হৃদয়ে রক্তক্ষরণ (ছোটগল্প)
………………………………
তিন ভাই-বোনের মধ্যে মোহাম্মাদুল্লাহ সবার বড়। তার বাবা, সাইফুদ্দিন গিয়াস, সরকারি চাকরিজীবী। চাকরির প্রয়োজনে আজ এক জেলা, কাল আরেক জেলা—এভাবেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন।
২০২২ সালের মে মাসে বাবার বদলি হলো শরীয়তপুর জেলায়। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। পালং তুলাসার সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করা হলো মোহাম্মাদুল্লাহকে। স্কুল আর বাবার অফিসের মাঝামাঝি একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় শুরু হলো তাদের নতুন জীবন।
প্রথম দিকে ছেলেটি ছিল ভীষণ চুপচাপ। স্কুল থেকে ফিরে জানালার পাশে বসে থাকত। সহপাঠীদের সঙ্গে খুব একটা মিশত না। তার ছোট্ট মনটি হয়তো এখনো আগের জায়গার বন্ধুদের খুঁজে ফিরত।
কিন্তু সময় বড় জাদুকর। ধীরে ধীরে ক্লাসে বন্ধু বাড়তে লাগল। রফিক স্যারের স্নেহ, মমতা আর উৎসাহে মোহাম্মাদুল্লাহ শুধু লেখাপড়াতেই নয়, খেলাধুলাতেও দক্ষ হয়ে উঠল।
স্কুল ছুটি হলেই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরত। কোনোমতে দুমুঠো ভাত মুখে দিয়ে ছুটে যেত ডিসি অফিসের সামনের খোলা মাঠে। সেখানে ফুটবল ছিল তার প্রাণ। প্রতিদিনের অনুশীলন আর নিষ্ঠায় বড় ভাইদের মাঝেও সে হয়ে উঠেছিল প্রিয় একজন।
ছুটির দিনগুলো ছিল আরও আনন্দময়। সকালবেলা নাস্তা সেরে বন্ধু মোর্তুজার সঙ্গে ছুটে যেত রফিক স্যারের বাসার পাশের মাঠে। হাসি, দৌড়ঝাঁপ, ফুটবল আর বন্ধুত্বে ভরে উঠেছিল তার শৈশবের দিনগুলো।
দেখতে দেখতে মোহাম্মাদুল্লাহ তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে গেল।
ঠিক তখনই এলো সেই খবর, যা তার ছোট্ট পৃথিবীটাকে মুহূর্তে ভেঙে দিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাবার আবার বদলির আদেশ এলো—এবার ঢাকা।
খবরটা শোনার পর যেন ছেলেটার মুখের হাসি কোথায় হারিয়ে গেল। সে বারবার বাবাকে জিজ্ঞেস করত,
— “বাবা, আমি বন্ধুদের ছেড়ে কীভাবে যাব?”
— “বাবা, ওদের ছাড়া কি থাকা যায়?”
কোনো উত্তরই যেন তার মনকে শান্ত করতে পারত না।
খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল সে। জানালার পাশে বসে দূরে তাকিয়ে থাকত। মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে কান্না করত। ছোট্ট বুকের ভেতর যে কত বড় ঝড় বইছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বাবা ঢাকায় যোগদান করলেন। কিন্তু ছেলের বার্ষিক পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে পরিবার শরীয়তপুরেই থেকে গেল ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রতিটি দিন যেন বিদায়ের দিকে আরেকটি পদক্ষেপ।
ডিসেম্বরের ২০ তারিখ বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। কিন্তু একটি বেসরকারি বৃত্তি পরীক্ষা—”ফাতেমা মেধা বৃত্তি”—থাকায় আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হলো।
অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর।
বৃত্তি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ মোহাম্মাদুল্লাহ দৌড় দিল বিদ্যালয়ের দিকে।
বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কোথায় যাচ্ছ বাবা?”
ছেলেটি কাঁপা গলায় বলল,
— “স্যারদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি বাবা। কাল তো চলে যাব…”
কথাগুলো শুনে বাবার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর মোহাম্মাদুল্লাহ ফিরে এলো। চোখ দুটো লাল।
— “স্কুলে কেউ নেই বাবা…”
এই কয়েকটি শব্দে কতটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো শুধু একজন বাবাই বুঝতে পারেন।
বাবা সব বুঝেও না বোঝার ভান করলেন। নীরবে ছেলেটির হাত ধরে বাসায় ফিরলেন।
সেদিন বিকেলে ছিল তার শরীয়তপুরে শেষ ফুটবল খেলা।
ডিসি অফিসের সামনের সেই মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণভরে খেলল সে। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ল, খেলা শেষ হলো। একে একে বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে ধরল।
কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে কান্না।
মোহাম্মাদুল্লাহ যখন ভারী পায়ে বাসার দিকে ফিরছিল, তখন মনে হচ্ছিল সে শুধু একটি মাঠ নয়, তার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে।
ছেলের সেই নীরব কষ্ট দেখে বাবা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে তিনি নিঃশব্দে কেঁদে উঠলেন।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৪।
দুপুর প্রায় বারোটা।
গাড়ি ধীরে ধীরে শরীয়তপুর ছেড়ে ঢাকার পথে এগিয়ে চলল।
মোহাম্মাদুল্লাহ জানালার পাশে বসে ছিল। গাড়ি যত সামনে এগোচ্ছিল, ততই পিছিয়ে যাচ্ছিল তার প্রিয় স্কুল, প্রিয় মাঠ, রফিক স্যার, মোর্তুজা আর অসংখ্য স্মৃতি।
সে বারবার পিছনের দিকে তাকাচ্ছিল।
আর চোখের কোণে জমে থাকা জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলছিল।
কিন্তু ছোট্ট ছেলেটির হৃদয়ে রয়ে গেল এক টুকরো শহর, এক টুকরো মাঠ, আর কিছু মানুষের অমলিন ভালোবাসা—যাদের থেকে বিদায় নেওয়া যায়, কিন্তু কখনো ভুলে যাওয়া যায় না।
সময়ের স্রোতে মানুষ অনেক জায়গা বদলায়, কিন্তু শৈশবের প্রথম বন্ধু আর বিদায়ের প্রথম কান্না চিরকাল হৃদয়ের গভীরে অমলিন থেকে যায়।
আরো খবর দেখুন...
Leave a Reply