০৭. ১১. ২৫
নাটক
নিজেকে নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না। যে কারণে যেসব লেখক আত্মজীবনী লিখেন, আমি তাঁদের লেখার সঙ্গে একাত্ম হইনা। তাঁরা আত্মজীবনীর ব্যানারে আসলে ওটা আংশিক জীবন লিখেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রাখঢাক না করে “খণ্ড জীবন” নাম দিয়ে আত্মজীবনী লিখেছেন এবং একেবারে সত্যিকারের সুশীল সমাজের পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের হুমায়ুন আহমেদও আত্মজীবনী নামে কোনো বই লেখেননি। ভিন্ন ভিন্ন নামে বই লিখে নিজের জীবনের কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করেছেন মাত্র। সচেতন ভাবেই আত্মজীবনী লিখতে সচেষ্ট হননি। অন্যদিকে তসলিমা নাসরিন প্রকৃত আত্মজীবনীর নামে, নিজ জীবনের কালো অধ্যায়কে জমকালো রূপে উপস্থাপন করে, নিজে কুলসিত হয়েছেন। নিজ পরিবার, নিজ আত্মীয়-স্বজন, নিজ গন্ডিকে ডুবিয়ে দিয়ে পরিত্যক্ত ও পরিত্যাজ্য হয়েছেন। তাঁকে কে বা কারা যে বুঝিয়েন, সত্যই সাহিত্য। মূলত সত্য কখনও সাহিত্য না। সাহিত্য হলো শিল্প হলো- মুগ্ধতা, সৃষ্টিশীলতা। যে সৃষ্টি পাঠককে হাসায়, কাঁদায়, উদ্বিগ্ন করে, উদ্বেলিত করে, আলোড়িত করে, রোমাঞ্চিত করে। সেটাই সাহিত্য। সত্য কখনও সাহিত্য না। শিল্প না। সৃষ্টির শিল্পীত রূপ যদি সত্য হয়ে যায়, তাতে কোন ক্ষতি নেই বরঞ্চ সেটা হবে মহত্তর বিষয়। তসলিমা নাসরিনের সত্য সাহিত্য মহত্তর হয়নি, মহত্ত্ব বা মাহাত্ম্য তো তাঁর হয়ইনি তিনি সাহিত্য জগৎ থেকে যেমন হারিয়ে গেলেন, পাশাপাশি দেশ থেকে সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন।
বলছিলাম নিজের কথা লিখতে অপছন্দ প্রসঙ্গে। প্রিসিলা’র পোস্টের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বলে তবুও এখানে একটু শেয়ার করি। প্রথমবারের ভোটে জয়লাভ করার আনন্দই আলাদা। আমিও প্রিসিলা’র মতো প্রথম প্রদেয় ভোটে জয়লাভ করেছিলাম। মানে ১৯৯১ সনের ২৭শে ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে হয়েছিলাম প্রথম ভোটার, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলাম। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদ্বয় ছিলেন আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপির সাদেক হোসেন খোকা। তখন আমাদের বাসা ছিল পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার ও আলু বাজার এলাকার নর্থ-সাউথ রোডে। ভোট দিয়েছিলাম কসাইটুলী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। যদিও আমি তখন কেবলমাত্র ভোটার না, তখন আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলাম। সেবার ভোটে জিতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে, বেশ প্রফুল্ল হয়েছিলাম। ঠিক জোহরান মামদানির বিজয়ে উল্লসিত আজকের প্রিসিলার মতো। আসলেই নিজ ভোটে বিশেষত প্রথমবারের প্রদত্ত ভোটে সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচিত হলে, সমর্থকবৃন্দ বা ভোটার নিজের অন্তরে ভোটের মাঠের বিজয়ী প্রার্থীর সম তৃপ্ত সুখ অনুভব করেন।
এখানেই জনগণতন্ত্রের মাহাত্ম্য আর জনগণের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্রের দূরত্ব। এই কারণেই স্বৈরতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠাতে সাম্প্রতিক মঞ্চায়িত নাটকটির আমি একনিষ্ঠ গুণমুগ্ধ দর্শক। এই নাটকের নাট্যকার বিএনপি, প্রযোজক জামায়াত আর পরিচালক এনসিপি। এই নাটকের সাফল্য এখানে যে, এটা ক্ষুদ্র রঙ্গমঞ্চে মঞ্চায়িত হচ্ছে না, এই রঙ্গমঞ্চের আয়তন পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল। তবুও প্রত্যাশা যে, বিতাড়িত স্বৈরাচার যেনোতেনো ভাবে যাতে পুনর্বাসিত না হতে পারে। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা অন্যায়। কথা ঠিক। তবে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা অন্যায় নয়। জার্মানিতে হিটলারের “ন্যাৎসী পার্টি” নিষিদ্ধ হয়েছে। ইতালিতে মুসোলিনীর “ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি” নিষিদ্ধ হয়েছে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের “বার্থ সোশ্যালিষ্ট পার্টি” নিষিদ্ধ হয়েছে। বাসার আল আসাদের “সিরিয়ার আরব সোসালিষ্ট বার্থ পার্টি” নিষিদ্ধ হয়েছে। গণতন্ত্রের রোল মডেল আমেরিকা “আল কায়দা” ও “আই এস”-কে ঘটা করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এক যাত্রায় দুই রকমের ফল হতে পারে না। উপরের যে সংগঠন সমূহের নাম উচ্চারিত হলো সে সংগঠন সমূহের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অমিলটা কোথায়? তাহলে কেনো আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে না? বাঁধাটা কোথায়? জাতিসংঘে? তাহলে জাতিসংঘের উচিত আগে উপর্যুক্ত দেশ সমূহের সংগঠন সমূহকে সর্বাগ্রে অবারিত করা। তারপর আমরা জাতিসংঘের পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। তার আগে না। উনারা দৃষ্টান্ত স্হাপন করুক, আমরা উনাদের বেদবাক্য মেনে নিবো। কিন্তু ওনারা যদি বলেন, “ডোন্ট ফলো মি, ফলো মাই এডভাইস”। তাহলে পাগলাটে ট্রাম্পের মতো জাতিসংঘের বেইনসাফী মুখের উপর, সম্মুখস্হ দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিয়ে বলবো “সরি”।
আওয়ামী লীগের দূর্ভাগ্য হলো, ১৯৪৯ সনে প্রতিষ্ঠার পর থেকে যখন যিনিই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এসেছেন, তিনিই একনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বলেছেন, “আওয়ামী লীগ আবার কি জিনিস? আমি-ই তো আওয়ামী লীগ”। বক্তব্যটা মাওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, মুজিব, হাসিনা সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সেদিক থেকে উর্দু ও ইংরেজী শব্দ মিলে “আওয়ামী লীগ” এর পূর্ব-বঙ্গীয় সংস্করণে ও উচ্চারণে উদ্ভূত “আমীলীক” নামটা যথার্থ। আগা-গোড়া এমন ফ্যসিস্ট সংগঠন আওয়ামী লীগ-কে, নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে আাশ্রয় নিত হবে কৌশলের- কেনো? যদিও কৌশলটির শিল্পীত রূপে বিমুগ্ধ হয়েছি। হয়তো এবারের মতো উৎরে যাওয়া যাবে। তারপর? ছোট বেলায় শুনতাম, সংঘত কারণে প্রাণীটির নাম উল্লেখ করলাম না। একটা হিংস্র প্রাণীকে মেরে কলা গাছের নিচে রেখে এলে নাকি আবার জীবিত হয়ে যায়। শোনা কথা। দেখিনি। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জীবন্মৃত অবস্থা থেকে জীবিত হয়ে, আবার হিংস্র রূপ ধারণ করাটা নিজ চোখে নিজ জীবন প্রবাহে বিস্মিত হয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। তাই একে নিষিদ্ধ করে ফেলাটা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক- ফরযে আইন। তা নাহলে ইন্ডিয়ার কলা গাছ তলে এভাবে জীবন্মৃত অবস্থায় ফেলে আসাটা হবে নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। যে কারণে খনা তাঁর বচনে গুরুত্ব দিয়ে বলে গেছেন, “সাপ মেরে, লেজ রেখো না”।
নাটক এক সময় না এক সময় জনগণের সম্মুখে উন্মোচিত হয়ে যাবে। জনগণ নিজেকে প্রতারিত ভাববে। তখন গুরুতর প্রতারণার আঙুল উঠবে, নাট্যকার, প্রয়োজক ও পরিচালকের দিকে। তার’চে ভালো বর্তমান প্রেক্ষাপটের জাতীয় ঐক্যমতের মধ্যে দিয়ে নিষিদ্ধ করা হোক “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ”-কে। লেঠা চিরতরে চুকে যাক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত দিয়ে করে ফেলতে পারলে তো উইন-উইন সিচুয়েশন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও মুখিয়ে আছে, শুধুমাত্র দরকার জাতীয় ঐক্যমত্য। অর্থাৎ প্রয়োজন রাজনৈতিক সংগঠন গুলোর সমন্বিত নিরঙ্কুশ সমর্থন।
‘৭৫ এর ১৫-ই আগষ্ট, ৩রা নভেম্বর, ৭-ই নভেম্বর- বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের উৎখাতে নতুন যুগের সূচনা করেছিলো। সেই ‘৭৫ থেকে শুরু হয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ খতমের চুড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে, ভারত কতৃক লেলিয়ে দেয়া হাসিনা ওয়াজেদের সেই ভারতেই লেজ গুটিয়ে পলায়নের মধ্য দিয়ে- ৩৬শে জুলাই ‘২৪। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা গুলো আমাদের গৌরবোজ্বল ইতিহাসের অংশ। ‘৭৫ এর পথ পরিক্রমায় ‘২৪ এর বিজয় অর্জনে, ভারতের চোখ দিয়ে আজ আর বাংলাদেশকে দেখা নিস্প্রয়োজন। পৌত্তলিক হিন্দুত্ববাদ প্রগতিশীলতা নয়। বরং পশ্চাৎপদতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গোয়ার্তমি করে তা বুঝতে চেষ্টা করেনি। আগামী দিনগুলোয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে, হাড়ে হাড়ে তা টের পাবে।
বাংলাদেশের বীরশ্রেষ্ঠদের তালিকায় পঁচাত্তরের বিপ্লবীঃ মেজর ডালিম, কর্ণেল ফারুক, কর্ণেল রশিদ-দের নাম সংযোজন করে স্বীকৃতি দেয়া হবে কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। করা উচিত। এতেকরেও দেশের ক্রান্তিলগ্নে জাতির প্রতি তাঁদের যে দুঃসাহসিক এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দুঃসহ ত্যাগ- তার সন্তোষজনক প্রতিদানও এটা নয়। বাংলাদেশের মহান বিপ্লবী কর্ণেল রশিদ ও মেজর ডালিম যদি জীবিত থেকেও থাকেন, থাকলেও কোনও অসুবিধা নেই। দীর্ঘ সময় পরিক্রমায় তাঁরা আজ কিংবদন্তি। চব্বিশের আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে ছিলো পঁচাত্তরের বিপ্লবের মনিকোঠায়। বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক। ‘৭৫ ও ‘২৪ এর মহান বিপ্লবীগণ বাংলাদেশের সূর্য সন্তান।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা ওয়াজেদ এর হাতের বড়শিটি দেখেন, চিপটি দেখেন। এমন একটা লিকলিকে চিপে সাবেক গণভবনের পুকুর থেকে নাকি, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ওয়াজেদ প্রায় পাঁচ-ছয় কেজি ওজনের মাটিতে রাখা চিতল মাছটি ধরেছেন!! ছেলে ভোলানো নাটক। তিনি নাটক কম করেননি। যে কারণে জুলাই বিপ্লবের আগে পরে দেয়ালে দেয়ালে “নাটক কম করো পিও” নামক চিকামারা ও গ্রাফিতি-তে ছেয়ে গেছে সারাদেশ। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়। গণভবনের ছোটো নাটক ছড়িয়ে পড়েছে, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। রূপসা থেকে পাথুরিয়া। বিষে বিষ ক্ষয়, নাটক কম কোরো পিও, তোমার সৃষ্ট নাটক-ই তোমাকে করছে নিঃশেষ। শুভেচ্ছা নিরন্তর।
https://shorturl.fm/NlD0v