অতঃপর বৃষ্টি
“জাহান্নামে নারীর সংখ্যা হইব সবচেয়ে বেশি। বুঝলা শিরিন। নারী জাতির ধৈর্য কম। হাসিমুখে কাজ করাও ইবাদত। যে মুখ যে সারাক্ষণ কালা কইরা রাখে, মুরুব্বিদের লগে কথাবার্তা কয় না। সে ঘরে বদদোয়া আনে।”
শিরিন সব শোনে, মাথা নাড়ে। মুখ না চললেও দুই হাতের বিরাম নেই। ইফতারের সময়। দুই চুলায় একসাথে ভাজাভুজি চলছে। একটা মোড়ায় তফাতে বসে কাজ তদারকি করছে শাশুড়ি ফরিদা বেগম। শিরিন যত দ্রুত যাই করছে। কিছুই ওনার মনমতো হচ্ছে না। হয়ও না। নিজের দিনগুলো মনে পড়ে। কাজ করতে করতে সারাদিন কোমরটা দুদণ্ড বিছানায় লাগানোর সুযোগ পেতেন না। এখনকার বৌ-ঝিদের তো আরাম। মোটরে পানি আসে, গ্যাসের লাইন গ্রামে না এলেও বায়ো চুলা, সিলিন্ডার সব এসেছে। ফ্যান ঘোরে, ক্যারেন্ট না থাকলেও সোলারের কারণে টেবিল ফ্যান, লাইট জ্বলে। এখন আর সংসারের পাশাপাশি ক্ষেতে কাজ করতে হয় না, ঢেঁকিতে চাল ভাঙতে হয় না, হাঁস মুরগী পালতে হয় না। গ্রীষ্মের খড়তাপে কাজ করতে করতে মনে হতো মারাই যাবেন। অথচ এখনকার বৌদের কত আরাম। এত আরাম ফরিদার সহ্য হয় না। তাই খুঁত খুঁজে বের করেন। মোটরের পানি ওনার ভালো লাগে না। খাবার জন্য দূরের চাপ কল থেকে পানি আনান। সকাল সন্ধ্যা দু’বার উঠান ঝাড়ু না দিলে ঘরে অলক্ষী এলো বলে গালমন্দ করেন। ইফতারের আয়োজনে সিলিন্ডার ব্যবহার করলে অতিরিক্ত খরচ বলে মাটির চুলাতেই ইফতার বানাতে হবে জানান। শিরিন মফস্বল শহরের মেয়ে। বাসাবাড়িতে বড়ো হয়েছে। বাসার ভেতরই গ্যাস, পানি পেয়েছে। গৃহস্থ বাড়ির কাজকর্ম নিয়ে ধারণাই ছিল না। বিয়ে হয়েছে সবে দু’বছর। অথচ এই দু’বছরই শিরিনের কাছে দুই যুগের চেয়ে দীর্ঘ মনে হচ্ছে। শিরিনের মা ছয় বছর আগে মারা গিয়েছেন। বাবা আর বিয়ে করেননি। তিন ছেলেমেয়েকে বিয়েশাদি দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করে হুট করে নিজেও মারা গেলেন। শিরিনের মা বাবা কেউ নেই, এ বিষয়টা যেন ফরিদাকে আরও নতুন শক্তি দিলো। নিজ উদ্যোমে মা বাবাহীন মেয়েটাকে কাজ শেখানোর দায়িত্ব নিলেন।
পাশে রাখা ফোনটায় কল আসছে। জহির ফোন দিচ্ছে। শিরিনের ধরতে ইচ্ছে করে না। চাপা অভিমান। জহির চাইলেই ওকে সাথে নিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ঐ যে মায়ের অসন্তুষ্টি আর জান্নাত জাহান্নামের হিসেবের ভয়ে সাহস করে বলে না। মাসে মাসে দু তিনদিনের জন্য আসে। তখনও ফরিদা বেগম দিনমান নানা কাজে শিরিনকে ব্যস্ত রাখে। ওনাদের জমানাতেও রাতের অন্ধকার ছাড়া কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেতেন না। এখন তো রাতদিন ফোনেই লেগে থাকে।
“ফোন কে দেয়? জহির নাকি? ওরে কইতে পারো না এত ফোন না দিতে। টাকা নষ্ট। ফোনের বিল আসে কত খবর আছে। বেহিসাবি নারী জাহান্নামি। এরা সংসারের আয় বরকত নষ্ট করে। এরা জাহান্নাামের আগুনে পুড়ব।”
শিরিন এবারও উত্তর দেয় না। যদিও মনে মনে বলে, “জাহান্নামে যে নারীর সংখ্যা বেশি হবে। আপনার মতো কিছু নারী দেখলেই বোঝা যায়। মানুষের হায় নিয়ে জান্নাতে কিভাবে যাবেন।”
কিন্তু কথাগুলো অনুচ্চারিত থেকে যায়। আঁচল দিয়ে মাথা, মুখ মুছে। শীতকাল চলে গিয়েছে। চৈত্র মাসেই গরমটা অতিরিক্ত লাগছে। গায়ের ওড়নাটা সরিয়ে রেখে কাজ করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তাতেও দুটো কথা শুনতে হবে। আর উত্তর দেওয়া হবে না। কেননা উত্তর দিলে জহিরের কাছে নালিশ চলে যাবে। শিরিন তাই মৌনতাই বেছে নিয়েছে। গনগনে আগুনের তাপে শিরিনের মাথা দপদপ করছে। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। ভাজাপোড়াগুলো ভেজে প্লেটে তুলতে তুলতে শিরিনের মনে হয় এই আগুনের তাপেই এত কষ্ট। না জানি জাহান্নামের আগুন আরও কত ভয়ংকর। অদ্ভুত একটা ভয়ংকর ইচ্ছে জাগে মনে। মনে হয় চুলা থেকে একটা জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ বের করে আগুনের স্বাদ বুঝিয়ে দিতে। দেখুক কেমন তাপ।
একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায় শিরিন ডানে খুন্তি দিয়ে ডালের বড়া নাড়ে। অজান্তেই বাম হাতটা চলে যায় চুলার কাছে।
গেটে কড়া নাড়ার শব্দে শিরিনের ধ্যান ভাঙে। গলার শব্দ ভেসে আসছে। জহিরের গলা মনে হচ্ছে। গতসপ্তাহে জহির আসার কথা থাকলেও আসেনি। শাশুড়ি বলেছেন ঈদের আগে ঘনঘন আসলে খরচ। একবারে ঈদের ছুটিতে আসবে। গতকাল ফোনে কথা হচ্ছিল যখন, জহির জিজ্ঞেস করেছিল ঈদে কী নিবে শিরিন, শাড়ি না সেলোয়ার-কামিজ। শিরিন বলেছিল সেই টাকাটা দিয়ে বরং জহির একবার বাড়ি ঘুরে যেতে। জহির অবাক হয়েছিল। ঈদে শাড়ি, চুড়ি স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া তো সব মেয়ের স্বপ্ন থাকে। শিরিন শুধু বলেছিল “স্বামীবিহীন শ্বশুর বাড়ির সংসারে স্বামীর আগমনটাই ঈদের মতো লাগে। যেমন শীতল লাগে সারাদিনের খরতাপের মতো এক পশলা বৃষ্টি।”
“আম্মা, শিরিন।”
এবার ডাকটা স্পষ্ট হয়। চুলায় থাকা কড়াইটা নামিয়ে রেখে শাশুড়ির অনুমতির অপেক্ষা না করেই গেট খুলতে যায় শিরিন। ঘর্মাক্ত শরীর, মাথার চুল ভিজে কপালে লেপ্টে আছে শিরিনের। চোখের সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে। তার ক্লান্ত মুখ, আর ঘামে ভেজা শার্ট বলে দিচ্ছে, চৈত্র মাসের তাপ তাকেও কম কষ্ট দেয়নি সারাটা পথ। শিরিন হাতের ব্যাগটা নিয়ে নেয়। একটু আগে মনে ভর করা একরাশ অভিমান যেন নাই হয়ে গিয়েছে।
“এভাবে খবর না দিয়া আইলা যে বাপ? সব ঠিক আছে তো? শরীর ভালা?”
“ভালো আম্মা। আপনাদের সাথে দুইদিন ইফতার করতে আসলাম।”
“ভালা করছ। শিরিন, ভোর রাইতের জন্য ভালামন্দ রাঁধতে হইব। ইফতার শেষ হইছে বইলা রুমে যাইয়া খিল দিও না।”
“কিছু লাগবে না আম্মা। আপনাদের জন্য যা রাঁধছেন তাই খাব। আমি একটু শুই। শিরিন এককাপ চা দিও।”
শিরিন চা বানানোর আগে গোসল সারে। সারাদিনের ঘর্মাক্ত শরীরের পর সন্ধ্যায় আর ভালো লাগে না। গরম পরায় নিয়মিত সন্ধ্যার কাজ শেষে গোসল করে। আজও তার ব্যতিক্রম না।
“রোজা রমজানের দিন মাথায় রাইখো। ঘরে ময় মুরুব্বি আছে। ছেলে হুট কইরা ক্যান আসলো, মনে কইরো না বুঝি নাই। রাত বিরাতে উইঠা আবার গোসল দিতে তোমার লজ্জা না লাগলেও, আমগো লাগে। এমনে এমনে কয় না বেশরম নারী জাহান্নামে যাইব।”
বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো কথাটাই শোনে জহির। শিরিন শোবার ঘরে চা নিয়ে আসলে বলে,
“ঈদে কী লাগবে বললা না তো।”
“বলছি না? এই যে আপনি আসেন এই যথেষ্ট। অনেক খুশি হয়েছি। সত্যি।”
“এই তে চলবে? আমি আরও ভাবলাম…”
“কী?”
“বড়ো কিছু চাও।”
“দিবেন?”
“দেব।”
“একটা ঘর দিয়েন। এক কামরার হোক। যে ঘরে কথায় কথায় জাহান্নামি হব না।”
***
“আম্মা যে কারণে হুট করে আসলাম তাই বলি। ঈদের পর শিরিনকে ঢাকা নিয়ে যাব। আমার খাওয়া দাওয়ার খুব সমস্যা হয়। গ্যাসের সমস্যা লেগেই আছে। ডাক্তার বলেছে আলসার হবে এমন হলে। মেসে আর থাকতে পারি না।”
“তোমগো এখনো বাচ্চা কাচ্চা হইল না। এখনি আলাদা হইয়া যাবা।”
“আলাদা না আম্মা। প্রয়োজনে নিচ্ছি। আপনিও চলেন। আপনারা আমার সাথে থাকলে আমারই ভালো। শহর বাড়ি করা লাগে না।”
এই কথাটা জহির মুখ দিয়ে বের করতে অনেক সময় লেগেছে। অপেক্ষার দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল কখনো শেষ হবে কিনা, কোনোদিন বৃষ্টি নামবে কিনা জানতো না শিরিন। শুধু স্বপ্ন দেখেছিল একদিন এই লু হাওয়ার বদলে শীতল বাতাস বইবে। তাই তো ফরিদা বেগম যখন বলেন,
“যে সকল নারী ঘর ভাঙানি মন্ত্র দেয়, তারা জাহান্নামী।”
শিরিনের খারাপ লাগে না। নিজের এক টুকরো ঘরের স্বপ্নে সবকিছুই আজ মধুর লাগে।
https://shorturl.fm/pZyzl
https://shorturl.fm/aJuX8