কুখ্যাত লেখিকার এর গল্প – শরৎ

কুখ্যাত লেখিকার এর গল্প – শরৎ

শরৎ

“বলি এতো মজার কফিটাও তোর ভালো লাগে নি? কি ভালো লাগে রে তোর?”

“আমার ভালো লাগা অন্যরকম। তুই বুঝবি না, প্রীতি।”

“বল দেখি তোর অন্যরকম ভালো লাগা।”

“আমার ভালো লাগে শরতের পড়ন্ত বিকেল। যেখানে খুব বেশি গরম নেই, আবার খুব বেশি ঠান্ডাও নেই। এর সাথে ভালো লাগে একাকীত্ব, একরাশ নীরবতা আর চোখের সামনে উত্তাল সমুদ্র।”

“তুই এতো রোম্যান্টিক কীভাবে রে দীপা?”

“একাকীত্ব আর রোম্যান্টিকতার মাঝে কোনো মিল নেই রে পাগলী।”

” আচ্ছা বুঝলাম, তবে যাচ্ছিস কোথায়?”

“যেদিকে দু চোখ যায়।”

“মানে কি? দিপা, দিপা শোন….”

__

“অনামিকা!”

“হ্যাঁ?… আপনি?”

” হুম, আমি।”

“কিন্তু আপনি কুমিল্লায় কীভাবে?”

” হ্যাঁ, আমি কুমিল্লায়, কুমিল্লার ধর্মসাগর পাড়ে, অনলাইনে পরিচিত হওয়া অনামিকার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”

“হঠাৎ চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় কেন?”

“তুমি যে একবার বলেছিলে কুমিল্লায় আসতে তাই এসেছি। শত হোক তুমি বলেছো, না এসে পারি?”

“ও, তবে আপনি জানলেন কি করে আমি এখানে আর আমায় চিনলেনই বা কি করে?”

“কারণ আমার অনুমান শক্তি অনেক ভালো। আর তোমায় চিলেছি তোমার শাড়ি দেখে।”

“শাড়ি?”

“হ্যাঁ, শাড়ি, নীল শাড়ি। এটা পড়েই তুমি একবার ছবি পোস্ট করেছিলে, তবে চেহারা দেখাও নি।”

“এটাও মনে আছে?”

“কেন মনে থাকবে না। আর হ্যাঁ, শুভ জন্মদিন।”

“ধন্যবাদ, তবে চট্টগ্রাম থেকে আমার জন্য কি এনেছেন?”

“আপাতত নিজেকেই ধরে এনেছি। তোমার এই হাসিটা দেখার জন্য, দীপান্বিতা। তোমার কি ভালো লাগে, তা তো জানি না।”

“আপনি আমার নাম কী করে জানলেন?”

“বলেছি না শরতের অনুমান সবসময় ঠিক হয়।”

” তো আপনার নাম শরৎ। ফেসবুকে ছদ্মনামে লিখেন।”

” হ্যাঁ, দীপান্বিতা চৌধুরাণী।”

“আমি চৌধুরাণী নই, চক্রবর্তী।”

“চৌধুরাণীটাই ভালো লাগে।”

“আচ্ছা, এতই যখন ভালো অনুমানশক্তি। আমার কি ভোলো লাগে তা অনুমান করুন তো।”

” সত্যি?”

“হ্যাঁ বলুন।”

“তোমার ভালো লাগে শরতের পড়ন্ত বিকেল, সাথে একাকীত্ব, একরাশ নীরবতা আর চোখের সামনে উত্তাল সমুদ্র।”

“আপনি কী করে জানলেন?”

” তোমার ভালো লাগা সত্যি হোক তা চাও?”

“হ্যাঁ, তবে..”

” চোখ বন্ধ করো। আর যতক্ষণ না আমি বলছি,, ততক্ষণ চোখ খুলবে না।”

“কিন্তু আপনি কীভাবে?”

“দেখোই না।”

অগত্যা চোখ বন্ধ করলো দিপা, শরৎ তার হাতে হাত রেখে কানের কাছে এসে বললো,

” আমি তোমায় শুধুমাত্র একবার দেখতে চেয়েছিলাম, একবার তোমার হাত ধরতে চেয়েছিলাম। সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, আমার অনামিকা…”

শরৎ চুপ হতেই চোখ খুললো দিপা। তার চোখের সামনে সত্যিই উত্তাল সমুদ্র, একরাশ নীরবতা আর পড়ন্ত বিকেল। তার গরমও লাগছে না, শীতও না। এ তো সত্যিই সেই শরতের পড়ন্ত বিকেল, যা সে চেয়েছিলো। তবে আশেপাশে কোথাও শরৎ নেই। শরৎ কেন, কোনো মানুষই নেই। তার অনেক অবাক লাগলো। সে দুচোখ ভরে অনুভব করতে লাগলো তার ভালো লাগা….

“দীপা এই দীপা।”

“হ্যাঁ?”

“তুই এখানে আর আমি তোকে কতক্ষণ ধরে খুঁজছি। তুই ধর্মসাগরে কি করছিস?”

” আমি ধর্মসাগরে মানে?”

অনেক অবাক হলো দীপা, সে তো এতক্ষন সমুদ্রের পাড়ে ছিলো। তাহলে আবার এইটুকু সময়ের মাঝে কী করে আবার ফিরে এলো? শরৎ কী সত্যিই আদু জানে? নাকৈ সবই দীপার কল্পনা? না, শরৎ তার কল্পনা নয়, সে অনুভব করেছে শরতকে এমনকি শরৎ তাকে ছুঁয়েছে ও। প্রীতির কথার কোনো উত্তর দিতে পারলো না সে।

পাশে বসা একটা ছেলের ফোনে খবর চলছিলো। সেখানে বলা হচ্ছে, আজ সকালে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লাগামী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হাড়িয়ে খাদে পড়ে ১৩ জন নিহত। আহত হয়েছেন ২৮ জন। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন এইচএসসি ২০২২ এ চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম হওয়া মেধাবী ছাত্র ও নবীন লেখক শরৎ চৌধুরী(ছদ্মনাম:বেদ)।

এর মানে কি ? শরৎ আর নেই। আজ সকালেই তার মৃ’ত্যু হয়েছে। কিন্তু এতক্ষণ তার সাথে কে কখা বলছিলো? এই বিকেলে, শরৎ-ই তো তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেলো বা তাকে তার হাত ধরলো। কিছুই বুঝতে পারলো না দীপা। এ মুহূর্তে তার শুধু শরতের বলা কথাগুলোই মনে পড়ছে,
“তোমার এই হাসিটা দেখার জন্য, দীপান্বিতা।”
“দীপান্বিতা চৌধুরাণী।”
“চৌধুরাণীটাই বেশি ভালো লাগে।”
“তোমায় একবার দেখতে চেয়েছিলাম।”
“তোমায় শুধু একবার ছুঁতে চেয়েছিলাম।”
“আমার অনামিকা।”

দীপার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো, সে বুঝতে পারে শরৎ কেন তাকে চৌধুরাণী বলেছিলো।
সে যে শরৎ চৌধুরীর রাণী-
দীপান্বিতা চৌধুরাণী।

“দীপা? কী হলো তোর? কাঁদছিস কেন?”

“প্রীতি, তুই জানিস আমার প্রিয় ঋতু কি?”

“কি?”

” শরৎ।”

(সমাপ্ত)

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *