণি চরিত্র বিহীন ছাত্রদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক সংগঠন। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য পূর্ণ কথা হলো, আবেগের বশে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন তুলনামূলক সহজ। বিবেক বিবেচনা জাগ্রত করা রাজনৈতিক দল গঠন করে, নিরঙ্কুশ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বরং ততোধিক দুরূহ। এছাড়াও মনে রাখতে হবে ছাত্রদের কোনো শ্রেণি নেই। অথচ শ্রেণি স্বার্থ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না। জাসদেরও কোনো শ্রেণি চরিত্র শ্রেণি স্বার্থ ছিলো না। এনসিপির-ও কোনো শ্রেণি চরিত্র শ্রেণি স্বার্থ নেই। দেশে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বুর্জোয়া উচ্চবিত্তদের শোষণ লুটপাট ভিন্ন কোনো শ্রেণি চরিত্র থাকে না। বাদবাকি মধ্যবিত্ত বা নিন্মবিত্তদের কমন শ্রেণি চরিত্র শ্রেণি স্বার্থ-কে পুঁজি করে রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠে। উঠতেই হবে। যে কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক সংগঠনকে এই সতঃসিদ্ধ সূত্রের বাইরে যাওয়ার বিন্দু মাত্র সুযোগ নেই। এনসিপি কি রাষ্ট্র বিজ্ঞানের নির্ধারিত এই সূত্রের বাউন্ডারির বাইরে গিয়ে গোল করে- ফাউল খেলবে?
যদিও সর্বান্তকরণে দেশের সচেতন সুশীল সমাজের চাওয়া, এনসিপি সফল হোক। অন্তত ধর্মীয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এর বিকল্প হয়ে উঠুক প্রতিশ্রুতিশীল প্রগতিপন্হী এনসিপি। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে তার কোনো লক্ষণ ফুটে উঠছে না। সচেতন সুশীল সমাজের চাওয়া না চাওয়ায় কিচ্ছু যায় আসে না, যদি জনগণ না চায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঔদ্ধত্যকে কস্মিনকালেও প্রশ্রয় দেয় না। অথচ এনপিপির কর্মকাণ্ডে ঔদ্ধত্যের সীমা পরিসীমা নেই। উদাহরণ দিই। দল বা ব্যক্তি ব্যাপক জনপ্রিয় হলে প্রতীক শাপলা কি ধানের শীষ? কোনো ম্যাটার না। এই এক শাপলা প্রতীক পেতে, এনসিপি-র যা হম্বিতম্বি তা সচেতন সুশীল সমাজকে রীতিমতো স্তম্ভিত করেছে। আনার অবশ্যই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সমালোচিত হবে। কিন্তু যে অসভ্য ও অভব্য ভাষায় গালমন্দ করে, বিএনপি প্রধান জনাব তারেক রহমানের গোষ্ঠী উদ্ধার করে, এনসিপি মিছিলে শ্লোগান উচ্চারণ করলো। তাতে আগাম বলে দেয়া কষ্টসাধ্য নয় যে, পূর্বোক্ত সূত্রানুসারে এনসিপির পরাজয় ও কালের করালগ্রাসে বিলীন হয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আবারও বলছি, যদিও সচেতন সুশীল সমাজের চাওয়া, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এর বিকল্প হয়ে উঠুক এনসিপি। কেনো? তার ব্যাখ্যা এই নিবন্ধেই আছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণ কতৃক প্রত্যাখ্যাত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত। যেহেতু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিজেরাই এই বাংলাদেশে, তাদের নিজেদের জঘন্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, এই বাংলাদেশে রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার নিজেরাই খর্ব করেছে।
৩.
বিএনপি-তে পোড় খাওয়া, ত্যাগী, সুযোগ্য, দক্ষ, পরীক্ষিত ও সচেতন যতো রাজনৈতিক নেতা আছে। চরমোনাইয়ের ইসলামি আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম সহ উপর্যুক্ত দল সমূহ মিলে অতোগুলো মেধাবী ও প্রতিভাবান রাজনৈতিক কর্মীও নেই। আবার বিএনপি-তে এমন অনেক সাধারণ সমর্থক ও ভোটার ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, চাকরিজীবি আছেন- যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার ওয়াজেদের শত নিপীড়নের মুখেও বিএনপি পরিত্যাগ করেননি। বিএনপি সমর্থিত বহু সাধারণ ব্যবসায়ী পাওয়া যাবে, যাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপোষ করে চললে, ব্যবসায় বাণিজ্যে শনৈ শনৈ উন্নতি লাভ করতে পারতেন। কিন্তু হাসিনা ওয়াজেদের স্বৈরশানকে প্রবল ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে ব্যবসায়িক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, আইনজীবী আছেন যাঁরা সামান্য আপোষ করে চললেই, সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করে উন্নতির শিখরে আরোহন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে সুদীর্ঘ পনেরো বছর নিগৃহীতের জীবন যাপন করে গেছেন, বিএনপির আদর্শের অনুসারী হয়ে। অনেক চাকরিজীবি বিগত পনেরো বছর কোনোই পদন্নোতি পাননি, বিএনপি মনোভাবাপন্ন বলে। অথচ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অবহেলিত থেকেও ইনারা সকলেই আজ তৃপ্ত যে, আদর্শের সাথে আপোষ করেননি। ফ্যাসিস্ট মুক্ত সমাজে ও পরিবারে আজ মাথা উঁচু করে চলে ও প্রাপ্য সম্মান পেয়ে, বিগত সময়ের মর্ম যতনা ভুলে চলছেন। যে সকল বিএনপি পন্হি ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকার দায়ে পড়েও মাথা নত করিনি। যে সকল পেশাজীবি আওয়ামী লীগকে বর্জন করে চলে নিগৃহীত হয়েও মাথা নত করেননি। যে সকল চাকরিজীবি পদোন্নতি না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়েও আশা ছাড়েননি। কেবলমাত্র আবার বিএনপি-র ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখে দেখে। বিএনপির শেকড় দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। যে কৃষক সমাজ “বিআর ফোর ধান”-কে জিয়াউর রহমানের প্রতি ভালোবেসে বলে “জিয়ার ফোর ধান”!! যে ধানের শীষ কৃষকের আরাধ্য প্রতীক!!! এই বিএনপিকে অস্বীকার করতে চান? এক তুড়িতে এমত জাতির মননের গভীরে প্রোথিত বিএনপিকে ধূলিসাৎ করে দিবেন? বিষয়টি এতোই সহজ? কস্মিনকালেও না।
অবান্তর চিন্তা করে দেশটাকে অস্থিতিশীল করা কোনক্রমেই উচিত হবে না। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এক না। বিএনপি-র প্রতিষ্ঠা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা পাকিস্তান আমলে। মাওলানা ভাসানী নিজ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী মুসলিম লীগ ছেড়ে যাবার কারণ, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভারতের অনুচর হিসেবে কাজ করছে- এটা মাওলানা ভাসানী অনুধাবন করেছেন বলে। মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ পরিত্যাগের পর, আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর নাম থেকে লেজ খসিয়ে আওয়ামী লীগ-এ রূপান্তরিত হয়ে, এই সংগঠনের এজেন্ডা ছিলো ভারতের স্বার্থ পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মাটিতে হাসিল করা। আওয়ামী লীগ অতি সাম্প্রতিক কালেও স্বীকার করেছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে পরিচালিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মিথ্যা ছিলো না। শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্যা- শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের মতোই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠা, হাসিনা ওয়াজেদ তো সফল আগষ্ট বিপ্লবের পরে পালিয়ে আশ্রয়ই নিয়েছেন ভারতে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বিএনপি-কে গণ ভিত্তি দেয়া আপোষহীন দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, কিংবা অতি সাম্প্রতিক কালে ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া, জনাব তারেক রহমান- ইনারা সবাই পূর্বাপর দলীয় ম্যানিফেস্টোতে ঘোষণা দিয়ে বলে আসছেন, “বিদেশে আমাদের কোনো প্রভূ নেই। বন্ধু আছে”। অতএব, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি-কে এক পাল্লায় মাপা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা।
তাওয়া গরম গরম থাকতে রুটি সেঁকে নিতে হয়। ভাঙা ডিমে তা দিলে যেমন বাচ্চা ফোটার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তদ্রূপ ঠান্ডা তাওয়ায় রুটি মেলে দিয়ে রাখতে পারেন, সত্য হলো রুটি গরমও হবে না সেঁকাও হবে না। কারণ তাওয়া তো ঠান্ডা হয়ে আছে। জামায়াতে ইসলামী সব কিছু একটু বেশি দেরিতে বোঝে, এটা তাঁদের আদি সমস্যা। যাঁরা মনে করেন নির্বাচন দেরিতে হওয়াটা ভালো হয়েছে। আমি বলি, না ভালো হয়নি। নির্বাচন যতই পিছিয়ে দিবেন ততই বিএনপি আরও জনপ্রিয় হবার স্পেস পাবে, বিএনপি বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালিয়েও অন্যরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়বে। আন্দোলনের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন সমাপন যদি হতো তবে, জাতীয় সংসদে জমায়াতে ইসলামী পেতো সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনমত তখন, যে কোনো কারণেই হোক জামায়াতে ইসলামীর অনুকূলে ছিলো। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সরকার গঠন করাটাও বিচিত্র ছিল না। যদিও সে মন্ত্রী পরিষদ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতো না, ধর্মীয় লেবাসধারী সরকার প্রপাগান্ডায়। অপরাপর দল সমূহ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র না হলে, মোটামুটি সংখ্যা গরিষ্ঠের কাছাকাছি আসন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেতে পারতো। কেনো বললাম? তাহলে একটা ভারসাম্য আসতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে। অন্তত “বিএনপি ও জামায়াত” পূর্বের “বিএনপি ও আওয়ামী লীগ” এর মতো দ্বি-দলীয় ব্যবস্হা গড়ে উঠতে পারতো বাংলাদেশে। জামায়াতে ইসলামী ও মিত্রগণ সেই ভুলের খেসারত দিচ্ছেন, বিএনপি ঠেকানোর নিমিত্তে এখন Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে নির্বাচনের কথা বলে, নতুন এক অবান্তর তত্ত্ব সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে। একটা মিথ্যা যেমন আরও দশটা মিথ্যা ডেকে আনে তদ্রূপ, একটা ভুল আরও দশটা ভুলের জন্ম দেয়। এই চক্কর থেকে জামায়াতে ইসলামী ও মিত্রদের বেরিয়ে আসাটা খুবই জরুরি। যেহেতু বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প হতে চলেছে জামায়াতে ইসলামী। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগুনোটা জামায়াতে ইসলামীর জন্য এখন ফরযে আইন।
৪.
বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত দু’টো নির্বাচনী পদ্ধতি আছেঃ FPTP (First Past The Post) এবং PR (Proportional Ratio). বাংলাদেশে বর্তমানে First Past The Post (FPTP) পদ্ধতি প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে দলীয় মনোনয়নে ও প্রতীকে প্রত্যেক ব্যাক্তি সরাসরি নির্দিষ্ট আসনে, ভোটার দিগের প্রাপ্ত সর্বাধিক ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের জনগণের পক্ষে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে যাকে বলে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির নির্বাচন। তাতে ভোটার কোনো ব্যক্তিকে ভোট দিবেন না। ভোটার যে দলের আদর্শ হৃদয়ে লালন করেন, কেবলমাত্র সে দলের জন্য নির্ধারিত দলীয় প্রতীকে ভোট দিবেন। জাতীয় নির্বাচন শেষে ভোট গণনার পরে, নির্বাচন কমিশন কোন দল কি পরিমাণ ভোট পেলো? তার পরিসংখ্যান প্রকাশ করবে। তখন যে রাজনৈতিক দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, ঠিক রেশিও অনুযায়ী জাতীয় সংসদে সেই দল, ঠিক সেই পরিমাণ সংসদীয় আসন পাবে। এটাও জটিল কোনো পদ্ধতি না। একেবারে সহজ পদ্ধতি। এই কারণেই বর্তমান বিশ্বের ৯১ টি দেশে এই Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্হা সফল ভাবে কার্যকর হয়ে চলছে। উল্লেখ্য যে, এই পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের সুযোগ নেই। অথচ First Past Proportional Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনে, কোনো দলের অনুগত না হয়েও ব্যক্তির, স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা ও নির্বাচিত হওয়া সম্ভব।
সর্ব সময়ে কিছু ব্যতিক্রম বাদে সাধারণত মেধাবীগণ রাজনীতিতে অনুৎসাহী। কারণ রাজনীতির পথ অতি বন্ধুর। First Past The Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনে মেধাবীদের তা-ও কিছুটা হলেও স্পেস থাকে। কিন্তু Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে তা-ও থাকে না। কাজেই Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির দেশ গুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, First Past The Post (FPTP) পদ্ধতির দেশগুলোর তুলনায় মেধাবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহন তুলনামূলক কম। যেহেতু দলীয় হাইকমান্ডের হাতের মুঠোয় ধরা থাকে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে এমপি নির্ধারণ। কাজেই এই পদ্ধতিতে রাজনীতিতে মেধাবীরা হয়ে পড়ে কোনঠাসা। দলীয় প্রধান বা হাইকমান্ড ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কখনও অর্থ লোভে কখনও স্বেচ্ছাচারী মানসিকতায়। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে মেধাবী দিগের না, অযোগ্য তোষামোদকারীদের সংসদ সদস্য হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
যেহেতু Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে দলীয় হাইকমান্ড নির্ধারণ করবে কোন আসনে কে বা কারা এমপি হবেন? আবার বড়ো সংগঠনে কিছু মেধাবী নেতৃত্ব গড় উঠলেও, অপরাপর ছোটো দলে মেধাবী ও যোগ্য নেতৃত্ব একেবারেই গড়ে উঠে না। কাজেই সংসদীয় দলকে কার্যকর করতে দলীয় হাইকমান্ডকে কিছু মেধাবী নেতৃত্ব হায়ার করতে হয়। এই হায়ার করা নেতা নিয়ে পরবর্তীকালে সংসদে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। সংক্ষেপে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি হলো একটি চীর অস্থিতিশীল নির্বাচনী ব্যবস্হা। এর অপরিহার্যতা হলো বহু জাতিক, বহু ভাষিক, বহু ধার্মিক ও বহু সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দেশ সমূহে। সরকারের চেয়ে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখাটা যেখানে অত্যাবশ্যকীয়, সেখানে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে পরীক্ষিত ও প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশ হলো এক জাতি, এক ধর্ম, এক ভাষা, একই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের একটি দেশ। এখানে বিশ্বে বহুল প্রচলিত Fist Past The Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্হার বিকল্প যাঁরা চিন্তা করেন, তাঁদের শুভ বুদ্ধি প্রশ্নবোধক হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেনো? পূর্বেই বলেছি Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি হলো বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দেশের জন্য একটি ধন্বন্তরি বিকল্প নির্বাচনী ব্যবস্হা। যেহেতু Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে যে কোনো ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীরই, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো জাতির, কোনো ধর্মের, কোনো ভাষার, কোনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের লোক Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে ১% ভোট পেলেও জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। এটা হলো Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির ইতিবাচক দিক। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে অবহেলিত হওয়ার সুযোগ দেয় না। বাংলাদেশে কি এমন সংকট বিরাজমান? উত্তর হলো, না। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জাতীয় সংসদের অংশ হয়ে উঠতে পারে। প্রচলিত First Past The Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্হায় যা একেবারেই অসম্ভব।
সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রে সরকার স্থিতিশীল হলো কি হলো না, সেটা Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে ধর্তব্য না। ধর্তব্য হলো রাষ্ট্রে বিদ্যমান সকল জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে কিনা? বাংলাদেশের মতো এক জাতি, এক ধর্ম, এক ভাষা ও এক সংস্কৃতির অধিবাসী দিগের দেশে তাই Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির চিন্তা করা অবান্তর। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি হলো একটি এমন এক পদ্ধতি যাতে কোনো রাজনৈতিক দলই জাতীয় সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পায় না। ছোটো ছোটো দলগুলোর হটকারিতায় রাষ্ট্র ও সরকার চির অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অস্থিতিশীল সরকার গঠনের জটিলতা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোট সরকারের ইতিহাস খুব সফল নয়। যার প্রকৃষ্ট নজির ‘৫৪-র ক্ষণস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ও সংসদ। এমনকি বাংলাদেশ কেনো? বিশ্বের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক মর্মান্তিক কান্ড সংগঠিত হয়েছিল, স্বল্পস্হায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের মেয়াদকালে। এই মেয়াদকালে ন্যাশনাল এসেম্বলির বসার চেয়ার ছুড়ে, স্পীকার শাহেদ আলীকে নির্মম ভাবে সংসদ অভ্যন্তরে হত্যা করা হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, জঘন্য এই কাজটি সংঘটিত করেছেন এসেম্বলির নির্বাচিত মেম্বারগণই।
যদিও সেটা Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ ছিলো না। বরং First Past The Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ ছিলো। মোদ্দা কথা হলো First Past The Post (FPTP) পদ্ধতিতেও অনেক সময়, কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারলে, জোট সরকার গঠন করতে হয়। যার ফলে গঠিত সরকার প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়। তবে First Past The Post (FPTP) পদ্ধতিতে, Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির তুলনায়, সরকার ক্রমাগত অস্থিতিশীল হবার প্রবণতা কম থাকে। যেমনঃ First Past The Post (PR) পদ্ধতির নির্বাচনে বাংলাদেশে ২০০১ সালে “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল” (BNP) ৪১.৪০% ভোট পেয়ে ২০০টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করেছিলো। অন্যদিকে “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” ৪০.০২% ভোট পেয়েও, মাত্র ৬২টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করেছিলো। ফলে দেশে পাঁচ বছরের জন্য স্হিতিশীল সরকার গঠিত হতে পেরেছিলো।
৫.
Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে দেশে সরকার গঠনে অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমনঃ ইসরায়েলে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি প্রচলিত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯-২০২২ সময় কালে ৫ বার জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে অস্থিতিশীল সমস্যার কারণে। এমনকি Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি প্রচলিত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে, ২০০৬ সালে রাজতন্ত্রের পতনের পর নেপালে, মাত্র ৯ বছরে অস্থিতিশীল বহুদলীয় সরকারের স্বার্থের ও দ্বন্দ্বের কারণে, ৮ বার দেশের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে এটাও ঠিক যে, নেপালে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি প্রচলিত থাকার কারণে, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৬টি দল জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছিল। এতে করে অস্থিতিশীল সরকার গঠিত হলেও বহু জাতিক নেপালীদের, প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব হয়েছিলো। এটাই Proportional Ratio পদ্ধতির নির্বাচনের সর্বাধিক ইতিবাচক দিক। অন্যদিকে বাংলাদেশে যদি Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে ভোট হতো তবে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) পেত ১২৪টি আসন। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ পেত ১২০ টি আসন। যদি তা হতো তবে, দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা পাঁচ বছরের জন্য হারাম হয়ে যেতো।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়, কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বসবাস করলেও মূলত বাংলাদেশ এক ইসলাম ধর্ম, এক বাংলা ভাষা, এক বাংলাদেশি জাতি ও এক বাঙালি সংস্কৃতি ভিত্তিক রাষ্ট্র। আমাদের দেশের মতো এক রৈখিক দেশে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতি একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। এই প্রস্তাবনা বাংলাদেশে উঠানো মানে “কাজ নেই তো খই ভাজ” টাইপের আচানক কর্মকাণ্ড। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতিতে রাজনীতিকদের যেহেতু সরকারে স্হিত হওয়ার সুযোগ কম, কাজেই আমলাগণ রাষ্ট্রে ইত্যবসরে ব্যাপক ক্ষমতাধর হয়ে পড়ে। এক কথায় বলা চলে, First Past The Post (FPTP) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্হার দেশ গুলোয় রাজনৈতিক নেতাদের থাকে অঢেল প্রভাব। অপরদিকে Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্হার দেশ গুলোয়, রাজনীতিকদের নিজেদের মধ্যকার টানাহ্যাঁচড়া হেতু, সরকারে স্হিত আমলাগণ রাষ্ট্রে হয়ে উঠে সর্বেসর্বা।
আওয়ামী লীগ হলো আগাগোড়া ভারতীয় আধিপত্যবাদের পক্ষের সন্ত্রাসী সংগঠন। বিএনপি হলো দেশে বিদ্যমান জনগণের শক্তিমত্তায় বলীয়ান, এক মহাপরাক্রমশালী রাজনৈতিক দল। ৫-ই আগস্টের সফল বিপ্লবের পর থেকে বিএনপি হয়ে পড়েছে একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। সুপ্ত এই আগ্নেয়গিরিকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে না তোলাই উত্তম। বিরোধিতার খাতিরে বীরোধীতা করা যায়। বাস্তবতা হলো, আগামী নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণে বিএনপির বিজয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না- এটা সুনিশ্চিত। বিএনপির বিজয় প্রয়োজনও। কেনো? একদিকে পশ্চিমা দুনিয়া কখনোই ধর্মীয় লেবাসধারী কোনো সংগঠন দ্বারা পরিচালিত দেশকে আস্কারাও দিবে না, সাইডও দিবে না। বাংলাদেশের ৫-ই আগষ্ট বিপ্লব পরবর্তী কালে হোয়াইট হাউসে, আমেরিকার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হলি ফ্রাইডে বা গুড ফ্রাইডেতে, কেবলমাত্র বিএনপিকে নিমন্ত্রণ করা তারই ঈঙ্গিত বহন করে। আমেরিকা যেপথে হাঁটে পুরো ওয়েস্ট প্রকারান্তরে ইউরোপ, সর্ব সময়ে কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম বাদে আমেরিকার অনুগামী হয়। অন্যদিকে আমাদের মনে রাখা কর্তব্য যে, আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়েছে সত্য, তার ভোট ব্যাংক পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বিলুপ্ত আওয়ামী ভোট ব্যাংক আগামী নির্বাচনে অবলুপ্ত মুসলিম লীগের মতোই, বিএনপিকে বেঁচে নিবে মধ্যপন্হার দল হিসেবে- নানান কিসিমে’র সমীকরণে।
কারণ আওয়ামী লীগের ঘোষিত চিরশত্রু হলো- জামায়াতে ইসলামী। আর অঘোষিত নব্যশত্রু হলো- এনসিপি। যেহেতু জামাত ও এনসিপি বিএনপিকে নির্বাচনী প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করছে, কাজেই “শত্রুর প্রতিপক্ষ মিত্র”- এই ইকুয়েশনে, যৎকিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম বাদে বিলুপ্ত আওয়ামী ভোট ব্যাংক বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়বে। তাই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিএনপির নিজস্ব ভোট ব্যাংক আর, আওয়ামী ভোট ব্যাংক মিলে গেলে বিএনপি যে আগামী নির্বাচনে রবে অপরাজেয়- তা অনস্বীকার্য। দেশের প্রশাসনিক সংস্কার করাটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই সংস্কার করতে হয় নিরন্তর “যৎকালে যদাচার” বিবেচনায়। রাষ্ট্রের ও প্রশাসনিক সংস্কারকে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের মধ্যে আবদ্ধ করে দেয়া যায় না, যাবেও না। তাই, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সংস্কারের খোঁড়া অযুহাত তুলে নির্বাচন বিলম্বিত করা যাবে। Proportional Ratio (PR) পদ্ধতির ধোঁয়া আওড়ে নির্বাচনের সময় ক্ষেপন করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচন যখনই অনুষ্ঠিত হোক, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির বিজয় ঠেকানো যাবে না। ঐতিহাসিক সত্য হলো বাংলাদেশের মানুষ- হোক উচ্চ শিক্ষিত, হোক স্বল্প শিক্ষিত, হোক নিরক্ষর তবে ইনারা ইন এভারেজ মডারেটস মুসলিমস। তাঁরা ধর্মীয় গোঁড়ামীর ঘোর বিরোধী অর্থাৎ উগ্রতা মুক্ত মধ্যপন্হার মুসলমান। ফলস্বরূপ কট্টর ইসলাম পন্হি জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন কিংবা উদ্যত মারমুখী এনসিপি বিমুখ হয়ে, এদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মডারেটস মুসলিমগণ ঠাঁই খুঁজবে, মধ্য ডানপন্হী বিএনপি-তে। এটাই হচ্ছে সর্ব শেষাংশে দশ কথার এক কথা- সারকথা। শুভেচ্ছা নিরন্তর।
বি.দ্র. আওয়ামী আমলে কিছু বুদ্ধিজীবি, বিএনপি বিরোধী মনোভাব প্রকাশ করে, প্রগতিশীলতার পরিচয় দিতেন। আজও সে ধারা বিদ্যমান। কেবলমাত্র চেনা মুখ গুলোর বদলে, অধুনা আলাদা নয়া নয়া মুখ এসেছে। বক্তব্য কিন্তু হুবহু ওই একই আছে। যেহেতু স্ক্রিপ্টটা তো এক। মনে হয় আওয়ামী বুদ্ধিজীবিরা পালিয়ে যাওয়ার সময়, ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চালিয়ে যাবার নিমিত্তে, সযত্নে সংরক্ষিত স্ক্রিপ্টটা ওনাদের কাছে রেখে গেছেন।
এই নিবন্ধে কিছু শব্দ কিছু বাক্যের প্রয়োগ একাধিকবার এসেছে। মনে করার কোনও কারণ নেই যে, অবচেতনে হয়তো হয়েছে। না, সচেতন ভাবেই বহু দ্যোতনার ব্যবহারটা করেছি। একজন সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোন থেকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের, তুল্যমূল্য বিচার বিশ্লেষণটা তুলে ধরলাম। সরকার, সুশীল সমাজ, প্রথিতযশা রাজনীতিবিদগণ বিচার বিবেচনা করতেও পারেন। আবার নাও করতে পারেন। এটা সম্পূর্ণতঃ তাঁদের ঐচ্ছিক এখতিয়ার।
Leave a Reply